মোহাম্মাদ মনিরুজ্জামান, মোংলা থেকে

দীর্ঘ তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা শেষে আবারও পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত হয়েছে সুন্দরবন। নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পঞ্চম দিনেই বাগেরহাটের মোংলার করমজল পর্যটনকেন্দ্রে বেড়েছে পর্যটকদের উপস্থিতি। শনিবার সকাল থেকেই দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা দর্শনার্থীদের আনাগোনায় ব্যস্ত হয়ে ওঠে সুন্দরবনের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত এ পর্যটনকেন্দ্র।

সুন্দরবনের প্রজনন মৌসুমে বন্যপ্রাণী, জীববৈচিত্র্য ও বনজ সম্পদ রক্ষায় গত ১ জুন থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত পর্যটকদের প্রবেশসহ বিভিন্ন কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়েছিল। তিন মাসের বিরতির পর ১ সেপ্টেম্বর থেকে পর্যটকদের জন্য সুন্দরবন আবার খুলে দেওয়া হয়। এরপর থেকে বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে দর্শনার্থীদের উপস্থিতি বাড়তে শুরু করেছে।

শনিবার করমজলে গিয়ে দেখা যায়, পর্যটকবাহী নৌযান একের পর এক ঘাটে এসে পৌঁছাচ্ছে। পরিবার, বন্ধু ও বিভিন্ন দলের সদস্যরা সুন্দরবনের প্রকৃতি উপভোগ করতে এসেছেন। অনেকে ফুটট্রেইলে হাঁটছেন, গাছপালা, নদী-খাল ও বন্যপ্রাণী দেখছেন। বানর ও হরিণসহ বিভিন্ন প্রাণী পর্যবেক্ষনের পাশাপাশি পর্যটকদের অনেকে ছবি ও ভিডিও ধারণ করছেন।

দীর্ঘ সময় পর্যটকদের প্রবেশ বন্ধ থাকায় করমজল ও আশপাশের পর্যটননির্ভর ব্যবসায়ীদের কার্যক্রমেও স্থবিরতা তৈরি হয়েছিল। পর্যটকদের ফিরে আসায় নৌযান চালক, গাইড, হোটেল-রেস্তোরাঁসহ সংশ্লিষ্ট ব্যবসায় আবারও ব্যস্ততা বাড়ছে।

ঢাকা থেকে আসা পর্যটক সাইফুল ইসলাম বলেন, সুন্দরবন শুধু ভ্রমণের স্থান নয়, প্রকৃতিকে কাছ থেকে দেখারও সুযোগ। করমজলে এসে শহরের ব্যস্ত জীবন থেকে ভিন্ন পরিবেশের অভিজ্ঞতা হচ্ছে বলে জানান তিনি। যারা এখনো সুন্দরবন দেখেননি, তাদের অন্তত একবার এখানে আসা উচিত বলেও মন্তব্য করেন।

খুলনা থেকে পরিবার নিয়ে আসা তানজিলা আক্তার বলেন, শিশুদের বইয়ে পড়া প্রকৃতি ও বন্যপ্রাণী বাস্তবে দেখানোর উদ্দেশ্যেই তারা করমজলে এসেছেন। এখানে এসে প্রত্যাশার চেয়েও ভালো অভিজ্ঞতা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

বরিশাল থেকে আসা পর্যটক রাকিব হাসান জানান, দীর্ঘদিন ধরে সুন্দরবন ভ্রমণের পরিকল্পনা ছিল তার। নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার পর সুযোগ পেয়ে তিনি করমজলে এসেছেন। নৌপথে নদীর দুই পাশের দৃশ্য এবং করমজলের পরিবেশ তার কাছে ভালো লেগেছে বলে জানান তিনি।

করমজল বন্যপ্রাণী প্রজনন কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হাওলাদার আজাদ কবির বলেন, তিন মাস বন্ধ থাকার পর ১ সেপ্টেম্বর থেকে সুন্দরবন পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত হয়েছে। নিষেধাজ্ঞার সময় বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য স্বাভাবিক পরিবেশে থাকার সুযোগ পেয়েছে। বর্তমানে পর্যটকরা আবার সুন্দরবনের প্রাকৃতিক পরিবেশ উপভোগ করতে পারছেন।

তিনি জানান, শুরুতে আবহাওয়ার কারণে পর্যটকের উপস্থিতি কিছুটা কম থাকলেও বর্তমানে আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় প্রতিদিন দর্শনার্থীর সংখ্যা বাড়ছে। বিশেষ করে ছুটির দিনে বিভিন্ন জেলা থেকে পরিবার ও বন্ধুদের নিয়ে পর্যটকরা করমজলে আসছেন। তাদের নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ ভ্রমণের জন্য বন বিভাগের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা রয়েছে।

হাওলাদার আজাদ কবির আরও বলেন, অল্প সময়ের মধ্যে সুন্দরবনের প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য দেখার সুযোগ থাকায় করমজল পর্যটকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি গন্তব্য। নদীপথে আসার অভিজ্ঞতার পাশাপাশি ফুটট্রেইলে হাঁটার সময় গাছপালা, খাল ও বন্যপ্রাণী কাছ থেকে দেখার সুযোগ রয়েছে। পরিবার নিয়ে সময় কাটানো কিংবা শিশুদের প্রকৃতি ও বন্যপ্রাণী সম্পর্কে বাস্তব ধারণা দেওয়ার জন্যও করমজল উপযোগী বলে জানান তিনি।

পর্যটকদের সুন্দরবনের পরিবেশ রক্ষায় দায়িত্বশীল আচরণের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, বন বিভাগের নির্দেশনা মেনে চলতে হবে, যেখানে-সেখানে ময়লা-আবর্জনা ফেলা যাবে না এবং বন্যপ্রাণীকে বিরক্ত করা থেকে বিরত থাকতে হবে। পর্যটকদের সচেতনতা সুন্দরবনের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বন বিভাগের এই কর্মকর্তা আরও বলেন, সুন্দরবন দেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক ঐতিহ্য। পর্যটকরা এখানে এসে প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করবেন, তবে তাদের কর্মকা-ের কারণে যেন বনের পরিবেশের ক্ষতি না হয়, সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।

নিষেধাজ্ঞা শেষে পর্যটকদের উপস্থিতি বাড়ায় করমজলসহ সুন্দরবনের পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে আবারও কর্মচাঞ্চল্য ফিরেছে। পর্যটক বাড়ায় সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের মধ্যেও নতুন করে আশাবাদ তৈরি হয়েছে।

সুন্দরবন বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ এবং বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন। নদী, খাল, গাছপালা ও বন্যপ্রাণীর সমন্বয়ে করমজল দেশি-বিদেশি প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে আকর্ষণীয় একটি পর্যটনকেন্দ্র। নিষেধাজ্ঞা শেষে পর্যটকদের ফিরে আসা সুন্দরবনকেন্দ্রিক পর্যটন কার্যক্রমকে আবারও সক্রিয় করেছে। তবে এই প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য অক্ষুণ্ন রাখতে পর্যটকদের সচেতনতা এবং বন বিভাগের নিয়ম মেনে চলা গুরুত্বপূর্ণ।