শহিদুল্লাহ মনসুর, জাবি সংবাদদাতা
আজ ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট। সারা দেশের ৪২ হাজারের বেশি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ৮ হাজার ৭৪৬টি কেন্দ্রকে অতি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এছাড়া মোট কেন্দ্রের ৪০ শতাংশেরও বেশি বিভিন্ন মাত্রায় ঝুঁকিপূর্ণ বলে বিবেচনা করা হয়েছে। অতীত নির্বাচনে সহিংসতার ইতিহাস, ভৌগোলিক অবস্থান, রাজনৈতিক উত্তেজনা ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে এ তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে বলে জানান আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি সূত্র।
বিশেষ করে মহানগর ও চরাঞ্চল ঘিরে ঝুঁকির মাত্রা নিয়ে প্রশাসনের উদ্বেগ বেশি। মহানগর এলাকায় ঘনবসতি, তীব্র রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, প্রভাবশালী গোষ্ঠীর সক্রিয়তা এবং অতীত সহিংসতার নজির থাকায় অনেক কেন্দ্রকে ‘অধিক গুরুত্বপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অন্যদিকে চরাঞ্চলের কেন্দ্রগুলোতে ঝুঁকির ধরন ভিন্ন—দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পৌঁছাতে বিলম্বের আশঙ্কা, ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা এবং স্থানীয় আধিপত্য বিস্তারের প্রবণতা এসব এলাকাকে অনিশ্চয়তার মধ্যে রাখছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে নির্বাচন কমিশনে পাঠানো প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজধানী ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন এলাকার ১৫টি সংসদীয় আসনে ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি। ঢাকা সিটি কর্পোরেশন এলাকার ২ হাজার ১৩১টি কেন্দ্রের মধ্যে ১ হাজার ৬১৪টিকেই ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
গত শনিবার সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে ঢাকা-১৪, ১৬ ও ১৮ আসনের সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে এক ব্রিফিংয়ে জানানো হয়, রাজধানীর অন্তত দুটি আসনকে অধিক ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। এসব এলাকায় অতিরিক্ত টহল, মোবাইল টিম ও স্ট্রাইকিং ফোর্স প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
এদিকে বগুড়া জেলায় সাতটি সংসদীয় আসনে ৯৮৩টি কেন্দ্রের মধ্যে ৫০০টি, টাঙ্গাইলের ৮টি সংসদীয় আসনের ১ হাজার ৬৩টি কেন্দ্রের মধ্যে ১৬০টি কেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ। বাগেরহাটের চারটি আসনের ৫৪৭টি কেন্দ্রের মধ্যে ৪০৯টি ঝুঁকিপূর্ণ, যার মধ্যে ১৮৬টি উচ্চমাত্রার ঝুঁকিপূর্ণ এবং ২২৩টি ঝুঁকিপূর্ণ। ময়মনসিংহের ভালুকা আসনের ৭২টি কেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ, যার সাতটি অধিক ঝুঁকিপূর্ণ; ফুলবাড়িয়া আসনের ১২১টির মধ্যে ৫০টি ঝুঁকিপূর্ণ এবং ১০টি অধিক ঝুঁকিপূর্ণ। কুমিল্লার দাউদকান্দি ও মেঘনা উপজেলায় ১৪৫টি কেন্দ্রের মধ্যে ৬৯টি ঝুঁকিপূর্ণ এবং এর মধ্যে ৩৩টি অতিমাত্রায় ঝুঁকিপূর্ণ। ঝালকাঠিতে ১৩৩টি কেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ, নেত্রকোনার কেন্দুয়ায় ৯৬টির মধ্যে ৫০টি ঝুঁকিপূর্ণ, যশোরের অভয়নগরে ৭৩টির মধ্যে ২৭টি ঝুঁকিপূর্ণ (১০টি অধিক গুরুত্বপূর্ণ, ১৭টি গুরুত্বপূর্ণ), এবং গাইবান্ধার পাঁচটি আসনের ৬৭৫টি কেন্দ্রের মধ্যে ৩৭৯টি ঝুঁকিপূর্ণ, যার মধ্যে ৭৯টি অতি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
এছাড়া দ্বীপজেলা ভোলায় চারটি আসনের ১৩১টি কেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এর মধ্যে ৪৩টি কেন্দ্র দুর্গম চরাঞ্চলে অবস্থিত। এসব কেন্দ্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নৌবাহিনী, কোস্টগার্ড ও পুলিশের বিশেষ টহল জোরদার করা হয়েছে। জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় দ্রুতগামী নৌযান ও হেলিকপ্টার প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্রে জানা গেছে, সম্ভাব্য অস্থিরতা এড়াতে প্রায় ৩ হাজার ব্যক্তির একটি তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে, যারা নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার বা সহিংসতার সঙ্গে জড়িত থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তাদের ওপর বিশেষ নজরদারি থাকবে।
নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে প্রায় ১ লাখ ৮ হাজার সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে, যা আগের নির্বাচনের তুলনায় প্রায় তিনগুণ। পাশাপাশি প্রায় ১ লাখ ৮৭ হাজার পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন। আনসার, বিজিবি ও র্যাব সদস্যরাও মাঠে থাকবেন।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়, কোথাও সংঘাত বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা হলে তাৎক্ষণিকভাবে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনই প্রশাসনের প্রধান লক্ষ্য বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।