খুলনা মহানগরীর দৌলতপুরের দেড়শ’ বছরের প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ সরকারি মুহসিন মাধ্যমিক বিদ্যালয় এখন শিক্ষক সংকটে ধুঁকছে। তীব্র শিক্ষক স্বল্পতায় ব্যাহত হচ্ছে পাঠদান, যার চূড়ান্ত প্রভাব পড়ছে ফলাফলে। সম্প্রতি বিদ্যালয়টির নবম শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষায় গণিত বিষয়ে শিক্ষার্থীদের ‘গণফেল’ সেই করুণ চিত্রই ফুটিয়ে তুলেছে। তবে এই ফলাফল বিপর্যয় আড়াল করতে কর্তৃপক্ষ তড়িঘড়ি করে বিশেষ পরীক্ষা নিয়ে অকৃতকার্যদের পাশ করিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এতে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীদের মেধার ভিত্তি ও ভবিষ্যতের এসএসসি পরীক্ষা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
জানা গেছে, নবম শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষায় ১২০ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ৫১ জনই গণিত বিষয়ে ফেল করেন। এর মধ্যে বিজ্ঞান বিভাগের ৮ জন, ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের ২৭ জন এবং মানবিক বিভাগের ১৬ জন শিক্ষার্থী ছিলেন। একটি সরকারি স্কুলে গণিতে এমন গণহারে অকৃতকার্য হওয়ার ঘটনা খুলনার অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানে সচরাচর দেখা যায় না।
অভিযোগ রয়েছে, বিষয়টি জানাজানি হলে স্কুলের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হওয়ার ভয়ে কর্তৃপক্ষ অতি গোপনে তা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চালায়। অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের এক মাসের মাথায় ৫০ নম্বরের একটি ‘বিশেষ’ পরীক্ষা নিয়ে সকলকে পাস করিয়ে দশম শ্রেণিতে উন্নীত করা হয়। ভবিষ্যতে বিতর্কের দায় এড়াতে স্কুল কর্তৃপক্ষ কৌশলে অভিভাবকদের কাছ থেকে লিখিতও নিয়ে রেখেছে বলে জানা গেছে।
বিশেষ ব্যবস্থায় পাস করিয়ে শিক্ষার্থীদের ওপরের ক্লাসে তোলা হলেও তাদের শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অভিভাবকরা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক অভিভাবক জানান, গণিতের মতো মৌলিক বিষয়ে যাদের ভিত্তি দুর্বল, তাদের কোনোমতে উত্তীর্ণ করে দিলে আগামী বছরের এসএসসি পরীক্ষায় বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটার সম্ভাবনা রয়েছে। মূল পরীক্ষার আগে এই বিশাল সংখ্যক শিক্ষার্থীর ঘাটতি পূরণ না হলে সরকারি স্কুল হিসেবে প্রতিষ্ঠানের পাশের হার এবং অর্জিত জিপিএ-৫ এর সংখ্যা তলানিতে গিয়ে ঠেকবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
১৮৬৭ সালে হাজী মুহাম্মদ মহসিন ফান্ডের অর্থায়নে প্রতিষ্ঠিত এই স্কুলটি ২০১৬ সালে সরকারীকরণ করা হয়। বর্তমানে ১৭ একর জমির ওপর বিশাল এই বিদ্যাপীঠে প্রায় ৬০০ ছাত্র অধ্যয়নরত থাকলেও পাঠদানের জন্য পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই। বিদ্যালয়ে ২৫ জন শিক্ষকের পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ১৪ জন। এর মধ্যে বাংলা, ইংরেজি ও গণিত-এই তিনটি মৌলিক বিষয়ের জন্য রয়েছেন মাত্র ৬ জন শিক্ষক। অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, হিসাববিজ্ঞান, কম্পিউটার, কৃষি শিক্ষা ও ইসলাম শিক্ষা পড়ানোর মতো কোনো নিয়মিত শিক্ষকই এখন বিদ্যালয়ে নেই।
১৮৯৫ সালে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্থায়ী স্বীকৃতি পাওয়া এই স্কুলটি খুলনার অন্যতম প্রাচীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে এখানে শিক্ষার মান নিম্নমুখী। ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালের ফলাফল আরও খারাপ হয়েছে। পাসের হার মোটামুটি থাকলেও সরকারি স্কুল হিসেবে জিপিএ-৫ এর সংখ্যা নামমাত্র। অভিভাবক ও সচেতন মহলের দাবি, দ্রুত শিক্ষক সংকট সমাধান না করলে এই ঐতিহ্যবাহী সরকারি প্রতিষ্ঠানটি তার শিক্ষা গৌরব হারাবে। যেসকল পরীক্ষার্থী গণফেল করার পর নতুন ক্লাসে উন্নীত হয়েছে তাদের এসএসসির বড় ধরনের বিপর্যয় সংখ্যা থেকে গেছে।
বিদ্যালয়টির ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক শহিদুল ইসলাম জোয়ার্দ্দার বলেন, শিক্ষক সংকটের বিষয়টি সঠিক। হিসাববিজ্ঞান ও কম্পিউটার বিষয়ের শিক্ষক না থাকায় আমাদের অন্যভাবে ম্যানেজ করতে হয়। স্কুলের উপস্থিতি আগে থেকে বাড়ানো হয়েছে। নবম শ্রেণির ফলাফল বিপর্যয়ের পিছনে অনেক কারণ।করোনা কালীন সময়ে অনেকেই লেখাপড়া থেকে দূরে ছিল, নিয়মিত ক্লাসে না আসা এবং বাড়িতে ভালো করে না পড়া এসব কারণেই মূলত ফলাফল বিপর্যয় হয়েছে। আমি অকৃত কর্য ছাত্রকেই কাউকেই উত্তীর্ণ করতে চাইনি তবে অবিভাবকদের চাপে পরবর্তীতে একটি পরীক্ষা নিয়ে সকলকে উত্তীর্ণ করা হয়েছে। এ বিষয়ে অভিভাবকদের কাছ থেকে লিখিত নেয়া হয়েছে।