নুরুল আমিন মিন্টু, চট্টগ্রাম ব্যুরো
বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের বিভাগীয় ভূ-সম্পত্তি দপ্তরে রেলভূমি লিজ ও টেন্ডার প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে নতুন করে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। হিজড়া (তৃতীয় লিঙ্গ) সম্প্রদায়ের সদস্য শ্রাবন্তি আক্তার জানান, ডেইরি ফার্ম ও হাঁস-মুরগির খামারের জন্য রেলের জমি লিজ পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে বিভাগীয় ভূ-সম্পত্তি কার্যালয়ের ট্রেসার মো. কাউছার হামিদ তার কাছ থেকে ৭ লাখ টাকা ঘুষ দাবি করেন এবং ধাপে ধাপে ৬ লাখ টাকা গ্রহণ করেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত লিজ না দিয়ে সংশ্লিষ্ট জমি টেন্ডারের মাধ্যমে অন্যের কাছে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
শুধু তাই নয়, অভিযোগের তদন্তের পরিবর্তে অভিযোগকারীকে হয়রানি করতে রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনী (আরএনবি) ও সিআরবি থানায় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য চিঠি দিয়েছেন বিভাগীয় ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তা মো. খোরশেদুল আলম চৌধুরী। এতে রেলওয়ের ভূমি ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে নতুন প্রশ্ন উঠেছে।
আবেদন থেকে টেন্ডার : অভিযোগপত্র অনুযায়ী, শ্রাবন্তি আক্তার ২০২৩ সালের ২৪ জুন চট্টগ্রামের হালিশহর এলাকায় বাংলাদেশ রেলওয়ের জমিতে ডেইরি ফার্ম ও হাঁস-মুরগির খামার স্থাপনের জন্য আবেদন করেন। পরে বিভাগীয় ভূ-বরাদ্দ কমিটি নীতিগতভাবে তার অনুকূলে লাইসেন্স দেওয়ার বিষয়ে সম্মতি জানায় বলে তিনি দাবি করেন।
কিন্তু দীর্ঘদিন দপ্তরে ঘুরেও কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় তিনি বুঝতে পারেন, ঘুষ ছাড়া লাইসেন্স পাওয়া সম্ভব নয়। এরপর অফিসের ট্রেসার কাউছার হামিদ তার কাছে ৭ লাখ টাকা দাবি করেন। অভিযোগ অনুযায়ী, ওই টাকা দিলে লাইসেন্স নিশ্চিত করার আশ্বাস দেওয়া হয়। সেই বিশ্বাসে তিনি ধাপে ধাপে ৬ লাখ টাকা পরিশোধ করেন। কিন্তু প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করে চলতি বছরের ২৩ মে একই জমির জন্য উন্মুক্ত টেন্ডার আহ্বান করা হয়।
টেন্ডারে অনিয়মের অভিযোগ : শ্রাবন্তি আক্তারের দাবি, ১৫ জুন অনুষ্ঠিত টেন্ডারে তিনি অংশ নেন। পরদিন টেন্ডার খোলার সময় ১০ জন দরদাতা অংশগ্রহণ করেন। প্রথমে মো. নজরুল ইসলাম দুলালকে সর্বোচ্চ দরদাতা ঘোষণা করা হলেও পরে তার কাগজপত্রে ত্রুটি থাকার বিষয়টি সামনে আসে।
অভিযোগকারী বলেন, কখনও বলা হয়েছে দুলালই সর্বোচ্চ দরদাতা, আবার পরে বলা হয়েছে তাকে বাদ দেওয়া হয়েছে। একই কমিটি ভিন্ন ভিন্ন সময়ে ভিন্ন অবস্থান নেওয়ায় পুরো প্রক্রিয়াটি প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।
তার অভিযোগ, টেন্ডারের কাগজপত্র যাচাইয়ের নামে সময়ক্ষেপণ করে নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। এ কারণে তিনি চলতি বছরের ২৮ জুন প্রধান ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তাসহ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ করেন। পরে ১৩ জুলাই টেন্ডার বাতিল করে পুনরায় টেন্ডার আহ্বানের আবেদনও করেন।
‘ট্রেসার হলেও পুরো অফিস তার নিয়ন্ত্রণে’ : অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়েছে, ট্রেসার পদে কর্মরত কাউছার হামিদই বিভাগীয় ভূ-সম্পত্তি দপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ ফাইল ও নথিপত্র নিয়ন্ত্রণ করেন। তার অনুমতি ছাড়া কোনো ফাইল নড়ে না। সাধারণ মানুষের কাছ থেকে টাকা নিয়ে লাইসেন্স পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
