- ১৪টি ফোনালাপ উপস্থাপন
- ফোনালাপে উঠে এসেছে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
- নানক-নাছিরকে লাশ দিয়ে ইস্যু বানানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন
- ইন্টারনেট স্লো করতে পলককে কাদেরের নির্দেশ
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরকে নিষিদ্ধ করা অপরাধ ছিল বলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে যুক্তি তুলে ধরেছেন প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামীম। তিনি বলেছেন, আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ধরতে তৎকালীন আওয়ামী লীগ (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সরকার জামায়াত-শিবিরকে নিষিদ্ধ করেছিল। পরে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ধরে তাঁদের জামায়াত-শিবিরের সদস্য হিসেবে চিহ্নিত করা হতো। এ কারণে সে সময় জামায়াত-শিবিরকে নিষিদ্ধ করা ছিল অপরাধ।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ সাত আসামীর বিরুদ্ধে করা মামলায় গতকাল রোববার তৃতীয় দিনের মতো যুক্তিতর্ক উপস্থাপনকালে এ কথা বলেন প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার। ট্রাইব্যুনালে ১৪টি ফোনালাপ উপস্থাপন করা হয়েছে। এসব ফোনালাপে উঠেএসেছে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য।
বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ এই মামলার যুক্তিতর্ক চলছে। ট্রাইব্যুনালের অন্য দুই সদস্য হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
গতকালের যুক্তিতর্কে ওবায়দুল কাদের ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের মুঠোফোনে একটি কথোপকথন তুলে ধরার সময় জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধের প্রসঙ্গ আসে।
ট্রাইব্যুনালে ওই কথোপকথন তুলে ধরে প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার বলেন, ২০২৪ সালের ৩১ জুলাই ওবায়দুল কাদের ফোনে আসাদুজ্জামান খানকে জিজ্ঞাসা করেন, ‘কখন দিচ্ছেন?’ জবাবে আসাদুজ্জামান খান বলেন, ‘আমি তো এখনো ফাইল প্রসিডিউর প্রসেস করিনি। আমি এখন আইনমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলে ফাইল প্রসেস শুরু করব।’
ওই কথোপকথনে এরপর ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘আজকে তো দিবেন।’ জবাবে আসাদুজ্জামান খান বলেন, ‘হ্যাঁ, আইনমন্ত্রী মহোদয় তাই বলছেন, আজকেই করবেন। আমি, ওই ফাইলটা আমাদের এখান থেকে যাবে আইন মন্ত্রণালয়ে। আইন মন্ত্রণালয় থেকে প্রধানমন্ত্রীর একটা ইনিশিয়াল হওয়ার পরই এটা আপনার ফাইনাল হবে।’
এ পর্যায়ে ওবায়দুল কাদের জানতে চান, ‘তার মানে রাতের আগে হচ্ছে না।’ জবাবে আসাদুজ্জামান খান বলেন, ‘রাতের আগে হবে না। এটা যথার্থই বলেছেন।’
প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার বলেন, ওবায়দুল কাদের ও আসাদুজ্জামান খানের এই কথোপকথন জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তের সঙ্গে সম্পর্কিত।
নানক-নাছিরকে লাশ দিয়ে ইস্যু বানানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন
সাবেক মন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক ও চট্টগ্রামের সাবেক মেয়র আ.জ.ম. নাছির উদ্দীনের ফোনালাপে যুক্ত ছিলেন তৎকালীন সেতুমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরও। কথোপকথনে মুরাদপুরে নিহত একজনকে নিজেদের লোক দাবি করে জানাজা দিয়ে ‘ইস্যু’ করার নির্দেশ দেওয়ার কথা উঠে এসেছে।
প্রসিকিউশনের দাবি, ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই চট্টগ্রামের সাবেক মেয়র নাছির উদ্দীনকে ফোন করেন নানক। ফোনকলের শুরুতেই ওবায়দুল কাদেরকে কথা বলতে দেওয়া হয়। ফোনকলে চট্টগ্রামে চালানো সহিংসতার খবরাখবর জানান নাছির। একইসঙ্গে মুরাদপুরের তিনজন মারা গেছেন বলেও জানানো হয়। এর মধ্যে একজনকে নিজেদের লোক বলে দাবি করেন তিনি। প্রত্যুত্তরে ফোনের এপার থেকে বলা হয়, জানাজা-টানাজা পড়িয়ে একটা ইস্যু করেন। এমন নির্দেশ পেয়েও কোনো ইস্যু তৈরি করতে পারল না আওয়ামী লীগ। কারণ নিহত ব্যক্তি তাদের দলের কেউ ছিলেন না। ছাত্র-জনতাদেরই একজন। এজন্য তারা আর এ লাশ নিয়ে কোনো কিছু করেননি।
ফোনালাপের শুরুতে হইচই থাকায় কথা স্পষ্ট বোঝা যায়নি। তবে কোনো একজনকে ধন্যবাদ দেওয়ার শব্দ শোনা যায়। এর মধ্যেই ওবায়দুল কাদেরের কণ্ঠ ভেসে ওঠে। তিনি আ.জ.ম নাছিরের উদ্দেশে কথা বলেন।
ওবায়দুল কাদের: হ্যালো, নাছির কি করতেছে?
নাছির: জি ভাই, কাল থেকে তো ফাইট করছি। আজকেও তো ওই ইয়া না, সারাদিনই মারামারি। এখনও চলছে।
ওবায়দুল কাদের: ইউনিভার্সিটি কি ওই শিবিরের...?
নাছির: না, বিশ্ববিদ্যালয় গেছে না না না না... বিশ্ববিদ্যালয় পুরোপুরি একদম নিয়ন্ত্রণে আছে। ১০০ ভাগ নিয়ন্ত্রণে। বিশ্ববিদ্যালয় না। ওখান থেকে এখন টাউনে...।
ওবায়দুল কাদের: ইউনিভার্সিটি, চিটাগং কলেজ...?
নাছির: না না, এগুলো সব নিয়ন্ত্রণে। টাউনের ছোট একটা জায়গায় মুরাদপুর। ওদের সঙ্গে ফাইট হচ্ছে। ওরা বিভিন্ন জায়গা থেকে আইসা ওখানে গত প্রায় ২টা থেকে শুরু হইয়া এখনও পর্যন্ত চলছে। ওইখানে...।
ওবায়দুল কাদের: ওটা মুরাদপুর এক জায়গায়?
নাছির: মুরাদপুর একটা জায়গায়, একটা জায়গায়...। ছোট্ট একটা জায়গায়। ওইখানে ওই একপাশে ওরা...।আর আর পুরো চট্টগ্রাম পুরো কন্ট্রোলে। পুরো চট্টগ্রাম একদম ইউনিভার্সিটি...।
ওবায়দুল কাদের: আচ্ছা ঠিক আছে, তুমি... কথা বলো।
নাছির: আমি একদম দিচ্ছি। নিশ্চিন্তে থাকেন, ১০০ ভাগ নিশ্চিন্তে থাকেন। ইনশাআল্লাহ।
জাহাঙ্গীর কবির নানক: হ্যাঁ, নাসির?
নাছির: জি জি, স্লামালাইকুম।
জাহাঙ্গীর কবির নানক: কি অবস্থা?
নাছির: আমাদের এখানে পুরোপুরি ঠিক আছে। পুরো চট্টগ্রামে শুধু মুরাদপুর একটা জায়গায়, একটা জায়গায় শিবির ওই দিকে একটা অবস্থান নিছে। ওরা ওই খানে ফাইট হয়ে এই পর্যন্ত তিনজন মারা গেছে। বুঝছেন? ওই খানে গোলাগুলী চলতেছে।
জাহাঙ্গীর কবির নানক: তিনজন কারা? কারা মারা গেল?
নাছির: পথচারী আছে, ওদের একজন আছে, আমাদেরও একজন আছে। আর প্রচুর ইনজিউরি হইছে। প্রচুর ইনজিউরড হইছে। বুঝছেন না? প্রচুর দুই পক্ষেরই হইছে ওইখানে। ওইখানে আমরা একপাশে আছি। মুরাদপুরে একপাশে, মোড়ের ওপাশে ওরা, এইপাশে...।
জাহাঙ্গীর কবির নানক: নাছির ভাই?
নাছির: জি জি জি।
জাহাঙ্গীর কবির নানক: আমাদের যেটা মারা গেছে, সেটার জানাজা-টানাজা করেন। ওইটাকে ইস্যু করেন।
নাছির: ওইটাকে একটু ইস্যু করার চেষ্টা করতেছি। ওইটা এখন মেডিকেলে পাঠাইছে। ওইটা কনফার্ম করে, কনফার্ম করে তারপর ইয়া করবে।
জাহাঙ্গীর কবির নানক: ওইটাকে ইস্যু করেন, ওইটাকে ইস্যু করেন, হ্যাঁ? বি অ্যালার্ট, ওদের কিন্তু খুব খারাপ মতলব। বি অ্যালার্ট।
নাছির: হ্যাঁ, আর আর আর একটা বলি- আর সব পুরো একদম ১০০ পার্সেন্ট। ভার্সিটি থেকে আমি মানা করে দিছি যে, তোমরা ওখানেই থাকো। ভার্সিটি সবদিকে ঠিক আছে। ঠিক আছে, ১০০ ভাগ নিয়ন্ত্রণে, একদম ১০০ ভাগ নিয়ন্ত্রণে, ১০০ ভাগ নিয়ন্ত্রণে। আর চট্টগ্রাম শহরের সব জায়গায়, একটা জায়গায় ছোট্ট একটা জায়গায়...।
জাহাঙ্গীর কবির নানক: আচ্ছা থ্যাংক ইউ... থ্যাংক ইউ... থ্যাংক ইউ...।
নাছির: থ্যাংক ইউ।
এ মামলায় প্রসিকিউশনের আরও দুদিন যুক্তিতর্ক চলবে বলে জানিয়েছেন প্রসিকিউটর তামিম। এরপরই শুরু হবে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবীদের যুক্তি উপস্থাপন।
ওবায়দুল কাদের ছাড়া অন্য আসামীরা হলেন- আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল, ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক ওয়ালি আসিফ ইনান। আসামীরা সবাই পলাতক।
ইন্টারনেট স্লো করতে পলককে কাদেরের নির্দেশ
সাবেক তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের সঙ্গে ফোনালাপে ওবায়দুল কাদেরকে ইন্টারনেট স্লো করতে বলতে শোনা যায়।
কল রেকর্ডে পলক বলেন, “স্লামালাইকুম ভাই পলক বলছি।”
ওবায়দুল কাদের বলেন, “এটা একটু স্লো করে দাও, ইন্টারনেট।”
জবাবে পলক বলেন, “জ্বি, একটু নেত্রীর পারমিশনটা নিয়া নিই।”
এরপর ওবায়দুল কাদের বলেন, “নিয়া নাও।”
জুলাইয়ে পলকের নির্দেশে ৫৯ বিশ্ববিদ্যালয়ে
ইন্টারনেট বন্ধ করা হয়
চব্বিশের জুলাইয়ে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন চলাকালে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সাবেক প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের সরাসরি মৌখিক নির্দেশনায় দেশের ৫৯টি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করা হয়েছিল। বিটিআরসির এমন একটি দাপ্তরিক নথির কপি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দাখিল করেছেন প্রসিকিউশন।
নথিতে দেখা যায়, ইন্টারনেট সার্ভিস বন্ধ বা সীমিতকরণের এই সিদ্ধান্তটি পলকের নির্দেশে এবং বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে নেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে এই পদক্ষেপের ‘ভূতাপেক্ষ অনুমোদনের’ জন্য বিটিআরসির সংশ্লিষ্ট বিভাগ থেকে নথি উপস্থাপন করা হয়।
প্রসিকিউশনের দাখিল করা বিটিআরসির নথি অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই সন্ধ্যা ৬টা ৩১ মিনিটে নেটওয়ার্ক বন্ধের নির্দেশনা কার্যকর করা হয়। ওই সময় দেশের ৫৫টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও চারটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়সহ মোট ৫৯টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ১১৫৩টি সাইটে থ্রি জি ও ফোর জি নেটওয়ার্ক বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।