সাকীফ বিন আলম, ইবি: আজ ৩০ আগস্ট, আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস। গুম হওয়া ব্যক্তিদের স্মরণে আন্তর্জাতিকভাবে পালিত হয় এই দিনটি। প্রতিবছর দিনটি বিশেষভাবে নাড়া দেয় ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষাথীদেরও। মনে করিয়ে দেয় ১৪ বছর পেরোলেও খোঁজ না মেলা গুমের শিকার দুই ইবি শিক্ষার্থী ওয়ালীউল্লাহ ও আল মুকাদ্দাসের কথা। আওয়ামী শাসনামলে প্রশাসনের সহযোগিতায় গুম হওয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আল ফিকহ্ এন্ড লিগ্যাল স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী ওয়ালিউল্লাহ ও আল হাদিস এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী আল মুকাদ্দাস ২০১২ সালের ৪ঠা ফেব্রুয়ারি রাতে নিখোঁজ হন।
আজ ২৯ আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত হিসাব করলে তাদের নিখোঁজ হওয়ার পর কেটে গেছে ১৪ বছর ৬ মাস ২৫ দিন (অথবা মোট ৫,৩২১ দিন)। দীর্ঘ এই সময়েও তাঁদের কোনো সন্ধান পায়নি পরিবার।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, ২০১২ সালের ২রা ফেব্রুয়ারি প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যক্তিগত কাজে ঢাকায় যান মুকাদ্দাস। ৪ঠা ফেব্রুয়ারি রাতে তিনি ও তাঁর বন্ধু ওয়ালীউল্লাহ রাজধানীর কল্যাণপুর থেকে কুষ্টিয়াগামী হানিফ পরিবহনের একটি বাসে ওঠেন। বাসের সুপারভাইজারের বরাতে স্বজনেরা জানান, বাসটি দিবাগত রাত ১২টার দিকে সাভারের নবীনগর এলাকায় পৌঁছালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে ৮ থেকে ১০ জন লোক বাসে উঠে মুকাদ্দাস ও ওয়ালিউল্লাহকে নামিয়ে নিয়ে যান। এরপর থেকে তাঁদের আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।
ঘটনার পর ৬ ফেব্রুয়ারি মুকাদ্দাসের নিখোঁজের বিষয়ে তাঁর চাচা আবদুল হাই রাজধানীর দারুস সালাম থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। অন্যদিকে ওয়ালিউল্লাহর নিখোঁজের ঘটনায় ৮ ফেব্রুয়ারি তাঁর বড় ভাই খালেদ সাইফুল্লাহ আশুলিয়া থানায় একটি জিডি করেন।
পুলিশ ও র্যাবসহ প্রশাসনের বিভিন্ন দ্বারে দ্বারে ঘুরে কোনো সুরাহা না পেয়ে নিখোঁজ দুই ছাত্রের পরিবার হাইকোর্টে দুটি রিট পিটিশন দায়ের করেন। ওই বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি রিটের শুনানি শেষে বিচারপতি আবদুল আউয়াল ও বিচারপতি মো. আকরাম হোসেন চৌধুরীর সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ নিখোঁজদের কেন আদালতে সশরীর হাজির করা হবে না, তা জানতে চেয়ে স্বরাষ্ট্রসচিব ও আইজিপিসহ ৯ কর্মকর্তার প্রতি রুল জারি করেন। তবে নির্ধারিত সময়ে কর্মকর্তারা আদালতকে জানান, তাঁরা দুই ছাত্রের কোনো সন্ধান পাননি।
পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ৯ মে আপিল বিভাগ হাইকোর্টের আদেশ স্থগিত করে লিভ টু আপিল করার নির্দেশ দেন। পরিশেষে, লিভ টু আপিলের শুনানি শেষে হাইকোর্টের আদেশ বাতিল করে বিচারপতি বজলুর রহমান ও বিচারপতি আকরাম হোসেন চৌধুরীর বেঞ্চ পর্যবেক্ষণসহ রিটটি খারিজ করে দেন।
ইবি ছাত্রশিবিরের সভাপতি ইউসুফ আলী বলেন, ২০১২ সালে তৎকালীন ক্ষমতাসীনদের সহায়তায় তাঁদের গুম করা হলেও ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার বিপ্লব-পরবর্তী বাংলাদেশে আজ পর্যন্ত তাঁদের কোনো সন্ধান মেলেনি, যা রাষ্ট্র ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের চরম ব্যর্থতা। গুমের পরিকল্পনায় জড়িত শিক্ষক-কর্মকর্তারা এখনো স্বপদে বহাল থাকায় গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করে অনতিবিলম্বে কুশীলবদের আইনের আওতায় আনা এবং দুই শিক্ষার্থীর সন্ধান নিশ্চিত করার জোরালো দাবি জানান তিনি; অন্যথায় সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিয়ে কঠোর আন্দোলনে নামার হুঁশিয়ারি দেন।
তিনি আরও বলেন, সন্তানহারা অসুস্থ বাবা-মায়ের দীর্ঘদিনের আহাজারি বন্ধে অবিলম্বে কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে হবে এবং স্বাধীন বাংলাদেশে আর কোনো মায়ের বুক যেন খালি না হয় তা নিশ্চিত করতে হবে। কোনো স্বাধীনচেতা নাগরিক যেন আর গুম বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার না হন, সে বিষয়ে অঙ্গীকার ব্যক্ত করে বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে দেশে যেকোনো ধরনের নতুন ফ্যাসিবাদের অপছায়া অঙ্কুরেই উপড়ে ফেলতে তিনি দেশের সচেতন নাগরিক সমাজকে ঐক্যবদ্ধ ও সজাগ থাকার উদাত্ত আহ্বান জানান।
এ বিষয়ে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ কে এম মতিনুর রহমান বলেন, “গভর্নমেন্ট এ ব্যাপারে কাজ করছে। আশাকরি গভর্নমেন্ট এটা নিয়ে পদক্ষেপ নিবে।”
আজ আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবসে এসে নিখোঁজ ওয়ালীউল্লাহ ও মুকাদ্দাসের পরিবার ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা পুনরায় এই ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করছেন। স্বজনদের আকুল আকুতি—জীবিত কিংবা মৃত, প্রিয় মানুষগুলোর অন্তত চূড়ান্ত পরিণতি সম্পর্কে স্পষ্ট সত্য জানতে চান তাঁরা।