- মৃত্যু বেড়ে ৩৯, ক্ষতিগ্রস্ত ৯ লাখের বেশি মানুষ
- বান্দরবান-রাঙামাটি যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন
- লাখো মানুষ এখনও পানিবন্দী
- খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে
চট্টগ্রাম বিভাগে টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণ, ভারতের আসাম, ত্রিপুরা ও মিজোরাম সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল এবং নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি মিলিয়ে সৃষ্ট বন্যা পরিস্থিতি এখন দুই রকম চিত্র তুলে ধরছে। চট্টগ্রাম নগর ও জেলার বেশ কয়েকটি এলাকায় ধীরে ধীরে পানি নামতে শুরু করায় পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও বান্দরবান, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও কক্সবাজারে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। নতুন করে পাহাড়ি ঢলের পানি প্রবেশ করায় পার্বত্য জেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হচ্ছে। বহু এলাকায় সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন, বিদ্যুৎ ও মোবাইল নেটওয়ার্ক অচল হয়ে পড়েছে এবং হাজার হাজার মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ পরিস্থিতি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চট্টগ্রাম বিভাগের পাঁচ জেলায় বন্যা ও পাহাড়ধসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৩৯ জনে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে কক্সবাজারে ২৩ জন, যাদের ১৩ জনই রোহিঙ্গা; চট্টগ্রামে আটজন, বান্দরবানে ছয়জন এবং রাঙামাটিতে দুজন মারা গেছেন। পাঁচ জেলার প্রায় ৯ লাখ ২৮ হাজার মানুষ বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বঙ্গোপসাগরে সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর পাশাপাশি ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ভারী বৃষ্টির কারণে আসাম, ত্রিপুরা ও মিজোরাম থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের পানি সীমান্তবর্তী নদ-নদী দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। ফলে চট্টগ্রাম অঞ্চলে স্থানীয় বৃষ্টির সঙ্গে উজানের ঢল যোগ হয়ে নদীগুলোর পানি দ্রুত বেড়ে যাচ্ছে। এতে বান্দরবান, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও কক্সবাজারে বন্যা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
চট্টগ্রামে উন্নতির আভাস, তবু পানিবন্দী লাখো মানুষ: চট্টগ্রাম নগরীতে জলাবদ্ধতা নেই সব সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়েছে। তবে জেলার সাতকানিয়া, বাঁশখালী, ফটিকছড়ি, রাউজান, হাটহাজারী, মিরসরাই, আনোয়ারা ও কর্ণফুলী উপজেলায় বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চলে এখনো পানি আটকে রয়েছে। জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, জেলার ১৬ উপজেলার ১ লাখ ৮৮ হাজার ৬৪৮টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ১৭৬টি ইউনিয়ন ও পৌরসভা বন্যাকবলিত হয়েছে এবং ৬৭৩টি আশ্রয়কেন্দ্রে প্রায় ২৪ হাজার মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন।
সরকার বন্যাদুর্গতদের জন্য ৭০০ টন চাল ও ৬ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। এর মধ্যে ৩০০ টন চাল, ৪ কোটি ৩০ লাখ টাকা, ২২ হাজার ২৫০ প্যাকেট শুকনা খাবার এবং ১৮ হাজার ৩৩০ প্যাকেট রান্না করা খাবার বিতরণ করা হয়েছে। আরও ৪০০ টন চাল ও ১ কোটি ৭০ লাখ টাকা মজুত রাখা হয়েছে।
সাতকানিয়া-বাঁশখালীতে মানবিক সংকট: চট্টগ্রামের সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি বিরাজ করছে সাতকানিয়া ও বাঁশখালীতে। দুই উপজেলায় পাঁচ লাখেরও বেশি মানুষ এখনো পানিবন্দী। সাঙ্গু ও ডলু নদীর পানি বৃদ্ধি এবং পাহাড়ি ঢলে সাতকানিয়ার বাজালিয়া, কেওচিয়া, ছদাহা, ধর্মপুর, কালিয়াইশ, খাগরিয়া, আমিলাইশ, ঢেমশা, নলুয়া, চরতি ও পুরানগড় ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে।
কোমর থেকে গলা সমান পানিতে তলিয়ে গেছে ঘরবাড়ি, কৃষিজমি, মাছের ঘের, বাজার ও গ্রামীণ সড়ক। অনেক এলাকায় নৌকাই একমাত্র যাতায়াতের মাধ্যম। বিশুদ্ধ পানি, খাদ্য, শিশুখাদ্য ও ওষুধের সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে।
সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খন্দকার মাহমুদুল হাসান জানিয়েছেন, চার লাখের বেশি মানুষ এখনো পানিবন্দি। দুর্গম এলাকায় পৌঁছানো সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেনাবাহিনী স্পিডবোটের মাধ্যমে ত্রাণ পৌঁছে দেওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছে।
