চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজে ‘জুলাই-আগস্ট’ আন্দোলনসংক্রান্ত দেয়ালচিত্র (গ্রাফিতি) পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। গতকাল মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) সকাল থেকে শুরু হওয়া উত্তেজনা বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সহিংস রূপ নেয়। সংঘর্ষে উভয়পক্ষের অন্তত ১০ জন আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। এর মধ্যে ছাত্রশিবিরের এক কর্মীর পায়ের গোড়ালি বিচ্ছিন্ন হওয়ার অভিযোগ উঠেছে, যা নিয়ে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
উত্তেজনা থেকে সংঘর্ষ : কলেজ সূত্রে জানা যায়, ক্যাম্পাসের একটি ভবনের দেয়ালে ‘জুলাই-আগস্ট’ আন্দোলনকে কেন্দ্র করে আঁকা গ্রাফিতিতে “ছাত্র রাজনীতি ও ছাত্রলীগমুক্ত ক্যাম্পাস” লেখা ছিল। অভিযোগ রয়েছে, কলেজ শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক আবদুল্লাহ আল মামুনের নেতৃত্বে একদল কর্মী সেখানে গিয়ে ‘ছাত্র’ শব্দটি মুছে ‘গুপ্ত’ শব্দ লিখে দেয়। এ ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দুই সংগঠনের মধ্যে উত্তেজনা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
সকাল থেকেই ক্যাম্পাসে পাল্টাপাল্টি স্লোগান ও অবস্থান কর্মসূচি চলতে থাকে। বেলা ১২টার দিকে দুই পক্ষ মুখোমুখি হলে শুরু হয় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, ইটপাটকেল নিক্ষেপ এবং সংঘর্ষ। প্রায় এক ঘণ্টাব্যাপী চলা এই সহিংসতায় সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং অনেকে নিরাপত্তার জন্য ক্যাম্পাস ত্যাগ করেন।
অস্ত্রধারীদের উপস্থিতি : সংঘর্ষ চলাকালে অন্তত কয়েকজনকে ধারালো দেশীয় অস্ত্র-কিরিস ও রামদা হাতে দৌড়াতে দেখা গেছে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, কিছু তরুণ মুখ আংশিক ঢেকে ও হেলমেট পরে সংঘর্ষস্থলের দিকে ছুটে যাচ্ছে। তাদের হাতে থাকা অস্ত্রগুলো বড় আকারের ধারালো ছুরি ও দা জাতীয়। তবে তারা কোন সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত, তা নিশ্চিত করতে পারেনি প্রশাসন।
স্থানীয়দের মতে, সংঘর্ষ শুরু হওয়ার পর ক্যাম্পাসের বিভিন্ন গেট ও করিডরে ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে এসব অস্ত্রধারীদের সক্রিয়তা পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তোলে।
গুরুতর আহতের ঘটনা : বিকেল সাড়ে চারটার দিকে সংঘর্ষের এক পর্যায়ে ছাত্রশিবিরের এক কর্মীর পায়ের গোড়ালি বিচ্ছিন্ন অবস্থায় দেখা যায় বলে দাবি করেছে সংগঠনটি। এ সংক্রান্ত একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে আহত ওই কর্মীকে রিকশায় করে নিয়ে যেতে দেখা যায়। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, তার পায়ের নিচের অংশ গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ছিল।
ছাত্রশিবির মহানগর দক্ষিণের সভাপতি মাইমুনুল ইসলাম মামুন অভিযোগ করেন, তাদের কর্মীরা পরীক্ষা দিতে এসে অপ্রস্তুত অবস্থায় পরিকল্পিত হামলার শিকার হয়েছেন। অন্যদিকে ছাত্রদলের পক্ষ থেকেও অভিযোগ করা হয়েছে, তাদের ওপর হামলা চালিয়েছে শিবির, যাতে তাদের কয়েকজন কর্মী আহত হয়েছেন।
প্রশাসনের হস্তক্ষেপ ও বর্তমান পরিস্থিতি : সংঘর্ষের পর কলেজ শিক্ষক ও পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। পরে ছাত্রশিবির বিক্ষোভ মিছিল করলে সেখানে আবারও উত্তেজনা তৈরি হয় বলে জানা গেছে।
কলেজের অধ্যক্ষ আবু সালেহ মোহাম্মদ নঈম উদ্দিন বলেন, “দুই পক্ষের মধ্যে হাতাহাতি ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।” কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আফতাব উদ্দিন জানান, অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে কাজ চলছে।
শিক্ষা কার্যক্রমে প্রভাব : উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির কারণে কলেজের অভ্যন্তরীণ ক্লাস ও কিছু পরীক্ষা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। তবে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন ডিগ্রি দ্বিতীয় বর্ষ ও মাস্টার্স পর্যায়ের নির্ধারিত পরীক্ষা চলমান রয়েছে। প্রশাসন জানিয়েছে, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ঘটনার পর থেকে ক্যাম্পাসে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। অস্ত্রধারীদের উপস্থিতি ও সংঘর্ষের তীব্রতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন শিক্ষক ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা। সংশ্লিষ্টরা দ্রুত তদন্ত করে দায়ীদের শনাক্ত ও শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।