গাজীপুর মহানগর ও জেলার বিভিন্ন এলাকায় চুরি, ছিনতাই, ডাকাতিসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে রাতের আঁধারে গরু-মুরগি চুরি, বিদ্যুৎ ও এসির তার কেটে নেওয়া, বাড়িঘরে প্রবেশ করে স্বর্ণালংকার ও নগদ টাকা চুরি এবং সংঘবদ্ধভাবে হামলার ঘটনায় আতঙ্ক বাড়ছে। অপরাধীরা ছিনতাইয়ের পাশাপাশি এখন চুরির নতুন কৌশল বেছে নেওয়ায় বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
গাজীপুর মহানগরের নীলেরপাড়া, বাঙ্গালগাছ, ভোড়া, বালুচাকলি, কানাইয়া, ইছালি, আদাবৈসহ বিভিন্ন এলাকায় নিয়মিত চুরির অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। একই চিত্র জেলার বিভিন্ন গ্রামাঞ্চলেও। স্থানীয়দের অভিযোগ, রাত হলেই কোনো কোনো এলাকায় চোরচক্র সক্রিয় হয়ে ওঠে। গরু-মুরগি থেকে শুরু করে বৈদ্যুতিক তার, এসির তার ও বাড়ির মূল্যবান সামগ্রীও চুরি হচ্ছে।
প্রবাসীর খালি বাড়িতে চার লাখ টাকার চুরি
সর্বশেষ গাজীপুর সদর উপজেলার কালনী গ্রামে এক আমেরিকা প্রবাসীর বাড়িতে দুর্ধর্ষ চুরির ঘটনা ঘটেছে। প্রবাসী রফিকুল ইসলামের স্ত্রী লাবনী আক্তার বাড়িতে তালা লাগিয়ে পার্শ্ববর্তী দড়ি বলধা গ্রামে বাবার বাড়িতে গেলে রাতের কোনো একসময় চোরেরা রান্নাঘরের গ্রিল কেটে ঘরে প্রবেশ করে।
চোরেরা ঘরে থাকা স্বর্ণালংকার, নগদ ৩০ হাজার টাকা ও অন্যান্য মালামালসহ প্রায় চার লাখ টাকার সম্পদ নিয়ে যায় বলে অভিযোগ করা হয়েছে। পরে প্রতিবেশীরা মোবাইল ফোনে বিষয়টি জানালে লাবনী আক্তার দ্রুত বাড়িতে ফিরে চুরির ঘটনা দেখতে পান। এ ঘটনায় তিনি ১৬ আগস্ট জয়দেবপুর থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কালনীসহ আশপাশের এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে চুরি-ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে। পাশাপাশি গরু চোরের উৎপাত বেড়ে যাওয়ায় অনেকেই রাত জেগে গবাদিপশু পাহারা দিচ্ছেন।
ডাকাত বেশে বাড়িতে ঢুকে গৃহবধূ হত্যা
চুরি-ছিনতাইয়ের পাশাপাশি গাজীপুরে বাড়িতে ঢুকে হামলা ও হত্যার মতো ঘটনাও মানুষের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। গত ১৫ আগস্ট ভোররাতে কালীগঞ্জ উপজেলার নাগরী ইউনিয়নের নগরবেলা গায়েনবাড়ি এলাকায় রড-সিমেন্ট ব্যবসায়ী মঞ্জুরুল ইসলামের বাড়িতে ১০-১২ জনের একটি দল গ্রিলের গেটের তালা ভেঙে প্রবেশ করে বলে পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
দুর্বৃত্তরা বাড়িতে ঢুকে মঞ্জুরুল ইসলাম (৪১), তার স্ত্রী কামরুন নাহার আক্তার (৩৫) ও মেয়ে সানজিদা আক্তার মিম (১৬)-কে ধারালো অস্ত্র দিয়ে এলোপাতাড়ি কোপায়। এতে ঘটনাস্থলেই কামরুন নাহার নিহত হন। গুরুতর আহত মঞ্জুরুল ইসলাম ও তার মেয়েকে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। ব্যবসায়ী মঞ্জুরুল ইসলামের অবস্থা সংকটাপন্ন বলে জানা গেছে।
ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে গাজীপুরের পুলিশ সুপার মো. শরিফ উদ্দিন জানান, ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। আহতদের চিকিৎসার বিষয়েও পুলিশ খোঁজখবর রাখছে।
পুলিশ সুপার বলেন, 'আমরা কোনো বিষয়েই পিছিয়ে নেই। হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ ও ঘটনার পেছনের উদ্দেশ্য উদঘাটনে একাধিক তদন্ত ও আভিযানিক দল কাজ করছে। এটি নিছক হত্যাকাণ্ড, নাকি ডাকাতির আড়ালে অন্য কোনো উদ্দেশ্য ছিল—সব দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সিআইডি, পিবিআইসহ সংশ্লিষ্ট ইউনিটগুলোও কাজ করছে। আমরা দ্রুত ঘটনার রহস্য উদঘাটন করব এবং জড়িতদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করা হবে।'
তিনি আরও জানান, ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া আলামত, পারিপার্শ্বিক তথ্য ও প্রযুক্তিগত তথ্য বিশ্লেষণ করে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। কোনো সম্ভাবনাকেই তদন্তের বাইরে রাখা হচ্ছে না।
কালীগঞ্জ থানার ওসি মো. জাকির হোসেন বলেন, হামলার ধরন দেখে প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে, দুর্বৃত্তরা ডাকাতের বেশে বাড়িতে প্রবেশ করেছিল। তবে বাড়ি থেকে টাকা-পয়সা, স্বর্ণালংকার বা মূল্যবান কোনো মালামাল নিয়ে যাওয়ার তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে এটি নিছক ডাকাতির ঘটনা কি না, নাকি অন্য কোনো উদ্দেশ্যে হামলা চালানো হয়েছে—তা গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ক্রাইমসিন ইউনিট প্রয়োজনীয় আলামত সংগ্রহ করেছে এবং পুলিশের একাধিক দল তদন্তে কাজ করছে।
মহানগরে কৌশল পরিবর্তন করেছে অপরাধীরা
গাজীপুর মহানগরে আশঙ্কাজনক হারে চুরি বাড়ার বিষয়ে গাজীপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার মো. ইসরাইল হাওলাদার বলেন, 'আমরা বিষয়টি বুঝতে পারছি যে চুরির ঘটনা বেড়ে গেছে। তবে অপরাধীরা তাদের ছিনতাইয়ের কৌশল পরিবর্তন করেছে। আমরা ইতোমধ্যে অনেক ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় এনেছি। এখন তারা চুরির কৌশল বেছে নিয়েছে।'
তিনি বলেন, 'চুরির নতুন কৌশল মোকাবিলায় আমরা শিগগিরই সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিয়ে সমন্বিতভাবে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করব। অপরাধপ্রবণ এলাকাগুলোতে নজরদারি ও পুলিশি তৎপরতা আরও বাড়ানো হবে। অপরাধীদের নতুন কৌশল কোনোভাবেই সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাকে বিঘ্নিত করতে দেওয়া হবে না।'
মহানগরের নীলেরপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় চুরির অভিযোগ
এদিকে মহানগরের নীলেরপাড়া, বাঙ্গালগাছ, মোড়া, বালুচাকলি, কানাইয়া, ইছালি, আদাবৈসহ বিভিন্ন এলাকায় চুরির ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে। কোথাও বাড়ির গ্রিল কেটে চুরি, কোথাও গোয়ালঘর থেকে গরু-মুরগি নিয়ে যাওয়া, আবার কোথাও বৈদ্যুতিক ও এসির কপার তার কেটে নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।
স্থানীয়দের মতে, প্রতিনিয়ত এ সকল চুরির ঘটনা ঘটছে। অসংখ্য চুরির ঘটনা ঘটলেও অনেকে এই বিষয় নিয়ে থানা পুলিশের নিকট যেতে নারাজ। থানা পুলিশের নিকট যাওয়াকে অনেকে হয়রানির দৃষ্টিতে দেখছেন। স্থানীয়দের মতে, ছোটখাটো চুরির ঘটনা দ্রুত প্রতিরোধ করা না গেলে অপরাধীরা আরও বড় ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়তে পারে।
কালনীতে খালি বাড়িতে চুরি এবং কালীগঞ্জে বাড়িতে ঢুকে হত্যার ঘটনা একই সঙ্গে মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
তবে পুলিশ বলছে, অপরাধীদের কৌশল পরিবর্তনের বিষয়টি নজরে এসেছে। সে অনুযায়ী গোয়েন্দা নজরদারি, রাতের টহল ও অভিযান জোরদার করা হচ্ছে। মহানগর ও জেলা পুলিশের পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী বিশেষায়িত ইউনিটের সহায়তাও নেওয়া হচ্ছে।
নিরাপত্তায় পুলিশের পাশাপাশি নাগরিক সচেতনতাও জরুরি
আইনশৃঙ্খলা সংশ্লিষ্টদের মতে, চুরি প্রতিরোধে শুধু ঘটনার পর অভিযান নয়, অপরাধ সংঘটনের আগেই তা ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন। অপরাধপ্রবণ এলাকায় রাতের টহল, সিসিটিভি নজরদারি, সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ এবং চোরাই মালামাল কেনাবেচার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
একই সঙ্গে বাড়িঘর দীর্ঘসময় খালি রাখলে প্রতিবেশী বা স্থানীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে অবহিত করা, গোয়ালঘর ও বাড়িতে পর্যাপ্ত আলো ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা রাখা এবং সন্দেহজনক গতিবিধি দেখা গেলে দ্রুত পুলিশকে জানানোর পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
গাজীপুর শিল্পনগরী ও রাজধানীর নিকটবর্তী হওয়ায় এখানে দ্রুত জনবসতি বাড়ছে। ফলে জননিরাপত্তার বিষয়টিও ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। অপরাধীদের ছিনতাই থেকে চুরিতে কৌশল পরিবর্তন এবং চুরির পাশাপাশি কালীগঞ্জে বাড়িতে ঢুকে হত্যার মতো ঘটনা—দুটিই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ।
তবে মহানগর পুলিশ কমিশনার ও জেলা পুলিশ সুপারের বক্তব্যে স্পষ্ট, বিষয়টি পুলিশি নজরদারির বাইরে নেই। অপরাধীদের নতুন কৌশল শনাক্ত করে সমন্বিত অভিযান এবং দ্রুত গ্রেপ্তারের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার আশ্বাস দিয়েছে পুলিশ।