দৈনিক সংগ্রামের মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার আবু সালেহ মোহাম্মদ ত্বোহা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) কার্যনির্বাহী সদস্য আফসানা আক্তারের সঙ্গে নারী শিক্ষার্থীদের জন্য নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগ এবং ডাকসুর বাজেট নিয়ে কথা হয়।
সাক্ষাৎকারে আফসানা আক্তার নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, হয়রানি প্রতিরোধ, আবাসন সংকট, হলের বিভিন্ন সমস্যা, প্রশাসনের ভূমিকা, নারী শিক্ষার্থীদের জন্য নেওয়া বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরেন।
দৈনিক সংগ্রাম: নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও হয়রানি প্রতিরোধে আপনার সময়ে কী দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে?
আফসানা আক্তার: নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও হয়রানি প্রতিরোধে আমরা বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছি। অনলাইন হয়রানি ও সাইবার বুলিংয়ের শিকার নারী শিক্ষার্থীদের আইনি সহায়তা প্রদান করা হয়েছে।
ভবঘুরে ও নেশাগ্রস্ত মানুষের আখড়া হয়ে ওঠা সুফিয়া কামাল হলের ওভারব্রিজ অপসারণের জন্য প্রক্টর স্যারের নিকট বারবার আবেদন জানিয়েছি। ডাকসুর অনেকের প্রচেষ্টায় এটি অপসারণ হয়েছে।
এ ছাড়া রোকেয়া হলের সামনের পরিত্যক্ত যাত্রীছাউনি সংস্কার, শামসুন নাহার হলে লাইটিং বৃদ্ধি, মেয়েদের প্রত্যেকটি হলে প্রক্টরিয়াল টিমের টহল বৃদ্ধি এবং থানার সঙ্গে সমন্বয় করে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদারের জন্য বারবার তাগিদ দিয়েছি।
মৈত্রী ও ফজিলাতুন্নেছা হলের জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রশাসন ও সিটি করপোরেশনের সঙ্গে দফায় দফায় মিটিং করা হয়েছে। জলাবদ্ধতার সময় জরুরি সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। মৈত্রী হলে পানির সমস্যা দেখা দিলে জরুরি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। জরুরি ওষুধ সরবরাহ এবং পানির ল্যাব টেস্টের ব্যবস্থাও করা হয়েছে।
মেয়েদের হলের জন্য একটি আধুনিক বাসের ব্যবস্থা হয়েছে। চীনের অর্থায়নে যে হল নির্মাণের কথা রয়েছে, সেটি দ্রুত শুরু করার জন্য তাগিদ জানিয়েছি। ভিসি স্যার জানিয়েছেন, শিগগিরই কাজ শুরু হবে। বৃহৎ প্রকল্পের আওতায় যে পাঁচটি হল নির্মাণের কথা রয়েছে, সে বিষয়েও আমরা অনেকবার কথা বলেছি।
এ ছাড়া মেয়েদের হলে বর্তমানে যে এন্ট্রি-এক্সিটের সমস্যা হচ্ছে, তার যৌক্তিক সমাধান দ্রুত করার জন্য বারবার প্রশাসনের কাছে গিয়েছি। ডিজিটাল এন্ট্রি মেশিনের জন্য আমরা স্পন্সরও ম্যানেজ করেছিলাম। কিন্তু প্রশাসন এখনো তা কার্যকর করার ক্ষেত্রে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।
মেয়েদের হলে গরুর মাংস রান্না না হওয়ার বিষয়েও ভিসি স্যারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছি। মাতৃত্বকালীন ছুটির ব্যবস্থা হয়েছে। এ ছাড়া অসংখ্য শিক্ষার্থী নানা প্রয়োজনে যখনই নক করেছে, চেষ্টা করেছি সর্বোচ্চ সহায়তা দিতে। তবে অত্যন্ত দুঃখজনক বিষয় হলো, অধিকাংশ ব্যাপারেই আমাদের শুধু আশ্বাসের ওপর রাখা হয়েছে।
আমরা মেয়েদের চারটি হলে বড় পরিসরে সীরাত মাহফিল করেছি। শুধু মেয়েদের নিয়ে কার্জনে মাদুর পেতে ইফতার আয়োজন, ওয়ার্ল্ড হিজাব ডে র্যালি, বিনামূল্যে টিকাদান, স্যানিটারি ন্যাপকিন বিতরণসহ শুধু নারী শিক্ষার্থীদের জন্য এসব কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেছি।
দৈনিক সংগ্রাম: হলে নারী শিক্ষার্থীদের আবাসন সংকট কমাতে আপনি কী ভূমিকা রেখেছেন?
