মুহাম্মদ নূরে আলম
দক্ষিণ এশিয়ার দ্রুত বর্ধনশীল ও জনবহুল নগরীগুলোর মধ্যে তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে সবচেয়ে বড় আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষতির মুখে পড়তে যাচ্ছে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক ঋণদাতা সংস্থা বিশ্বব্যাংক প্রকাশিত এক নতুন প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। সংস্থাটির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তীব্র থেকে অতি-তীব্র রূপ নেওয়া গরমের কারণে কর্মক্ষমতা ও জীবনীশক্তি হ্রাস পাচ্ছে সবচেয়ে বেশি কর্মক্ষম নগরবাসীর। বিশ্বব্যাংকের “বসবাসযোগ্য ভবিষ্যৎ: দক্ষিণ এশিয়ার শহরে চরম তাপের মধ্যে কর্মসংস্থান ও প্রবৃদ্ধি সুরক্ষার উপায়” শীর্ষক বিশ্বস্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাবের কারণে চরম তাপপ্রবাহ বাড়তে থাকায় ২০৩০ সালের মধ্যে ঢাকায় বছরে আনুমানিক ৪ লাখ ৬৫ হাজার পূর্ণকালীন চাকরির সমপরিমাণ কর্মঘণ্টা নষ্ট হবে। এটি ওই সময়ে ঢাকার মোট কর্মঘণ্টার প্রায় ৩ শতাংশের সমান। এই তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে ২০২৪ সালে তাপপ্রবাহের কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতির আনুমানিক ১৩০ থেকে ১৮০ কোটি মার্কিন ডলার ক্ষতি হয়েছে (জিডিপির প্রায় ০.৩% থেকে ০.৪%)। তাপমাত্রা ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে উঠলে উৎপাদনশীলতা ক্ষতির হার দ্রুত বাড়ে। আইএলও, আইএফসি ও কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্কলন অনুযায়ী কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ২০৩০ সালের মধ্যে চার দেশে পোশাক রপ্তানিতে সর্বোচ্চ ৬৫.৮ বিলিয়ন ডলার ক্ষতি হতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের তথ্যের পাশাপাশি জার্মানিভিত্তিক বিখ্যাত গবেষণা সংস্থা অ্যাডেলফি গ্লোবাল-এর প্রকাশিত ‘হিট, হেলথ অ্যান্ড দ্য ইনক্রিজিং কস্টস অব লিভিং-আ কল ফর অ্যাকশন’ প্রতিবেদনে বাংলাদেশের দুই প্রধান শ্রমঘন খাত কৃষি ও নির্মাণ শিল্পকে নিয়ে সতর্ক করা হয়েছে। প্রতিবেদনের তথ্যানুসারে, তাপজনিত তীব্র চাপে ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের কৃষি ও নির্মাণ খাতের শ্রমিকেরা বছরে গড়ে ২৩.৭৫ কর্মদিবসের সমপরিমাণ কাজ হারাতে পারেন। এমনকি বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণ কমলেও কর্মঘণ্টা হারানোর হার কমবে না; বরং কৃষি ও নির্মাণ খাতে ক্ষতির হার বর্তমানের ৬.২৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০৩০ সালে ৯.৫৮ শতাংশে পৌঁছাবে। ২০২০ থেকে ২০৩৯ সালের মধ্যে বাংলাদেশের অধিকাংশ এলাকায় বছরে ১৮৩ থেকে ২৩৯ দিন তাপমাত্রা ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যাবে, যা অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের জীবনের সরাসরি ঝুঁকি বাড়িয়ে দেবে।
প্রতিবেদনের আশঙ্কাজনক বার্তা হলো, যদি কার্বন নিঃসরণ এবং বৈশ্বিক উষ্ণায়ন প্রতিরোধে কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়া হয়, তবে ২০৫০ সালে ঢাকায় কর্মঘণ্টা হারানোর এই পরিমাণ বেড়ে দাঁড়াবে ৭ লাখ ৮ হাজার পূর্ণকালীন চাকরির সমপরিমাণে। এমনকি ২০৮০ সালে এটি ভয়াবহ রূপ নিয়ে ১৬ লাখ ৫০ হাজার পূর্ণকালীন চাকরির সমান ক্ষতি সাধন করবে; যা ঢাকার মোট কর্মঘণ্টার প্রায় ৭.৪ শতাংশের সমান। ২০৩০ সালের মধ্যে কৃষি ও নির্মাণ খাতের শ্রমিকদের গড়ে ২৩.৭৫ কর্মদিবসের সমপরিমাণ কাজ হারানোর আশঙ্কা। ২০২০-২০৩৯ সালের মধ্যে দেশে বছরে ১৮৩ থেকে ২৩৯ দিন তাপমাত্রা ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পার হওয়ার প্রাক্কলন। দক্ষিণ এশিয়ার ৮ শহরের মধ্যে শীর্ষে ঢাকা বিশ্বব্যাংক দক্ষিণ এশিয়ার আটটি প্রধান অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি ও জনবহুল শহরের মধ্যে চরম তাপপ্রবাহের একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরেছে। শহরগুলো হলো; ঢাকা, নয়াদিল্লি, কলকাতা, মুম্বাই, চেন্নাই, আহমেদাবাদ, সুরাট ও বারানসি।
দক্ষিণ এশিয়ার শহরের তুলনামূলক চিত্র: আটটি শহরের ক্রমানুসারে ঢাকার ক্ষতি সবচেয়ে বেশি (৪.৬৫ লাখ)। এরপর রয়েছে কলকাতা (৩.৬০ লাখ), নয়াদিল্লী (২.৬৬ লাখ), মুম্বাই (২.০৪ লাখ), চেন্নাই (১.৪১ লাখ), আহমেদাবাদ (৯৯ হাজার), সুরাট (৯৭ হাজার) ও বারানসি (৫১ হাজার)। এদিকে ২০১৩ সালের হিট অ্যাকশন প্ল্যানের মাধ্যমে প্রথম ২ বছরে মৃত্যুর হার ৪৭% হ্রাস ও ২,৩৮০ জনের প্রাণ রক্ষা পাওয়া এবং ১ ডলারে ৫০ ডলার প্রাপ্তির হিসাব বিশ্বব্যাংকের কেস স্টাডির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, চরম তাপের কারণে ক্ষতির তালিকায় দক্ষিণ এশিয়ায় শীর্ষ স্থানে রয়েছে ঢাকা। ২০৩০ সালে পূর্ণকালীন চাকরির সমপরিমাণ ক্ষতি হলো: ঢাকা ৪,৬৫,০০০টি, কলকাতা ৩,৬০,০০০টি, নয়াদিলীø ২,৬৬,০০০টি, মুম্বাই ২,০৪,০০০টি, চেন্নাই ১,৪১,০০০টি, আহমেদাবাদ ৯৯,০০০টি, সুরাট (ভারত) ৯৭,০০০টি, বারানসি ৫১,০০০টি। পরিসংখ্যান পরিষ্কারভাবে প্রমাণ করে যে, প্রতিবেশী ভারতের ব্যস্ততম ও অতি-উষ্ণ শহরগুলোর চেয়েও ঢাকার আর্থিক ও শ্রমশক্তির ক্ষতি বহুগুণ বেশি হতে যাচ্ছে।
আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ: আর্দ্রতা ও তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে বিশ্বজুড়ে শ্রমশক্তির উৎপাদনশীলতা হ্রাস পেলেও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও), আইএফসি ও কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্লোবাল লেবার ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষণে সতর্ক করা হয়েছে যে; উপযুক্ত পদক্ষেপ না নিলে ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ার পোশাক খাতে মোট রপ্তানি ক্ষতি হতে পারে সর্বোচ্চ ৬৫.৮ বিলিয়ন (৬,৫৮০ কোটি) ডলার। এমন ঝুঁকির বিপরীতে লক্ষ্যভিত্তিক অর্থায়ন কীভাবে টেকসই পরিবর্তন আনতে পারে, বাংলাদেশ তার বিশ্বমানের উদাহরণ তৈরি করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ২০১৬ সালে ‘গ্রিন ট্রান্সফরমেশন ফান্ড’ বা পরিবেশবান্ধব রূপান্তর তহবিল চালু করার পর থেকে দেশে পরিবেশবান্ধব কারখানার বিপ্লব ঘটেছে। যা বাংলাদেশকে বিশ্ব পোশাক রপ্তানি বাজারে পরিবেশবান্ধব উৎপাদনের শীর্ষে স্থান দিয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণ বলছে, আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থায় প্রতি ১ ডলার বিনিয়োগ করলে ৫০ ডলার সমপরিমাণ অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়া যায়। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মাধ্যমে অনুরূপ কার্যকর পরিকল্পনা নিতে হবে। ঢাকা শহর বর্তমানে সিমেন্ট আর কংক্রিটের এক উত্তপ্ত দ্বীপে পরিণত হয়েছে। খোলা প্রাঙ্গণ, পুকুর, খাল রক্ষা এবং প্রতিটি ওয়ার্ডে সবুজায়নের মাধ্যমে শহরের গড় তাপমাত্রা ১-২ ডিগ্রি কমানো সম্ভব। কৃষি, রিকশাচালক ও নির্মাণ শ্রমিকদের জন্য কাজের সময় পরিবর্তন (ভোর বা সন্ধ্যায় কাজ করা), পর্যাপ্ত খাবার পানির ব্যবস্থা এবং তাপদাহের দিনগুলোতে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর মাধ্যমে আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা করা। নতুন ভবন তৈরিতে ইনসুলেশন প্রযুক্তি, বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা এবং পরিবেশবান্ধব ও কম তাপ-শোষণকারী নির্মাণসামগ্রীর ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা।
বিশিষ্ট পরিবেশকর্মী ও বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন-বাপা’র সাধারণ সম্পাদক আলমগীর কবির দৈনিক সংগ্রামকে বলেন, আমাদের জনসংখ্যার একটি বড় অংশ সবসময় গরিব হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে। এর বড় কারণ জলবায়ু পরিবর্তন, তাপমাত্র বৃদ্ধি। জলবায়ু পরিবর্তনের এই অদৃশ্য আঘাত মানুষের জীবন ও জীবিকাকে একেবারে পিষে দিচ্ছে। প্রচন্ড গরমে মানুষের মেজাজ খিটখিটে করে দিচ্ছে, গরমের কারণে কর্ম ক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে এবং স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। বাংলাদেশে মোট চিকিৎসা ব্যয়ের প্রায় ৮০ শতাংশই নাগরিককে নিজের পকেট থেকে বহন করতে হয়। তীব্র গরমে সানস্ট্রোক, পানিশূন্যতা, কিডনি জটিলতা এবং হিট স্ট্রোকের মতো অসুস্থতায় চিকিৎসা খরচ চালাতে গিয়ে কোটি কোটি প্রান্তিক মানুষ তাদের জমানো পুঁজি হারিয়ে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাচ্ছেন। এই অবস্থায় পরিবেশ রক্ষা করতে না পারলে আমাদের অবস্থা আরও খারাপের দিকে যাবে?
তিনি বলেন, পরিবেশ রক্ষা করতে হলে, বেশি করে গাছ লাগাতে হবে, জলাধার ও জলাশয় রক্ষা করতে হবে। ঢাকা ও তার আশেপাশের এলাকার পুকুর-ডোবা আর ভরাট করা চলবে না। ঢাকায় নতুন বহুতল ভবনে কাঁচ ব্যবহার কমাতে হবে এবং এসির ব্যবহারও কমাতে হবে। একটি এসির বিপরীতি ১০টি গাছ লাগাতে হবে।
স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এবং ক্যাপসের চেয়ারম্যান ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, দক্ষিণ এশিয়ায় ঢাকা কেবল বাংলাদেশের অর্থনীতির রাজধানী নয়, বরং কোটি মানুষের রুটি-রুজির প্রধান কেন্দ্র। বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর এই ভয়াবহ সতর্কবার্তা থেকে পরিষ্কার—যদি এখনই জাতীয় জলবায়ু নীতি, শহর পরিকল্পনা এবং সামাজিক সুরক্ষায় বৈপ্লবিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ না করা হয়, তবে শুধু জলবায়ুর উত্তাপেই ধসে পড়তে পারে ঢাকা তথা পুরো বাংলাদেশের সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি। সমন্বিত পরিকল্পনা এবং বাস্তবসম্মত বিনিয়োগই পারে এই ভয়াবহ ‘তাপ বিপর্যয়’ থেকে বাংলাদেশের অর্থনীতি ও শ্রমশক্তিকে রক্ষা করতে।