মোঃ রেজাউল বারী বাবুল,স্টাফ রিপোর্টার, গাজীপুরঃ
বর্ষার প্রথম জোয়ারের পানিতে প্রাণ ফিরে পেতে শুরু করেছে গাজীপুরের নদ-নদী, খাল-বিল ও জলাশয়। এ সময় প্রকৃতির নিয়মে বিভিন্ন নদ-নদী থেকে মাগুর, শিং, কৈ, ট্যাংরা, শোল, গজার, পাবদা, পুঁটি, চিংড়িসহ অসংখ্য দেশীয় মাছ প্রজননের জন্য বিল ও জলাশয়ে ছড়িয়ে পড়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র। বর্ষার শুরুতেই জেলার বিভিন্ন নদ-নদী, খাল-বিল ও জলাশয়ে অবাধে ব্যবহার হচ্ছে সরকারিভাবে নিষিদ্ধ কারেন্ট জাল। একই সঙ্গে আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে চায়না চাইয়ের(ম্যাজিক চাই) ব্যবহার। ফলে লাখ লাখ রেণু-পোনা, ছোট মাছ ও বিভিন্ন জলজ প্রাণী নির্বিচারে নিধন হচ্ছে। এতে গাজীপুরের প্রাকৃতিক মৎস্যসম্পদ ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।
সরেজমিনে ঘুরে এবং স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গাজীপুরের ঐতিহাসিক বেলাই বিল, কানাইয়া বিল, বালুচাকুলি বিল, ইছালি বিল, পূবাইল ফেরিঘাট সংলগ্ন বালু নদী, চিলাই নদীসহ সদর উপজেলা,কালীগঞ্জ, কাপাসিয়া, শ্রীপুর ও কালিয়াকৈর উপজেলার বিভিন্ন নদী, খাল ও বিলে ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত অবাধে কারেন্ট জাল ও চায়না চাই ব্যবহার করে মাছ শিকার করা হচ্ছে। অনেক স্থানে শত শত মিটার দীর্ঘ কারেন্ট জাল পানিতে পেতে রাখা হচ্ছে। আবার কোথাও কোথাও দীর্ঘ সময় ধরে পানিতে স্থাপন করা হচ্ছে চায়না চাই, যেখানে বড় মাছের পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ রেণু-পোনা, ছোট মাছ, চিংড়ি, কাঁকড়া, ব্যাঙসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণী আটকা পড়ে মারা যাচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর এভাবে নির্বিচারে মাছ শিকার চলতে থাকায় দেশীয় মাছের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাচ্ছে। এক সময় বর্ষা মৌসুমে গাজীপুরের বিল ও নদীগুলো দেশীয় মাছের অফুরন্ত ভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত ছিল। এখন সেই চিত্র অনেকটাই অতীত। বিশেষ করে পূবাইল ফেরিঘাট সংলগ্ন বালু নদীতে প্রতিদিন সকাল ও সন্ধ্যায় প্রকাশ্যে কারেন্ট জাল দিয়ে মাছ ধরার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, মাঝে মধ্যে অভিযান পরিচালিত হলেও নিয়মিত নজরদারির অভাবে অসাধু জেলেরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে।
মৎস্য বিশেষজ্ঞদের মতে, কারেন্ট জালের সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো এটি কোনো নির্দিষ্ট আকারের মাছ বেছে ধরে না। প্রজননক্ষম মাছ, ডিমওয়ালা মাছ, রেণু-পোনা-সবই এতে আটকা পড়ে। অন্যদিকে চায়না চাই(ম্যাজিক চাই) দীর্ঘ সময় পানিতে স্থাপন করে রাখার ফলে মাছের পাশাপাশি অসংখ্য জলজ প্রাণীও ধ্বংস হয়। এতে প্রাকৃতিকভাবে মাছের বংশবিস্তার মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে এবং জলজ পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে।
