ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের সময় শেখ হাসিনার বোন শেখ রেহানা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানকে ফোন করে বাসায় না থাকতে বলেন। বাসা থেকে দ্রুত ‘সেইফ জোনে’ চলে যেতে বলেন। শেখ রেহানা ফোনে বলেন, “এক সেকেন্ডও দেরি কইরেন না, আল্লাহ যদি বাচাঁই রাখে কথা হবে”।

গতকাল সোমবার ট্রাইব্যুনালে তাদের কথোপকথনের অডিও বাজানো হয়। তখন এসব কথা শোনা যায়।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের সময় বোনকে নিয়ে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। মন্ত্রিপরিষদের সদস্যদেরও দেশ ছাড়ার তাগিদ দেন তারা। ফোন করেন একাধিক মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীকেও। তাদের একজন শেখ হাসিনার উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান। তাকে কল করেন শেখ হাসিনার বোন শেখ রেহানা।

জুলাই অভ্যুত্থানে কারফিউ দিয়ে গণহত্যায় উসকানিসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলার সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য ছিল গতকাল সোমবার। এ মামলার আসামি ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান ও সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। তাদের বিরুদ্ধে নবম সাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দিয়েছেন সিআইডির ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ উপ পরিদর্শক (এসআই) আতিকুর রহমান। ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের বিচারিক প্যানেলে তার জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়।

সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে সালমান এফ রহমানের সঙ্গে শেখ রেহানার একটি ফোনালাপ বাজিয়ে শোনানো হয় ট্রাইব্যুনালে। কথপোকথনের শুরু থেকেই শেখ হাসিনার এই উপদেষ্টাকে সরে যেতে তাড়া দেন শেখ রেহানা। দুই মিনিট ৯ সেকেন্ডের সেই কথপোকথনটি হুবহু তুলে ধরা হলো-

সালমান: হ্যালো।

কর্নেল রাজিব: সালামালাইকুম স্যার। স্যার কর্নেল রাজিব বলছি স্যার। রেহানা আপা একটু কথা বলতো ওভার টু ওভার স্যার।

সালমান: কে?

কর্নেল রাজিব: রেহানা আপা, রেহানা আপা। জ্বি স্যার।

রেহানা: স্লামালাইকুম ভাইয়া।

সালমান: হ্যাঁ, অলাইকুম সালাম।

রেহানা: জি আপনি কই?

সালমান: আমি আমার বাসায়।

রেহানা: থাইকেন না।

সালমান: থাকবো না, হ্যাঁ ঠিক আছে।

রেহানা: আমরা অন্য জায়গায় আছি, আমরা মানে ববি, টিউলিপ ওকে কনভিন্স করছে তো... কল না করতে পারলেও আল্লাহ যদি বাঁচাই রাখে কথা হবে।

সালমান: আচ্ছা, তো তোমরা অন্য জায়গায় চলে গেছ? আপাও গেছে?

রেহানা: জি ভাই। তো আপনি...

সালমান: আমরা যদি বাইর হইতে পারি, আমরা বের হয়ে যাবো। আনিসুল হককেই বের করে ফেলি সাথে?

রেহানা: হ্যাঁ, হ্যাঁ, যেটা হয় আপনি ইমিডিয়েটলি ওই যে শায়ান আর জয় যেটা বলছে আপনি ওইটা করেন।

সালমান: ঠিকাছে, ঠিকাছে। ওকে।

রেহানা: এক সেকেন্ডও দেরি কইরেন না। কারণ সম্পার বাসায় গেছে ফটো তুলছে এবং চারদিকে মানে সাদা জোব্বা পরা দাড়িওয়ালা এই আরকি। ইউ শুড বি (ুড়ঁ ংযড়ঁষফ নব) মানে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব। আর আমি কনভিন্স করতেছি যে, মানে যা আছে ঐটা করবো আরকি। এখানে একদম থাকা সেইফ না।

সালমান: আচ্ছা ঠিকাছে তাহলে ও কি বলবে মার্শাল ‘ল’ ডিক্লার করতেছে না সে?

