সাকীফ বিন আলম, ইবি
ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে জুলাইবিরোধী ভূমিকা পালন করলেও ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) আওয়ামীপন্থী শিক্ষকদের সংগঠন ‘শাপলা ফোরাম’-এর সহযোগীদের বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। চরম উগ্র ভূমিকা রাখা সত্ত্বেও শাস্তি না পেয়ে বহাল তবিয়তে রয়েছেন ফ্যাসিবাদের এসব সহযোগী। উল্টো বিচারের তোয়াক্কা না করে তারা গোপনে পুনরায় সংগঠিত হচ্ছেন এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে চাপে ফেলতে বিভিন্ন অস্থিতিশীল কর্মকাণ্ডে ইন্ধন দিচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
আন্দোলন দমাতে গোপনে ষড়যন্ত্র
ক্যাম্পাস সূত্রে জানা যায়, চব্বিশের কোটা সংস্কার আন্দোলন দমনে তৎকালীন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, আওয়ামীপন্থী শিক্ষক সংগঠন ‘বঙ্গবন্ধু পরিষদ’ ও ‘শাপলা ফোরাম’ নানা নীলনকশা প্রণয়ন করে। প্রাথমিকভাবে আন্দোলন দমনের পরিকল্পনা করা হয় ব্যবসায়ী প্রশাসন অনুষদের তৎকালীন ডিন অধ্যাপক ড. শেলীনা নাসরিনের কক্ষে। দুই দিনব্যাপী ওই বৈঠকে ১৫-২০ জন শিক্ষক উপস্থিত ছিলেন। পরবর্তীতে ডিনস লাউঞ্জ ও শিক্ষক সমিতি কার্যালয়ে ধারাবাহিকভাবে একাধিক গোপন বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ২ আগস্ট জুমার নামায শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে নিহতদের আত্মার মাগফেরাত কামনায় দোয়া এবং পরবর্তীতে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করেন আন্দোলনকারীরা। এ মিছিলে বিএনপি ও জামায়াতপন্থী কয়েকজন শিক্ষক একাত্মতা প্রকাশ করলে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় দপ্তর থেকে আন্দোলন কঠোরভাবে দমনের নির্দেশনা আসে। পরদিন ৩ আগস্ট তৎকালীন ভিসি অধ্যাপক ড. শেখ আবদুস সালাম প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে বসেন। একই দিন ভারপ্রাপ্ত ভিসিও তৎকালীন উপ-ভিসি অধ্যাপক ড. মাহবুবর রহমানের সভাপতিত্বে কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. আলমগীর হোসেন ভূঁইয়ার কার্যালয়ে প্রক্টর, সহকারী প্রক্টর ও শিক্ষক নেতাদের উপস্থিতিতে জরুরি বৈঠক হয়। সেখান থেকে যেকোনো মূল্যে আন্দোলন প্রতিহত করার ঘোষণা দেওয়া হয়। ওই দিনই আন্দোলনকারী ও সমর্থনকারী শিক্ষকদের তালিকা তৈরি করে গোয়েন্দা সংস্থা ও ঢাকায় পাঠানো হয়।
‘ফাইনাল খেলা’র হুমকি
৪ আগস্ট সকালে আওয়ামীপন্থী শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা ভিসির বাংলোয় বৈঠক করে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার শপথ নেন। পরবর্তীতে সাবেক প্রক্টর ড. মাহবুবর রহমানের নেতৃত্বে ‘আর নয় হেলাফেলা, এবার হবে ফাইনাল খেলা’ শিরোনামে একটি উগ্র প্রতিবাদ মিছিল বের করা হয়। প্রাপ্ত ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, অধ্যাপক ড. মাহবুবুল আরেফিন ও অধ্যাপক ড. শেলীনা নাসরিনসহ একাধিক শিক্ষক উসকানিমূলক স্লোগান দিয়ে আন্দোলন প্রতিহতের ঘোষণা দেন। একই দিন দুপুরে সাধারণ শিক্ষার্থীদের বিপুল উপস্থিতি দেখে পিছু হটলেও বৈষম্যবিরোধী মিছিলে হামলার প্রস্তুতি নেন বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা। এছাড়া গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের দিয়ে শিক্ষার্থীদের জোরপূর্বক ডেকে এনে ভয়ভীতি ও চাপ সৃষ্টির মাধ্যমে আন্দোলন প্রত্যাহারে বাধ্য করার পেছনেও শাপলা ফোরাম নেতৃবৃন্দের মূল ভূমিকা ছিল বলে জানা যায়।
বিচারের নামে প্রহসন ও সাজা মওকুফ
জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে আন্দোলনবিরোধী শিক্ষক-কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করতে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠিত হয়। তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ১৯ জন শিক্ষক ও ১১ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে সাময়িক বরখাস্ত এবং ৩৩ জন শিক্ষার্থীর সনদ বাতিলসহ বহিষ্কার করা হয়। তবে পরবর্তীতে শাস্তির চূড়ান্ত মাত্রা নির্ধারণী কমিটির পর পর দুজন আহ্বায়ক পদত্যাগ করলে বিচারপ্রক্রিয়া থমকে যায়। এরপর চলতি বছরের ১৮ মার্চ এক জরুরি সিন্ডিকেটে সাময়িক বরখাস্তকৃত ১৯ শিক্ষক ও ১১ কর্মকর্তার সাজা মওকুফ করে তাদের স্বপদে পুনর্বহাল করে তৎকালীন প্রশাসন।
চলছে গোপন বৈঠক ও নতুন ষড়যন্ত্র
বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, শাস্তি এড়ানোর পর শাপলা ফোরামের নেতারা পুনরায় সংগঠিত হতে এবং আর্থিক ফান্ড গড়ে তুলতে গোপন তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন। কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ ও শৈলকুপায় বিভিন্ন শিক্ষকের বাসায় গোপন বৈঠক করছেন তারা। জানা গেছে, ২২টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪ শতাধিক শিক্ষকের অংশগ্রহণে ‘প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজ’ নামে নতুন একটি প্ল্যাটফর্ম উন্মোচিত হয়েছে। যারা শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরাতে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের পক্ষে গোপন তৎপরতা চালাচ্ছেন।
গ্রীন ফোরাম সভাপতির বক্তব্য
সার্বিক বিষয়ে জামায়াতপন্থী শিক্ষক সংগঠন ‘গ্রীন ফোরাম’-এর সভাপতি অধ্যাপক ড. মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন,
“জুলাই বিপ্লববিরোধী ও হুমকিদাতার শাস্তির দাবিতে ছাত্র পরিষদ ও প্রশাসনের উদ্যোগে তদন্ত ও রিভিউ কমিটি গঠন করা হয়। তদন্ত কমিটি তথ্যের ভিত্তিতে বহিষ্কারের সুপারিশ করলেও পরবর্তীতে রিভিউ কমিটি তাদের বিষয়ে একাডেমিক ও প্রশাসনিক শাস্তির সুপারিশ করে। সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত এখনও আমাদের কাছে লিখিতভাবে স্পষ্ট নয়। আমরা জানতে পেরেছি যে সাময়িক বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করা হয়েছে, তবে রিভিউ কমিটির সুপারিশকৃত অন্যান্য শাস্তি (যেমন একাডেমিক ও প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি) বহাল রাখা হয়েছে কি না, তা নতুন প্রশাসন আসার কারণে এখনও আমাদের কাছে পরিষ্কার নয়। লিখিত সিদ্ধান্ত পেলে আমরা আমাদের পূর্ণাঙ্গ প্রতিক্রিয়া জানাতে পারতাম। আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ও সর্বোচ্চ বডি সিন্ডিকেটের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তবে স্পষ্ট বক্তব্য হলোÑ তাদের নিষিদ্ধ সংগঠনের তৎপরতা বা পুনরায় সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা পরিলক্ষিত হলে নতুন প্রশাসনের কাছে আমাদের দাবি, আইনগতভাবে সর্বোচ্চ কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।”
জিয়া পরিষদ সাধারণ সম্পাদকের প্রতিক্রিয়া
ইবি জিয়া পরিষদের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, “আমরা চেয়েছিলাম জুলাইয়ের ছাত্র-জনতার বিপ্লববিরোধীদের অপরাধ শনাক্ত করে কাক্সিক্ষত বিচারের আওতায় আনা হোক। প্রাথমিক কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে প্রশাসন তাদের সাময়িক বরখাস্ত করলেও, পরবর্তীতে রিভিউ কমিটির মাধ্যমে সবার বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করা হয়। আসলে সুনির্দিষ্ট আইনি ভিত্তি ও প্রমাণের অভাবেই হয়তো প্রশাসন চূড়ান্ত ব্যবস্থা নিতে পারেনি। তবে সীমাবদ্ধতা থাকলেও আন্দোলনবিরোধীদের অন্তত ন্যূনতম শাস্তি পাওয়া উচিত বলে আমরা মনে করি। এই বিচারের দাবি আমাদের তখনও ছিল, এখনও আছে।” নতুন প্রশাসনের পদক্ষেপ নিয়ে তিনি আরও যোগ করেন, “নতুন প্রশাসনের কাছে আমরা এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো দাবি-দাওয়া পেশ করিনি। তবে আমরা জুলাই বিপ্লবের চেতনার ব্যাপারে সবসময় আপসহীন। ফ্যাসিবাদের দোসর বা বিপ্লব বিরোধীরা যাতে নতুন করে কোনো ষড়যন্ত্রের ফাঁদ পাততে না পারে, সে বিষয়ে নতুন প্রশাসনকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেব এবং আমরা নিজেরাও সজাগ দৃষ্টি রাখছি।”
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বক্তব্য
সার্বিক বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ কে এম মতিনুর রহমান বলেন, “আগের প্রশাসন কোন যুক্তিতে তাদের বরখাস্ত করেছিল বা পরবর্তীতে কী বিবেচনায় সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেছে, তার ব্যাখ্যা আমি দিতে পারব না। তবে নিষিদ্ধ ঘোষিত কোনো রাজনৈতিক দল বা তাদের আদর্শিক অনুসারীরা যদি নতুন করে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করে এবং তার প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে অবশ্যই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”