আফসানা আক্তার: অবকাঠামো নির্মাণ তো আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি, যেন চীনের সহযোগিতায় হল নির্মাণের কাজ দ্রুততম সময়ে শুরু হয়। ২ হাজার ৮৪১ কোটি টাকার বৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় মেয়েদের জন্য চারটি হল নির্মাণের কথা রয়েছে। সেই প্রকল্পের কাজ শুরু করার জন্যও প্রশাসনকে তাগিদ দিয়েছি।
অভিন্ন সিট নীতিমালা বাস্তবায়নের জন্য স্মারকলিপি ও মানববন্ধন করেছি। যাদের হলে সিট দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না, তাদের সবাইকে শিক্ষাবৃত্তির আওতায় নিয়ে আসার ব্যাপারেও কথা বলেছি।
সর্বোপরি, আমাদের পক্ষ থেকে আমরা বরাবরই প্রশাসনের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছি। সর্বশেষ ইসি মিটিংয়েও এসব দাবি আবার উত্থাপন করেছি। বিনিময়ে আশ্বাসই পেয়েছি—‘হবে, হচ্ছে’—এই।
আবু সালেহ মোহাম্মদ ত্বোহা: এক বছর পর আপনি কি মনে করেন, নারী শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা পূরণ করতে পেরেছেন? নাকি আরও অনেক কিছু করার ছিল?
আফসানা আক্তার: নারী শিক্ষার্থীরা যে এই ক্যাম্পাসে টিকে আছে, এটা একটা মিরাকল। আমাদের প্রশাসন সম্ভবত চায় না নারীরা উচ্চশিক্ষায় আসুক। অর্ধেকের বেশি নারী শিক্ষার্থীর জন্য মাত্র পাঁচটি হল আছে। হলের বাসগুলোও খুবই জীর্ণশীর্ণ। ক্যাম্পাসে অনিরাপত্তা, পর্যাপ্ত স্যানিটাইজেশনের ব্যবস্থা না থাকা, প্রতিনিয়ত অনলাইন হয়রানি, সাইবার বুলিং, ক্যাম্পাসে ভবঘুরে ও ছিন্নমূল মানুষের দ্বারা হেনস্থা, হলগুলোতে অযাচিত রেস্ট্রিকশন—সব মিলিয়ে এখানে টিকে থাকাটাই মিরাকল।
এই ১০৫ বছরের জঞ্জাল তো এক বছরে সাফ করা সম্ভব নয়। প্রশাসনের সদিচ্ছা ছাড়া এর কোনোটিই বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। আমরা আমাদের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ তাগিদ দিয়েছি। নারী শিক্ষার্থীদের জন্য অনেক কিছু করার চেষ্টা করেছি, তবে প্রত্যাশা পূরণ করতে পারিনি—এটা অবলীলায় স্বীকার করছি।
দৈনিক সংগ্রাম: প্রশাসন থেকে বাজেট পেয়েছেন?
আফসানা আক্তার: আমাদের সবার জন্য দুই ধাপে মোট ৩৫ লাখ টাকা পেয়েছি। আমার অংশে ১ লাখ টাকা বরাদ্দ পেয়েছি।