এ বিষয়ে গাজীপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোঃ সাইফুল ইসলাম বলেন, 'কারেন্ট জাল ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং এটি দেশীয় মৎস্যসম্পদের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। গাজীপুরের যেসব নদী, খাল বা বিলে কারেন্ট জাল ব্যবহার করে মাছ শিকারের সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যাবে, সেসব স্থানে সংশ্লিষ্ট উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তাদের সঙ্গে সমন্বয় করে দ্রুত অভিযান পরিচালনা করা হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনাসহ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। দেশীয় মাছের প্রজনন ও মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণে আমরা আন্তরিকভাবে কাজ করছি। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় জনগণের সহযোগিতা ও সুনির্দিষ্ট তথ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।'
গাজীপুর জেলা প্রশাসক মোঃ নুরুল করিম ভূঁইয়া বলেন, :গাজীপুরের নদ-নদী, খাল-বিল ও জলাশয় আমাদের অমূল্য প্রাকৃতিক সম্পদ। এসব জলাশয়ের জীববৈচিত্র্য ও দেশীয় মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণে জেলা প্রশাসন সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। কোথাও নিষিদ্ধ কারেন্ট জাল ব্যবহার বা অবৈধভাবে মাছ শিকারের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মৎস্য বিভাগ প্রয়োজন মনে করলে এবং ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার জন্য অনুরোধ জানালে জেলা প্রশাসন যে কোনো সময় মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করতে প্রস্তুত রয়েছে। পরিবেশ ও দেশীয় মৎস্যসম্পদ রক্ষায় কেউ আইনের উর্ধ্বে নয়।'
গাজীপুর সদর উপজেলার বাড়িয়া ইউনিয়নের সাবেক ইউপি সদস্য রাসেল ভূঁইয়া বলেন, 'কারেন্ট জালের পাশাপাশি এখন চায়না চাই আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। কারণ অনেক জায়গায় চায়না চাই দিন-রাত পানিতে স্থাপন করে রাখা হয়। এতে শুধু বড় মাছ নয়, রেণু-পোনা, ছোট মাছ, চিংড়ি, কাঁকড়া ও অন্যান্য জলজ প্রাণীও ধ্বংস হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে অদূর ভবিষ্যতে দেশীয় মাছের উৎপাদন ভয়াবহভাবে কমে যাবে। তাই কারেন্ট জালের পাশাপাশি চায়না চাইয়ের অবাধ ব্যবহারও কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন।'
স্থানীয় সচেতন মহলের অভিযোগ, কিছু অসাধু ব্যক্তির স্বল্পমেয়াদি আর্থিক লাভের জন্য জেলার নদ-নদী, খাল-বিলের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও দেশীয় মৎস্যসম্পদ ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। নিয়মিত অভিযান, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং জনসচেতনতার অভাবে নিষিদ্ধ কারেন্ট জাল ও ক্ষতিকর উপায়ে মাছ শিকার বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছে না।
পরিবেশবিদদের মতে, নদী-নালা, খাল-বিল শুধু মাছের আধার নয়; এগুলো কৃষি, জীববৈচিত্র্য, জলজ প্রাণী এবং পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার অন্যতম ভিত্তি। প্রজনন মৌসুমে নির্বিচারে মাছ ও পোনা নিধন চলতে থাকলে শুধু দেশীয় মাছ নয়, পুরো জলজ পরিবেশই অপূরণীয় ক্ষতির মুখে পড়বে।
স্থানীয় বাসিন্দারা অবিলম্বে জেলা প্রশাসন, মৎস্য বিভাগ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে নিয়মিত যৌথ অভিযান পরিচালনা, কারেন্ট জাল জব্দ, অবৈধ চায়না চাই অপসারণ এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই গাজীপুরের দেশীয় মৎস্যসম্পদ ও জলজ জীববৈচিত্র্য ভয়াবহ সংকটে পড়বে।