অন্যদিকে বাঁশখালীর ১৪টি ইউনিয়নই বন্যাকবলিত। জোয়ারের পানিতে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। উপজেলার প্রায় অর্ধেক এলাকা এখনো পানির নিচে। স্থানীয়দের অভিযোগ, অনেক দুর্গম ইউনিয়নে এখনো সরকারি ত্রাণ পৌঁছেনি। শুক্রবার বাহারছড়া ইউনিয়নে আকস্মিক বন্যার পানিতে ভেসে আশিক (১১) ও মিরাজ (৬) নামে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
বান্দরবানে পরিস্থিতির ভয়াবহ অবনতি : বান্দরবানে শনিবার সকাল থেকে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীর পানি বৃদ্ধি, পাহাড়ধস এবং নতুন করে পাহাড়ি ঢল নামায় জেলার বিভিন্ন সড়ক তলিয়ে গেছে। রাবার ড্যামের বেড়িবাঁধ ভেঙে যাওয়ার পর পানির তীব্র স্রোতে বান্দরবান-রাঙামাটি সড়কের ব্রিজঘাট সেতু ধসে পড়েছে। এতে দুই জেলার সড়ক যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।
জেলা শহরের সঙ্গে রুমা, রোয়াংছড়ি, থানচি, লামা ও আলীকদম উপজেলার যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। বান্দরবান থেকে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারগামী দূরপাল্লার বাস চলাচলও বন্ধ হয়ে গেছে।
শহরের অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। মোবাইল নেটওয়ার্ক ও ইন্টারনেট সেবাও ব্যাহত হওয়ায় উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনায় সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। নিম্নাঞ্চলের মানুষ নৌকায় চলাচল করছেন এবং হাজারো পরিবার এখনো আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করছে।
জেলা প্রশাসন পরিস্থিতি বিবেচনায় জেলার সব পর্যটনকেন্দ্র ১৫ জুলাই পর্যন্ত বন্ধ ঘোষণা করেছে।
রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে নতুন করে পানি বৃদ্ধি: রাঙামাটিতে কাপ্তাই হ্রদের পানি বৃদ্ধি এবং পাহাড়ি ঢলের কারণে নিম্নাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। বিভিন্ন আঞ্চলিক সড়ক পানির নিচে চলে যাওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে। পাহাড়ধসের ঝুঁকি থাকায় প্রশাসন সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
ভারী বৃষ্টি ও সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সাজেক উপত্যকায় আটকে পড়া ৪৬১ জন পর্যটককে উদ্ধার করেছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। ডুবে যাওয়া সড়ক নৌকায় পার করে নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দেওয়া হয় তাদের।
খাগড়াছড়িতেও ভারতের ত্রিপুরা ও মিজোরাম সীমান্ত থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে নদী ও ছড়ার পানি বেড়ে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। বিভিন্ন গ্রামীণ সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দুর্গম এলাকায় ত্রাণ পৌঁছাতে বেগ পেতে হচ্ছে প্রশাসনকে।
কক্সবাজারে পাঁচ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত: কক্সবাজারে বন্যা পরিস্থিতিও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। চকরিয়া, মাতামুহুরী, রামু, উখিয়া, টেকনাফ, পেকুয়া ও সদর উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা পানির নিচে রয়েছে। প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং অন্তত তিন লাখ মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন। নলকূপ ডুবে যাওয়ায় বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। অনেক পরিবার রান্না করতে পারছে না। পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরগুলোতেও সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি রয়েছে।
আরও ভারী বৃষ্টির আশঙ্কা: রিজিওনাল ইন্টিগ্রেটেড মাল্টি-হ্যাজার্ড আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম (রাইমস) ও বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, ১২ জুলাই পর্যন্ত চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। পাঁচ জেলাকেই পাহাড়ধসের উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে ১৫৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে। চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কসংকেত বহাল রয়েছে।
প্রশাসনের আশঙ্কা, ভারতের সীমান্তবর্তী এলাকায় আবারও ভারী বৃষ্টি হলে নতুন করে পাহাড়ি ঢল নেমে পার্বত্য জেলা ও কক্সবাজারের বন্যা পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। তাই দুর্গম এলাকায় দ্রুত ত্রাণ পৌঁছানো, আশ্রয়কেন্দ্রে খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং পাহাড়ধসপ্রবণ এলাকা থেকে মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।