রাজশাহী অঞ্চলের ৫টি জেলার হাসপাতালে দক্ষ জনবলের অভাবে অচল হয়ে আছে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র-আইসিইউ। এসব হাসপাতালের আইসিইউ দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহার না হওয়ায় নষ্ট হচ্ছে যন্ত্রপাতিও।
উল্লেখ করা যেতে পারে, আইসিইউ বা নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র হলো হাসপাতালের একটি বিশেষ বিভাগ, যেখানে গুরুতর অসুস্থ বা মরণাপন্ন রোগীদের ২৪ ঘণ্টা নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও নার্সদের দ্বারা উন্নত চিকিৎসা সেবা প্রদান করা হয়। এখানে ভেন্টিলেটরসহ জীবন রক্ষাকারী নানা আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়।
জানা গেছে, দক্ষ চিকিৎসক ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নার্সের সংকট থাকায় রাজশাহী, জয়পুরহাট, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁ জেলায় কমপক্ষে ৬০টি আইসিইউ বেড (শয্যা) পড়ে আছে। এসব আইসিইউ’র সেবা বন্ধ থাকায় জেলা শহর থেকে রোগী পাঠানো হয় বিভাগীয় শহর রাজশাহীর মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে। কিন্তু এখানেও রোগীর চেয়ে আইসিইউ বেড কম থাকায় প্রতিদিন অপেক্ষমান থাকতে হচ্ছে গড়ে ৪০ জন রোগীকে। অপেক্ষমান রোগীদের একটি অংশ মারা যাচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আইসিইউ পরিচালনার জন্য অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট বা ক্রিটিক্যাল কেয়ার বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এবং বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নার্সের দরকার হয়। কিন্তু এসব জনবলের ঘাটতির কারণে কোটি টাকার যন্ত্রপাতি থাকলেও সেগুলো কাজে লাগানো যাচ্ছে না। বিশেষ করে শিশুদের হাম, নিউমোনিয়া ও শ্বাসকষ্টজনিত রোগের প্রকোপ বাড়ায় পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে উঠেছে। প্রতিদিনই বিভিন্ন জেলা থেকে গুরুতর রোগীদের রামেক হাসপাতালে পাঠানো হচ্ছে। কিন্তু এখানেও মাত্র ৪৩টি বেড রয়েছে।
কম জনবল দিয়ে আইসিইউ সেবা চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে এই হাসপাতালকে। রামেক হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, এখানে ৪৩ বেডের একটি আইসিইউ ইউনিট রয়েছে- যেটি এখনো সরকারিভাবে অনুমোদিত নয়। নিয়ম অনুযায়ী এখানে অন্তত ১০ জন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক থাকার কথা। কিন্তু আছেন মাত্র একজন। প্রয়োজনীয় জনবলের তীব্র সংকটে শিক্ষার্থী ও অস্থায়ী কর্মীদের দিয়ে কোনোভাবে আইসিইউ কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। প্রতিদিন কমপক্ষে ৪০ জন রোগী আইসিইউ শয্যার জন্য অপেক্ষায় থাকেন। সূত্র মতে, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ২৪০ শয্যার জেলা সদর হাসপাতালে ১০টি আইসিইউ শয্যা থাকলেও এটিতে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি নেই। নেই জনবলও। ফলে দীর্ঘদিন ধরে পড়ে আছে আইসিইউটি। বগুড়ার মোহাম্মদ আলী হাসপাতালে ৮টি আইসিইউ শয্যা থাকলেও জনবল সংকটে তা চালু করা সম্ভব হয়নি। বেসরকারি টিএমএসএস হাসপাতালেও ১৪টি আইসিইউ শয্যার মধ্যে মাত্র ৪টি সচল রয়েছে। সিরাজগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে ৬টি ও এম মনসুর আলী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১০টি আইসিইউ শয্যা রয়েছে। আছে আধুনিক যন্ত্রপাতিও। তবে ২০১৪ সাল থেকেই এ দুই হাসপাতালে জনবল সংকটে সেগুলো অচল রয়েছে। এছাড়াও জয়পুরহাট জেনারেল হাসপাতালে ২০২২ সালে ১০টি আইসিইউ শয্যা প্রস্তুত করা হলেও এখনো চালু করা যায়নি। পাবনা জেলা হাসপাতালে চার শয্যার আইসিইউ উদ্বোধন করা হয়। কিন্তু জনবল এবং দক্ষ টেকনিশিয়ানের কারণে সেটিও বন্ধ রয়েছে। এই হাসপাতালের একজন কর্মকর্তা জানান, দীর্ঘদিন ধরেই আইসিইউ অচল পড়ে আছে। মুমূর্ষু রোগীদের পাঠাতে হচ্ছে রাজশাহীতে। অনেক দূরের পথ হওয়ায় রাস্তায় কোনো কোনো রোগী মারা যাচ্ছেন। নওগাঁ জেলা হাসপাতালের সূত্র জানায়, কিছুদিন আগে সাত শয্যার আইসিইউ ইউনিট এখানে চালু অভাবে জন্য জায়গা বরাদ্দ রাখা হয়। সেখানে শুধু দেয়াল তুলে রাখা হয়েছে কিন্তু যন্ত্রপাতি বা জনবল এখনো নিয়োগ করা হয়নি। যার কারণে আইসিইউ চালু করা যায়নি। রাজশাহী হাসপাতালের চিকিৎসকরা অভিযোগ করেন, জেলা পর্যায়ে আইসিইউ সুবিধা না থাকায় রোগীদের দ্রুত রাজশাহীতে নিতে গিয়ে অনেক সময় জীবনহানির ঝুঁকি তৈরি হয়। বিশেষ করে গুরুতর রোগীদের জন্য এই স্থানান্তর অত্যন্ত বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। রাজশাহী হাসপাতালে আশেপাশের জেলাগুলো থেকে অনেক রোগী আসে। অনেক সময় একেবারেই শেষ পর্যায়ে রাজশাহী হাসপাতালে পৌঁছায়। তখন তাদের আইসিইউ প্রয়োজন হয়। কিন্তু এখানে আইসিইউ বেডের সংখ্যা যথেষ্ট না থাকায় তাদেরও তাৎক্ষণিক ভর্তি করা সম্ভব হয় না।