হুসাইন বিন আফতাব, শ্যামনগর (সাতক্ষীরা) : উপকূল যেন জমে আছে দীর্ঘদিনের এক তৃষ্ণা- সুপেয় পানির তীব্র সংকট। সেই তৃষ্ণার আর্তি এবার রাস্তায় নেমে এলো ম্যারাথনের মাধ্যমে। সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলায় প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হলো সুপেয় পানির দাবিতে ব্যতিক্রমধর্মী এক ম্যারাথন “রান ফর ওয়াটার”।
শুক্রবার (১৬ মে) ভোর ছয়টায় গ্যারেজ বাজারের নির্জন রাস্তায় যখন একে একে জড়ো হচ্ছিলেন শতাধিক তরুণ-তরুণী, তখন তারা কেউ স্রেফ শরীরচর্চার জন্য নয়, এসেছিলেন একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা নিয়ে-“সরকারি সেবার আওতায় সুপেয় পানি চাই”। আয়োজনে ছিল স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন শরুব ইয়ুথ টিম, সহযোগিতায় গ্লোবাল প্ল্যাটফর্ম বাংলাদেশ। গ্যারেজ বাজার থেকে শুরু হওয়া এই ৫ কিলোমিটারের ম্যারাথন শেষ হয় বুড়িগোয়ালিনীর আকাশনীলা ইকো ট্যুরিজম চত্বরে। পথজুড়ে ছিল পানির দাবিতে প্ল্যাকার্ড, মুখে ছিল দৃঢ় প্রতিজ্ঞা আর মনে ছিল উপকূলের তৃষ্ণার্ত জনপদের প্রতিনিধিত্ব করার অঙ্গীকার।
এই ম্যারাথনে অনলাইন নিবন্ধন করেন ২৭৭ জন, যদিও বাস্তবে অংশ নেন শতাধিক মানুষ। অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ছাত্র-ছাত্রী, পরিবেশকর্মী, স্থানীয় বাসিন্দা এমনকি কিছু প্রবীণ নাগরিকও ছিলেন। ম্যারাথনে যৌথভাবে প্রথম হন মোঃ আতিক হাসান, কিংকর ম-ল ও মোঃ ইব্রাহিম খলিল। শরুব ইয়ুথ টিমের প্রতিষ্ঠাতা এস এম জান্নাতুল নাঈম বলেন, “আমরা যাদের প্রতিনিধিত্ব করি, তারা প্রতিদিন সুপেয় পানির জন্য লড়াই করে। লবণাক্ততা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস আর জলবায়ু পরিবর্তন মিলে এখানকার মানুষকে করে তুলেছে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। এই আয়োজনের মাধ্যমে আমরা চেয়েছি সমস্যাটা আরও স্পষ্টভাবে সমাজ ও প্রশাসনের সামনে তুলে ধরতে।”
আলোচনা সভায় বক্তারা বলেন, দেশের অন্যান্য স্থানে যেখানে কল খুললেই আসে পরিষ্কার পানি, সেখানে উপকূলবাসীকে এক বালতি সুপেয় পানির জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। কেউ কেউ কিনে খায়, কেউ কেউ খায় পুকুরের লোনা পানি। তারা বলেন, নিরাপদ পানি পাওয়ার অধিকার মৌলিক মানবাধিকার, আর এটি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
আকাশনীলা চত্বরে অনুষ্ঠিত সমাপনী অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন স্থানীয় সাংবাদিক, শিক্ষক, পরিবেশকর্মী ও পানি অধিকার কর্মীরা। তাদের বক্তব্যে উঠে আসে একটি সুস্পষ্ট দাবি—অবিলম্বে উপকূলীয় অঞ্চলের পানি সংকট নিরসনে কার্যকর ও টেকসই পদক্ষেপ গ্রহণ। এই আয়োজন যেন ছিল উপকূলের মানুষের নীরব কণ্ঠে এক জোরালো আহ্বান। দৌড়ের মধ্য দিয়ে তারা বোঝাতে চেয়েছেন, সংকট শুধুই ব্যক্তি বা এলাকার নয়—এটি জাতির উন্নয়ন যাত্রায় বড় বাধা।