শ্রাবন্তির ভাষ্য, একজন তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী হয়েও কাউছার হামিদ বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। বিলাসবহুল বাড়িসহ কোটি কোটি টাকার সম্পদ গড়েছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি। যদিও এসব অভিযোগের পক্ষে কোনো সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন এখনো প্রকাশিত হয়নি।
আরেক অভিযোগে লাইসেন্সের শর্ত ভঙ্গ : শ্রাবন্তি আক্তার ৮ জুলাই আরেকটি অভিযোগ করেন। সেখানে তিনি দাবি করেন, জনৈক ব্যক্তি লাইসেন্সধারী ডেইরি ফার্ম করার শর্তে রেলের জমি নিয়ে সেখানে অবৈধভাবে গাড়ি পার্কিং ও গ্যারেজ পরিচালনা করছেন। তার দাবি, এ বিষয়ে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেননি।
অভিযোগকারীর বিরুদ্ধে পাল্টা পদক্ষেপ : অভিযোগকারী জানান, এসব অনিয়ম তুলে ধরার পর তাকে নানাভাবে চাপ দেওয়া হচ্ছে। বিভাগীয় ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তা মো. খোরশেদুল আলম চৌধুরী তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনী (আরএনবি) ও সিআরবি থানায় চিঠি পাঠিয়েছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি। এ ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে-দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তের আগে অভিযোগকারীকে কেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মুখোমুখি করা হলো।
কর্মচারীদের নিয়েও প্রশ্ন : ব্যবহারকারীর দেওয়া পিডিএফে দেখা যায়, বিভাগীয় ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তার কার্যালয়ের এক সিনিয়র সহকারী সচিব ২০ জুলাই ২০২৬ তারিখে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে একটি পৃথক পত্রে কার্যালয়ে প্রয়োজনীয় সংখ্যক ফোর্স মোতায়েনের অনুরোধ জানিয়েছেন। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, টেন্ডার কার্যক্রমে বহিরাগতদের উপস্থিতি, বিশৃঙ্খলা এবং দাপ্তরিক কাজে বিঘœ ঘটছে।
যা বলছেন অভিযুক্তরা : অভিযুক্ত ট্রেসার মো. কাউছার হামিদ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন,
“আমার যে কাজ করার কথা আমি করেছি। তিনি টেন্ডার না পেলে আমি কী করব। ৬ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা।”
অন্যদিকে বিভাগীয় ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তা মো. খোরশেদুল আলম চৌধুরী বলেন, “এই অভিযোগে কোনো তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়নি। টাকা দেওয়া-নেওয়ার প্রমাণ না পেলে কীভাবে ব্যবস্থা নেব?”
তদন্তের দাবি : একাধিক লিখিত অভিযোগে একই দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে ঘুষ, টেন্ডার কারসাজি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং লাইসেন্স বাণিজ্যের অভিযোগ ওঠায় বিষয়টি নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জোরালো হয়েছে।
বিশেষ করে একজন তৃতীয় লিঙ্গের আবেদনকারী ঘুষ দেওয়ার অভিযোগ করে বারবার লিখিত আবেদন করলেও অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে কোনো তদন্ত কমিটি গঠন না হওয়া এবং উল্টো অভিযোগকারীর বিরুদ্ধেই পদক্ষেপ নেওয়ার অভিযোগ রেলওয়ের ভূমি ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করেছে।
এখন সংশ্লিষ্ট মহলের প্রত্যাশা, অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলে রেলের ভূমি ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও কথিত সিন্ডিকেটের কার্যক্রম সম্পর্কে প্রকৃত চিত্র সামনে আসবে।