আবু সাইদ বিশ্বাস, সাতক্ষীরা : বাংলাদেশের উপকূলে পানি সংকট ক্রমেই তীব্র আকার ধারণ করছে। দেশের দক্ষিণ পশ্চিমের সুন্দরবন লাগোয়া উপকূলে ঘন ঘন সাইক্লোনের কারণে বেড়েছে পানির সংকট। ওই অঞ্চলে ২০০৯ সালে ঘূর্ণিঝড় আইলার পর থেকে পানি সংকট বাড়তে থাকে। ঘূর্ণিঝড়সহ প্রাকৃতিক বিপদ বৃদ্ধির সঙ্গে জীবন যাপনের জন্য অতি প্রয়োজনীয় পানির অভাব ওই অঞ্চলের পরিবারগুলোর সংকট বাড়িয়ে তুলেছে। তবে এই সংকট এখন আর দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলে সীমাবদ্ধ নেই। গত কয়েক বছরে এই সংকট ছড়িয়ে পড়েছে উপকূলজুড়ে। বর্ষাকালে বৃষ্টির পানির জন্য অপেক্ষা; আর শুকনো মৌসুমে এক কলসি পানির জন্য ছুটতে হয় কিলোমিটারের পর কিলোমিটার পথ। অধিকাংশ পরিবারে পানি সংগ্রহের দায়িত্ব থাকে নারীর কাঁধে। সংসারের সব কাজ শেষ করে নারীকে ছুটতে হয় পানি সংগ্রহে। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, ঘন ঘন প্রাকৃতিক বিপদের পাশাপাশি উপকূল অঞ্চলের অনেক স্থানে পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। ফলে বহু গভীর নলকূপ অকেজো হয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশের উপকূলের পানি সংকটের এই চিত্র সামনে রেখে প্রতি বছরের ন্যায় এবারও ২২ মার্চ পালিত হচ্ছে বিশ্ব পানি দিবস। মাটির নীচের পানি অশেষ নয়, আপনার সন্তানের স্বার্থে পানি ব্যবহারে যত্নশীল হউন” প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগরে সুপেয় পানির সংকট নিরসনের দাবিতে, খালি কলস হাতে নিয়ে কলসববন্ধন করেছেন উপকূলবাসী। সম্প্রতি উপজেলার মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নের মথুরাপুর গ্রামে এই কলসবন্ধন কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়।
সমীক্ষায় দেখা গেছে, মোট জনসংখ্যার ৬৩ শতাংশ পানীয় জল পেতে অসুবিধার সম্মুখীন হয়; যেখানে ৫১ শতাংশ জনসংখ্যার জন্য সংকট ছয় মাসেরও বেশি সময় ধরে থাকে। বাংলাদেশের দক্ষিণ পশ্চিম উপকূলের সাতক্ষীরার আশাশুনি, শ্যামনগর খুলনার দাকোপ, কয়রা ও পাইকগাছা উপজেলার ৩৯টি ইউনিয়নের ১০১টি ওয়ার্ডের ৬৬,২৩৪টি পরিবারের (মোট জনসংখ্যা ২৭১,৪৬৪) পানীয় জলের পরিস্থিতির উপর পরিমাণগত এবং গুণগত সমীক্ষা করে এ ফল পাওয়া গেছে। সমীক্ষায় দেখা গেছে, ৪২ শতাংশ পরিবার বলেছে, তারা হস্তচালিত নলকূপ থেকে সুপেয় পানি সংগ্রহ করেন। ৭৫ শতাংশের বেশি পরিবার হস্তচালিত নলকূপ বা পুকুরের পানির উপর নির্ভর করে। সমীক্ষায় পানীয় জলের উৎস হিসাবে ব্যবহৃত সমস্ত সম্প্রদায়ের হস্তচালিত নলকূপ বা পুকুরের পানি পরীক্ষা করা হয়েছে। ৬৬৬টি কমিউনিটি হস্তচালিত নলকূপের মধ্যে, লবণাক্ততা মাত্র ২৭ শতাংশ বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড (১০০০এমজি/এল) সীমার মধ্যে পাওয়া গেছে। উপলব্ধ পানীয় জলের পুকুরগুলির মধ্যে ৪৮ শতাংশ পুকুরের লবণাক্ততা বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডের সীমা পূরণ করে।
পানির গুণমান পরীক্ষার ফল থেকে জানা যায়, ৭৩ শতাংশ পরিবার, যারা তাদের পানীয় জলের উৎস হিসাবে হস্তচালিত নলকূপ ব্যবহার করে, তারা উচ্চ লবণাক্ততার সঙ্গে অনিরাপদ পানি পান করে। মিঠা পানির হস্তচালিত নলকূপ খুলনা জেলার (২৫%) চেয়ে সাতক্ষীরায় (৩১%) বেশি। সমীক্ষার আওতাধীন ৬৬,২৩৪টি পরিবারের মধ্যে, ২১ শতাংশ কোনো ধরনের পরিস্রাবণ ব্যবস্থা ছাড়াই সরাসরি পুকুর থেকে পানীয় জল সংগ্রহ করে; যেখানে মাত্র ১২ শতাংশ পুকুরের স্যান্ড ফিল্টার (পিএসএফ) থেকে একই রকম পান। সমীক্ষা বলছে, শুধুমাত্র ১৬ শতাংশ পরিবারের পানীয় জলের জন্য তাদের নিজস্ব সুবিধা রয়েছে। কিন্তু অধিকাংশ পরিবার (৫১%) অন্যান্য পরিবার-ভিত্তিক সুবিধার উপর নির্ভরশীল। সরকারি সুবিধাগুলো মোট জনসংখ্যার ১৬ শতাংশ পরিবারকে পানীয় জল সরবরাহ করে। ৬৬,২৩৪টি পরিবারের ৭৪ শতাংশ নারীরা পানীয় জল সংগ্রহের দায়িত্ব পালন করে। মাত্র ১৬ শতাংশ পরিবারে নারীদের পাশাপাশি পুরুষরাও পানি সংগ্রহ করে। সমীক্ষা থেকে প্রমাণিত হয়, দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলে পানি সংকট তীব্র এবং অধিকাংশ পরিবারে পানি সংগ্রহের দায়িত্ব নারীদের।
গ্রামের নারীদের মধ্যেই একজন হচ্ছেন ‘পানি আপা’। তিনি গ্রামের অন্য নারীদের পানি সরবরাহের সমস্যার সমাধান দিচ্ছেন। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের জন্য জিসিএ প্রকল্প থেকে পরিবার ও কমিউনিটি পর্যায়ে পানির ট্যাংক সরবরাহ করা হয়েছে। পরিচালিত হচ্ছে সচেতনতামূলক কার্যক্রম। সাতক্ষীরার শ্যমনগর উপজেলার পদ্মপুকুর ইউনিয়নের ‘পানি আপা’ মনজুআরা বেগম (৩৬)। তিনি বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের প্রযুক্তিগত সমস্যার সমাধান দেন। কোন সমস্যা দেখা দিলে ঘরে ঘরে যান। তিনি ফিল্টার, পানির পাইপও পরিষ্কার করেন। পানি আপা বিশুদ্ধ পানির গুরুত্ব এবং পানির ট্যাংক পরিষ্কার করার বিষয়ে সকলকে সচেতন করেন। প্রকল্প পানি আপা পেয়েছেন প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ এবং এই পরিষেবার জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন সরঞ্জাম।
‘পানি আপা’ মনজুআরা বেগম বলেন, ‘গ্রামের পরিবারগুলোতে আমার সাথে যোগাযোগের নম্বর রয়েছে; যাতে জলের ট্যাঙ্ক সংক্রান্ত যে কোনো সমস্যার খবর আমি পাই। আমি বর্তমানে ৪৫টি পরিবারকে ‘পানি আপা’ হিসেবে সেবা করি। আমি তাদের কাছ থেকে রক্ষণাবেক্ষণ পরিষেবার জন্য কিছু টাকা পাই। আমার মাসিক আয় গড়ে প্রায় ২৫০০ টাকা। আমার সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পেয়েছে। আমি এখন আর্থিক এবং সামাজিক উভয়ভাবে ক্ষমতায়িত।’
সাতক্ষীরা জেলার আশাশুনি উপজেলার খাজরা গ্রামের ললিতা রানী সানা (২৮)। এক সময় পানির জন্য এই নারী অনেক কষ্ট করেছেন। পানি সংগ্রহ করতে হতো অনেক দূর থেকে। এতে তার অনেক সময় নষ্ট হতো। পরিবারের অনেক কাজই পড়ে থাকতো। সন্তান লালন পালন এবং অন্যান্য কাজে সময় দিতে পারতেন খুব কম। কিন্তু এখন পানি সংগ্রহ তার জন্য সহজ হয়েছে। পরিবারের অন্যান্য কাজের জন্য সময় বেড়েছে।
ললিতা রানী সানা বলেন, ‘সুপেয় পানির জন্য অনেক কষ্ট করেছি। পানি আনতে আমাকে প্রতিদিন ৩ কিমি হাঁটতে হতো ২ ঘণ্টার জন্য। ঝড়ের সময় এটি সত্যিই কঠিন ছিল, রাস্তাগুলো পিচ্ছিল হয়ে যেত। বজ্রপাত আরো ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। শুষ্ক মৌসুমে ভোগান্তি তিনগুণ বেড়ে যায়। আমি গৃহস্থালির কোনো কাজ ঠিকমতো করতে পারতাম না। কারণ আমাকে পানি আনতে বেশি সময় দিতে হয়েছিল। আমি জিসিএ প্রকল্পের কাছে কৃতজ্ঞ। আমি নিরাপদ পানীয় জলের সুবিধা পেয়েছি। ২০০০ লিটার ট্যাঙ্ক আমার জীবন বাঁচিয়েছে।’
ইউএনডিপি’র জেন্ডার-রেসপনসিভ কোস্টাল অ্যাডাপটেশন (জিসিএ) প্রকল্পের প্রজেক্ট কোঅর্ডিনেশন স্পেশালিস্ট মোহাম্মদ ইফতেখার হোসেন বলেন, ‘জিসিএ প্রকল্পটি প্রায় এক লাখ ৪০ হাজার উপকূলীয় মানুষের জন্য সারা বছর ধরে নিরাপদ পানীয় জল নিশ্চিত করছে। খুলনা ও সাতক্ষীরায় উপকূলীয় নারীদের এখন পানি আনতে কিলোমিটারের পর কিলোমিটার হাঁটতে হবে না। কারণ আমাদের প্রকল্পে বৃষ্টির পানি সংগ্রহের জন্য ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। যাতে নিরাপদ পানীয় জল দীর্ঘ সময়ের জন্য সংরক্ষণ করা যায়। সিস্টেমের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে, জিসিএ প্রকল্প ‘পানি আপা’ নামে একটি উদ্ভাবনী পদ্ধতির সূচনা করেছে। উপকূলীয় নারী সম্প্রদায় থেকে ‘পানি আপা’ নির্বাচিত হয়েছে, যারা এখন উপকূলীয় সম্প্রদায়ের ‘চেঞ্জ মেকার’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। এই উদ্যোগ অন্যান্য উপকূলীয় নারীদেরও অনুপ্রাণিত করছে।’