দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নদীর নাম গড়াই। বাংলাদেশ পানি উন্নয়নন বোর্ড বা পাউবো কর্তৃক গড়াউ বা মধুমতি নদীর পরিচিতি নদী নং-২৪। গড়াই নদী গঙ্গা তথা পদ্মার একটি প্রধান শাখা নদী। কুষ্টিয়া শহরতলীর বারখাদা এবং হাটস হরিপুর গ্রামের মধ্যে ভাগ হয়ে বয়ে চলা গড়াই পদ্মা নদী হতে এই নদীর উৎপত্তি।
এই নদীর নামকরনের ব্যাপারে বাংলাপিডিয়ার তথ্যে জানা যায়, গ্রিক ভূগোলবিদ টলেমি তৎকালীন গঙ্গার পাঁচটি মুখের কথা উল্লেখ করেছিলেন। তাঁদের মধ্যে ‘কম্বরী খান’ নামে যে মুখের উল্লেখ পাওয়া যায়, সেটিকে কেউ কেউ গড়াই বলে মনে করেন। তবে বাংলাপিডিয়াও বিষয়টিকে সম্ভাবনা হিসেবে উল্লেখ করেছে, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়।
আসলে একটি নদীর বর্তমান নামের পেছনে শুধু স্থানীয় উচ্চারণ নয়, নদীর গতিপথ, পুরোনো নাম, প্রশাসনিক নথি এবং প্রাচীন ভূগোলের বিবরণ—সবকিছুই বিবেচনাধীন। প্রামাণ্য তথ্যের ভিত্তিতে গড়াই নদী অত্যন্ত প্রাচীন; এর পুরোনো নাম ‘গৌরী’। কিন্তু ‘গৌরী’ থেকে বর্তমান ‘গড়াই’ নামটি ঠিক কখন এবং কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সে বিষয়ে নির্ভরযোগ্য একক ঐতিহাসিক দলিল এখনো স্পষ্ট নয়।
স্থানীয় ভাষার বিবর্তনের কারণে ‘গৌরী’ নামটি পরিবর্তিত হয়ে ‘গোরাই/গোড়াই’ এবং পরবর্তীতে ‘গড়াই’ হয়েছে এমনটি বলা যেতে পারে।
গড়াই নদীর নামকরণের রহস্য পুরোপুরি উন্মোচন করতে হলে কুমারখালী ও কুষ্টিয়ার পুরোনো জমিদারি নথি, ব্রিটিশ আমলের জরিপ মানচিত্র, নদী-সংক্রান্ত সরকারি রেকর্ড, পুরোনো ভ্রমণবৃত্তান্ত এবং উনিশ শতকের সংবাদপত্র খুঁজে দেখা জরুরি।
বিশেষ করে ব্রিটিশ আমলের মানচিত্রে নদীটির নাম কীভাবে লেখা হয়েছে, সেটি অনুসন্ধান করলে ‘গৌরী’, ‘গোড়াই’, ‘গোরাই’ ও ‘গড়াই’ নামের পরিবর্তনের একটি সময়রেখা হতে পারে।
গড়াই নদী কুষ্টিয়াা শহরতলীর হাটস হরিপুর ইউনিয়নের হরিপুর ও বারখাদা পাশে তালবাড়িয়ার প্রবহমান পদ্মা নদী হতে উৎপত্তি লাভ করে মাগুরা জেলার শ্রীপুর উপজেলার নাকোল ইউনিয়ন পর্যন্ত প্রবাহিত হয়ে নতুন নাম মধুমতি নদীতে পতিত হয়েছে। একসময় গড়াই নদী দিয়ে গঙ্গার প্রধান ধারা প্রবাহিত হতো, যদিও হুগলি-ভাগীরথী ছিল গঙ্গার আদি ধারা।
কুষ্টিয়া জেলার উত্তরে হার্ডিঞ্জ রেল সেতুর ১৯ কিলোমিটার ভাটিতে তালবড়িয়াা নামক স্থান থেকে উৎপন্ন নদীটি জেলার ভিতর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে গণেশপুর নামক স্থানে ঝিনাইদহ জেলায় প্রবেশ করেছে। অতঃপর ঝিনাইদহ-কুষ্টিয়া সীমানা বরাবর প্রবাহিত হয়ে চাঁদট নামক গ্রাম দিয়ে রাজবাড়ী জেলায় প্রবেশ করেছে। ফরিদপুর জেলার সীমানায় প্রবাহিত হয়ে মধুমতি নদী নামে রুপান্তরিত হয়। নড়াইল ও বাগেরহাট জেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে পড়েছে সুন্দরবনে।