রেহানা: ঐগুলো এখন বাদ দেন, ইউ শুড বি লিভ ইমিডিয়েটলি (ুড়ঁ ংযড়ঁষফ নব ষবধাব বসবফরধঃষু.)

সালমান: ওকে।

রেহানা: জ্বি ভাইয়া ফি-আমানিল্লাহ দোয়া করবেন।

সালমান: ফি আমানিল্লাহ।

রেহানা: স্লালামালাইকুম।

সালমান: অলাইকুমস্লাম।

নিজের এই কথপোকথনটি বেশ মনোযোগ দিয়ে শুনতে দেখা যায় সালমান এফ রহমানকে। যদিও ঠিক আগেই কাঠগড়ায় বসে সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের সঙ্গে কথা বলেন তিনি।

ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর সহিদুল ইসলাম সরদার। সঙ্গে ছিলেন প্রসিকিউটর আবদুস সাত্তার পালোয়ান, সুলতান মাহমুদ, মামুনুর রশিদ, মার্জিনা রায়হানসহ অন্যরা।

এদিকে, আতিকুর রহমানের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হলেও জেরার জন্য সময় চান আসামিপক্ষের আইনজীবী মুনসুরুল হক চৌধুরী। পরে আগামী ৮ জুন দিন ধার্য করেন ট্রাইব্যুনাল।

শাপলা চত্বরের ঘটনায় ইসলামিক টিভি তাদের সব ভিডিও আলামত ট্রাইব্যুনালে দেবে

রাজধানীর মতিঝিলে ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের মহাসমাবেশ ঘিরে হত্যাযজ্ঞের সময় ইসলামিক টিভির কাছে থাকা সব ভিডিও আলামত ট্রাইব্যুনালে দাখিল করা হবে বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ব্যারিস্টার শামস ইস্কান্দার।

গতকাল সোমবার বিকেলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে প্রেস ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা জানান। এদিন দুপুরে চিফ প্রসিকিউটরের সঙ্গে বৈঠক করে ইসলামিক টিভির একটি প্রতিনিধি দল।

শামস ইস্কান্দার বলেন, শাপলা চত্বরে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার তদন্ত চলছে। এরই ধারাবাহিকতায় সেদিনের ঘটনা জানতে আমাদের ডেকেছেন চিফ প্রসিকিউটর। ওই দিন যেহেতু আমাদের ক্যামেরাম্যান, নিউজের টিম উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া ওই রাতেই র‌্যাবসহ তৎকালীন সরকারের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন লোক এসে আমাদের অফিস ভেঙে ফেলেন। আমাদের সম্প্রচার সরঞ্জাম, কম্পিউটারস, এডিটিং প্যানেলসহ পুরো অফিস তছনছ করে বন্ধ করে দেওয়া হয়।

হুমায়ুন কবিরের জামিন শুনানি

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় লক্ষ্মীপুরে শিক্ষার্থীসহ পাঁচজনকে হত্যার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নেতা হুমায়ুন কবির পাটোয়ারীর জামিন সংক্রান্ত বিষয়ে আসামিপক্ষের শুনানি শেষ হয়েছে। এ বিষয়ে আগামী বৃহস্পতিবার প্রসিকিউশনের বক্তব্য শুনবেন ট্রাইব্যুনাল।

গতকাল সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেলে এ শুনানি অনুষ্ঠিত হয়।

শুনানিতে জামিন বহাল রাখার পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করেন আসামিপক্ষের আইনজীবী আবদুল কাইয়ুম। তিনি প্রসিকিউশনের জামিন বাতিলের আবেদন খারিজের প্রার্থনাও জানান।

প্রসিকিউশনের পক্ষে সময় চান প্রসিকিউটর ফারুক আহাম্মদ। এ বিষয়ে চিফ প্রসিকিউটর শুনানি করবেন বলে ট্রাইব্যুনালকে জানান তিনি। পরে আগামী বৃহস্পতিবার দিন ধার্য করেন ট্রাইব্যুনাল।