পেকুয়া (কক্সবাজার) সংবাদদাতা : কালবৈশাখীর আকস্মিক তাণ্ডবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে কক্সবাজার জেলার বিস্তীর্ণ লবণ মাঠ। টানা দুই দিনের ঝড়ো হাওয়া ও ভারী বৃষ্টিতে উৎপাদিত ও উৎপাদনাধীন বিপুল পরিমাণ লবণ পানিতে গলে গিয়ে হাজারো প্রান্তিক চাষি চরম ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
গত ৭ ও ৮ এপ্রিল রাতজুড়ে বয়ে যাওয়া এ দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কক্সবাজার সদর উপজেলার চৌফলদন্ডী ও ঈদগাঁও, পেকুয়া উপজেলার মগনামা, উজানটিয়া ও রাজাখালী, মহেশখালী উপজেলার কুতুবজোম ও বড় মহেশখালী এবং কুতুবদিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকা। রাতের বৃষ্টিতে মাঠে জমে থাকা লবণ গলে পানিতে মিশে যায়। একই সঙ্গে উৎপাদনের জন্য প্রস্তুত করা বেড বা কাই নষ্ট হয়ে যাওয়ায় নতুন করে উৎপাদন শুরু করতে কমপক্ষে ৫ থেকে ৭ দিন সময় লাগবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
ক্ষতিগ্রস্ত চাষিদের মধ্যে চরম হতাশা বিরাজ করছে। মগনামা এলাকার চাষি লিয়াকত আলী বলেন, মৌসুমের শেষ সময়ে বাড়তি লাভের আশায় নিরলস পরিশ্রম করছিলেন। কিন্তু অল্প সময়ের বৃষ্টিতেই কয়েক শ’ মণ লবণ পানিতে মিশে গেছে। এখন নতুন করে মাঠ প্রস্তুত করতে হবে, যা অত্যন্ত ব্যয়বহুল।
উজানটিয়া এলাকার চাষি মিজানুর রহমান জানান, বাজারে লবণের দাম আগেই কম ছিল। তার ওপর এই দুর্যোগে সব শেষ হয়ে গেছে। ঋণ করে মাঠ নেওয়ায় তা শোধ করা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তিনি। বড় মহেশখালী ও কুতুবজোম এলাকার চাষিরাও একই ধরনের ক্ষতির কথা জানিয়েছেন।
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫–২৬ মৌসুমে দেশে প্রায় ২৭ লাখ ১৫ হাজার মেট্রিক টন লবণের চাহিদা রয়েছে। এই লক্ষ্য পূরণে কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের বাঁশখালী এলাকায় প্রায় ৬৯ হাজার একর জমিতে ৪১ হাজারের বেশি চাষি লবণ উৎপাদনে নিয়োজিত রয়েছেন।
বিশেষ করে মহেশখালী উপজেলায় প্রায় ১৭ হাজার একর জমিতে লবণ চাষ হয়। অনুকূল আবহাওয়ায় এখান থেকে গড়ে ২.৫ থেকে ৩.৫ লাখ মেট্রিক টন লবণ উৎপাদিত হয়, যা দেশের মোট উৎপাদনের প্রায় ২৫ শতাংশ।
বিসিক কক্সবাজার লবণ শিল্প উন্নয়ন কার্যালয়ের উপ-মহাব্যবস্থাপক মো. জাফর ইকবাল ভূঁইয়া জানান, সাম্প্রতিক বৃষ্টিতে কয়েক হাজার একর লবণ মাঠ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। লোনা পানি মিষ্টি হয়ে যাওয়ায় পুনরায় উৎপাদন শুরু করতে অতিরিক্ত শ্রম ও জ্বালানি ব্যয় বাড়বে। এতে জাতীয় উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়েও শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
চাষিরা জানান, যেখানে প্রতি মণ লবণ উৎপাদনে খরচ ২৫০ থেকে ২৮০ টাকা, সেখানে বাজারে ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় তারা আগে থেকেই লোকসানে ছিলেন। এর মধ্যে কালবৈশাখীর এই আঘাত তাদের জন্য সত্যিকার অর্থেই ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে এখন টিকে থাকাই তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।