গড়াই নদী-মধুমতী নদীর গতিপথ আঁকাবাঁকা ও দীর্ঘ। গড়াই নামে ৮৯ কিমি, মধুমতী নামে ১৩৭ কিমি এবং বালেশ্বর নামে ১৪৬ কিমি অর্থাৎ মোট দৈর্ঘ্য ৩৭২ কিমি। গড়াইয়ের বহু শাখা-প্রশাখা রয়েছে, কুমার, কালীগঙ্গা, ডাকুয়া, বুড়ি গড়াই, বুড়িশাল ইত্যাদি গড়াইয়ের প্রধান শাখা। তাছাড়া নবগঙ্গা, চিত্রা, কপোতাক্ষ, সাতক্ষীরার গোলঘেসিয়া, এলেংখালী, আঠারোবাঁকি প্রভৃতি নদী এর সংস্পর্শে এসেছে বিভিন্ন স্থানে।
প্রাচীন কালে গড়াই নদী পদ্মার থেকে উৎপন্ন হওয়ায় নৌপথে পণ্য আদান প্রদানে বিশেষ সহযোগী হিসাবে কাজ করতো। দুই যুগ আগেও ছিল মালবাহী পানশীর নৌকার চলাচল। গড়াই নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে অনেক জনপদ। এর মধ্যে কুমারখালী শহর ও কয়া, গট্টিয়া গ্রাম অন্যতম। খোকসার জানিপুর বাজার, মাগুড়ার লাঙ্গলবাধ বাজার, কাতলাগাড়ী, খুলুমবাড়ি এই নদীর জন্য প্রশিদ্ধ। এছাড়াও গনেশপুর, চাঁদট বনগ্রাম, হিজলাবট, হরিপুর বাজার নদীর তীরে খ্যাতি পেয়েছে।এক সময় গড়াই নদীতে প্রচুর পরিমাণ মাছ ছিল, যা এ অঞ্চলের মানুষ আহরনের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করত। যদিও পানি স্বল্পতায় এখন চলছে মাছের আকাল। গড়াই বা মধুমতি নদীর তীরবর্তী অঞ্চল খুব উর্বর। ফসল উৎ্পাদনের জন্য বেশ অনুকূল।
কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর জীবনের অনেকগুলো দিন কাটিয়েছেন গড়াই-পদ্মা নদীর তীরে। তাঁর লেখায় বহুবার এ নদী দুটির প্রসঙ্গ এসেছে। গড়াই নদীকে কবি লিখতেন গৌরী নামে। আবার কখনো কখনো গোড়াই নামেও লিখেছেন তাঁর কবিতায়। মীর মশাররফ হোসেনও তাঁর সাহিত্যচর্চায় গড়াই নদীর বর্ননা করেছেন।
সুন্দরবনের মিঠা পানির একমাত্র উৎস গড়াই নদী আজ ফারাক্কার বিরুপ প্রভাবে তার গৌরব হারিয়েছে। নেই পানির সেই শ্রোতের গর্জন। বিশাল বিশাল বালুর চর নদীকে যেন হত্যা করেছে। সরকার কয়েক দফা খনন অব্যহত রেখে নদীকে প্রবাহমান রাখার চেষ্টা করছেন। নদীর চরে গড়ে তোলা হয়েছে সরকারী বেশ কয়েকটি আবাসন। বিভিন্ন এলাকায় ভাঙন রোধে বাঁধ দিয়ে নদীর গতিপথ রোধ করা হয়েছে। এখনো বর্ষা মওসুমে অনেক এলাকায় নদী ভাঙন দেখা যায়।
শুধুমাত্র কুষ্টিয়ায় জেলার মধ্যে গড়াই নদীর উপর তিনটি সড়ক ও একটি রেল সেতু নির্মিত হয়েছে। এছাড়া খোকসা উপজেলার জানিপুরে একটি ও রাজবাড়ীর লাঙ্গণবাঁধে একটি সেতু নির্মাণ প্রক্রিয়াধীন। সব মিলে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সার্বিক পরিবেশ, যাতায়াত, কৃষি, শিল্প-বানিজ্য ও জলবায়ুর পরিবর্তনের ক্ষেত্রে গড়াই বা মধুমতি নদী ব্যাপক ভূমিকা রাখছে এ কথা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা।