স্টাফ রিপোর্টার, গাজীপুরঃ
গাজীপুর মহানগরীর টঙ্গীর উত্তর বনমালা এলাকায় একই রাতে ছোট ভাইকে নির্মম হত্যা এবং বাবার মৃত্যুকে ঘিরে চাঞ্চল্যকর ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটন করেছে পুলিশ। তদন্ত, সিসিটিভি ফুটেজ এবং আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তি মিলিয়ে এটি একটি পরিকল্পিত জোড়া হত্যাকাণ্ড বলে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হয়েছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা।
এ ঘটনায় বড় ছেলে সাইফুর রহমান সোহানকে গ্রেফতার করে আদালতে পাঠানো হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি তার বাবা ও ভাইকে হত্যার কথা স্বীকার করেছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
নিহতরা হলেন, সোহেল দর্জি এবং তার ছোট ছেলে সাকিবুর রহমান শোয়েব (১৮)। রোববার ভোরে নিজ বাসা থেকে সাকিবের লাশ এবং বাড়ির পাশের বনমালা রেললাইন থেকে সোহেলের লাশ উদ্ধার করা হয়।
তদন্ত সূত্রে জানা যায়, পারিবারিকভাবে সোহানের খালাতো বোনের সঙ্গে তার বিয়ের কথা চলছিল। তবে ওই নারীর সঙ্গে ছোট ভাই সাকিবের গোপন প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। বিষয়টি জানাজানি হলে দুই ভাইয়ের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে দ্বন্দ্ব চলছিল, যা শনিবার রাতে তীব্র রূপ নেয়। ওই রাতে তাদের মধ্যে কথা কাটাকাটি ও হাতাহাতির ঘটনাও ঘটে।
একপর্যায়ে গভীর রাতে সবাই ঘুমিয়ে পড়লে সুযোগ বুঝে সোহান তার ছোট ভাইকে হাত-পা বেঁধে মুখে কাপড় গুঁজে দেয়। এরপর ধারালো ব্লেড দিয়ে তার হাত-পায়ের রগ কেটে নির্মমভাবে হত্যা করে। মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর ঘটনাটি আড়াল করতে হাত-পায়ের বাঁধন খুলে ফেলে রাখা হয়।
এ সময় পাশের কক্ষে থাকা বাবা সোহেল দর্জি পুরো ঘটনাটি দেখে ফেলেন। বিষয়টি ফাঁস হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় সোহান তাকে জোর করে বাড়ি থেকে বের করে বনমালা রেললাইনের দিকে নিয়ে যায়। সিসিটিভি ফুটেজে রাতের আঁধারে একজনকে ধরে রেললাইনের দিকে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য ধরা পড়ে। পুলিশ জানায়, সোহেল সেখান থেকে সরে যেতে পারেননি। পরবর্তীতে একটি চলন্ত ট্রেনের ধাক্কায় তিনি মারা যান। পুলিশ প্রাথমিকভাবে এটিকেও হত্যাকাণ্ডের অংশ হিসেবে দেখছে।
ঘটনার পর শুরুতে এলাকায় গুজব ছড়ানো হয়-বাবা নিজেই ছেলেকে হত্যা করে আত্মহত্যা করেছেন। তবে সিসিটিভি ফুটেজ ও প্রযুক্তিগত তথ্যপ্রমাণ সেই ধারণা ভেঙে দেয় এবং তদন্তের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
পুলিশ আরও জানায়, ঘটনার পর সোহানের আচরণ ছিল সন্দেহজনক। তিনি বিভিন্নজনকে ফোন করে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য দেওয়ার চেষ্টা করেন, যা তদন্তে অসঙ্গতি হিসেবে ধরা পড়ে এবং তাকে সন্দেহের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসে।
গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের ডিসি (ক্রাইম), মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, 'ত্রিভুজ প্রেম ও পারিবারিক দ্বন্দ্বের জেরে এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে বলে প্রতীয়মান। আটক ব্যক্তি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। আমরা বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করছি।'
টঙ্গী পূর্ব থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, মেহেদী হাসান বলেন, 'সাইফুর রহমান সোহান জিজ্ঞাসাবাদে প্রাথমিকভাবে তার বাবা ও ভাইকে হত্যার কথা স্বীকার করেছে। তাকে হত্যা মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়েছে।'
ঘটনাটি এলাকায় ব্যাপক শোক ও আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে। পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার সঙ্গে অন্য কেউ জড়িত আছে কিনা তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং ময়নাতদন্তসহ অন্যান্য তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে।