ববি সংবাদদাতা: বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (ববি) কোস্টাল স্টাডিজ অ্যান্ড ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট (সিডিএম) বিভাগের চেয়ারম্যান ড. হাফিজ আশরাফুল হকের অপসারণের দাবিতে আন্দোলনে নেমেছেন বিভাগের শিক্ষার্থীরা।

সেশনজট, একাডেমিক কার্যক্রমে ধীরগতি, চেয়ারম্যানের কর্তৃত্বমূলক আচরণসহ নানা অভিযোগ তুলে রোববার (৩০ আগস্ট) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে চেয়ারম্যানের কক্ষ, শ্রেণিকক্ষ ও অফিস কক্ষে তালা ঝুলিয়ে দেন তারা।

পরে শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের কার্যালয়ের সামনে ব্যানার টাঙিয়ে অবস্থান নেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের আশ্বাসে ২৪ ঘণ্টার জন্য তখন আন্দোলন স্থগিত করেন তারা। রাতে সংবাদ সম্মেলন করে নিজেদের দাবির বিষয়টি তুলে ধরেন শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীদের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে একই দিন বিভাগের ছয় শিক্ষক সেশনজট ও একাডেমিক কার্যক্রম নিয়ে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরে একটি বিবৃতি দেন।

শিক্ষার্থীরা সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেন, ড. হাফিজ আশরাফুল হককে দ্রুত বিভাগীয় চেয়ারম্যানের পদ থেকে পদত্যাগ এবং বিভাগ থেকে অপসারণ করতে হবে। তাদের অভিযোগ, বিভাগে নিয়মিত একাডেমিক ক্যালেন্ডার না থাকায় যথাসময়ে ক্লাস ও পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হচ্ছে না। চেয়ারম্যানের অনিয়মিত ক্লাস নেওয়া ও কর্তৃত্বমূলক আচরণের কারণে প্রায় ১৫০ শিক্ষার্থী সেশনজটে পড়েছেন বলেও দাবি করেন তারা।

শিক্ষার্থীরা আরও জানান, ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের অন্যান্য বিভাগে মাস্টার্সের কার্যক্রম শেষ হলেও এই বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ভর্তি কার্যক্রম এখনো শুরু হয়নি। ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের তৃতীয় বর্ষের অর্ধেক ক্লাসও শেষ হয়নি বলে দাবি তাদের। এ ব্যাচে চেয়ারম্যানের চারটি কোর্স রয়েছে বলেও জানান তারা।

তাদের দাবি, ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের ৩৬ মাস অতিবাহিত হলেও দ্বিতীয় বর্ষের ফাইনাল পরীক্ষার বিষয়ে কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের প্রথম বর্ষ শেষ করতেই ১৬ মাস সময় লেগেছে। এ শিক্ষাবর্ষের ১২টি কোর্সের মধ্যে চেয়ারম্যানের অধীনে থাকা কোর্সগুলোও যথাযথভাবে শুরু হয়নি বলে অভিযোগ করেন তারা। এছাড়া ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের পরীক্ষাও নির্ধারিত সময়ে অনুষ্ঠিত হয়নি বলে দাবি শিক্ষার্থীদের।

শিক্ষার্থীরা আরও অভিযোগ করেন, একাডেমিক ক্যালেন্ডারের দাবি জানালে তাদের একটি একাডেমিক ক্যালেন্ডার দেওয়া হলেও সেটি বাস্তবায়ন হয়নি। একই সঙ্গে নম্বর টেম্পারিংয়ের অভিযোগও তোলেন তারা। তাদের দাবি, চেয়ারম্যানের সঙ্গে সুসম্পর্ক রয়েছে এমন শিক্ষার্থীদের বেশি নম্বর দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এমনকি কোনো কোনো কোর্সের ল্যাব অনুষ্ঠিত না হলেও শিক্ষার্থীদের ভালো গ্রেড দেওয়ার অভিযোগ করেন তারা।

শিক্ষকদের ব্যাখ্যা

এদিকে শিক্ষার্থীদের অভিযোগের পর বিভাগের চেয়ারম্যান ড. হাফিজ আশরাফুল হকসহ ছয় শিক্ষক এক বিবৃতিতে সেশনজট ও একাডেমিক কার্যক্রমে ধীরগতির বিভিন্ন কারণ তুলে ধরেছেন।

বিবৃতিতে শিক্ষকরা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাদেশ অনুযায়ী জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে অধ্যাপক বা সহযোগী অধ্যাপকদের মধ্য থেকে তিন বছরের জন্য বিভাগীয় চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়া হয়। তবে বিভাগের সূচনালগ্নে অধ্যাপক বা সহযোগী অধ্যাপক না থাকায় জ্যেষ্ঠ সহকারী অধ্যাপককে দায়িত্ব দেওয়া হয়। পরবর্তীতে নতুন শিক্ষক নিয়োগে বিলম্ব এবং বিভাগের অপর দুই জ্যেষ্ঠ শিক্ষকের শিক্ষা ছুটিতে থাকায় বর্তমান চেয়ারম্যানকে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে।

শিক্ষকরা জানান, সিডিএম একটি বিশেষায়িত ও অপ্রতুল বিষয় হওয়ায় দ্বিতীয় পরীক্ষক ও প্রশ্ন মডারেটর পাওয়া কঠিন। উপযুক্ত পরীক্ষক নির্ধারণে জটিলতার কারণে উত্তরপত্র মূল্যায়ন ও ফলাফল প্রকাশে সময়ক্ষেপণ হচ্ছে।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, বহিরাগত পরীক্ষকদের সম্মানী তুলনামূলক কম হওয়া, বিল পরিশোধে প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতা এবং ডাক যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে অনেক শিক্ষক দ্বিতীয় পরীক্ষক বা মডারেটর হিসেবে দায়িত্ব নিতে আগ্রহী হন না। এসব বিষয় বিভাগের সরাসরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে বলেও উল্লেখ করেন তারা।

এ ছাড়া পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক দপ্তরের অতীতের ফাইল অনুমোদন, রেজাল্ট শিট প্রসেসিং ও অন্যান্য প্রশাসনিক জটিলতার কারণে তৈরি হওয়া ব্যাকলগ এখনো ফলাফল প্রকাশের ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলছে বলে জানান শিক্ষকরা।

বিভাগে পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকা এবং একাধিক ব্যাচের জন্য মাত্র একটি শ্রেণিকক্ষ বরাদ্দ থাকাকেও সেশনজটের অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে বিবৃতিতে। শিক্ষকরা বলেন, সীমিতসংখ্যক শিক্ষককে নিয়মিত ক্লাস, পরীক্ষা, খাতা মূল্যায়নসহ বিভিন্ন একাডেমিক ও প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে।

বিবৃতিতে আরও উল্লেখ করা হয়, ২০১৮ ও ২০১৯ সালে খণ্ডকালীন শিক্ষকদের মাধ্যমে বিভাগের অতিরিক্ত পাঠদানের চাপ সামাল দেওয়া সম্ভব হলেও ২০১৯ সাল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) খণ্ডকালীন শিক্ষক নিয়োগের বরাদ্দ বন্ধ করে দেওয়ায় অতিরিক্ত পাঠদানের পুরো দায়িত্ব বর্তমান শিক্ষকদের ওপর এসে পড়েছে।

বিভাগের শিক্ষকরা বলেন, সেশনজট নিরসন ও শিক্ষার্থীদের একাডেমিক ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে তারা আন্তরিকভাবে কাজ করছেন। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট উচ্চতর প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে দ্রুত সেশনজট নিরসনে সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন তারা।

বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেছেন ড. হাফিজ আশরাফুল হক, তাসনিম যেরিন, মোমতাহিনা মিতু, ইরতেজা হাসান, ইতি খান মিতু ও আসিম আবরার।

উল্লেখ্য, ২৪ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও কোনো সমাধান না হওয়ায় আজ পূণরায় উপাচার্যের দপ্তর ঘেরাও করে আন্দোলন শুরু করেছেন শিক্ষার্থীরা। দাবি মেনে নেওয়া না হলে আমরণ অনশন কর্মসূচি পালনের হুশিয়ারী দিয়েছেন তারা।