খুলনা ব্যুরো
দেশের বিদ্যুৎ খাতে স্বস্তি আনতে যে ক’টি বড় মেগা প্রকল্পের ওপর বিশেষ ভরসা করা হয়েছিল, তার মধ্যে বাগেরহাটের রামপালে অবস্থিত মৈত্রী সুপার থার্মাল পাওয়ার প্রজেক্ট অন্যতম। বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ উদ্যোগে নির্মিত এই ১৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্রটি দেশের বিদ্যুৎ সরবরাহের গ্রিডে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। কিন্তু উদ্বোধনের পর থেকেই বিভিন্ন সময় নানা ধরনের কারিগরি ত্রুটি, রক্ষণাবেক্ষণ সমস্যা এবং কয়লা সংকটের মতো বাস্তবতায় বারবার খবরের শিরোনাম হয়েছে এই কেন্দ্রটি। এরই ধারাবাহিকতায় আবারও যান্ত্রিক ত্রুটির জালে আটকা পড়েছে প্রকল্পটির দ্বিতীয় ইউনিট। রোববার বেলা ১১টা থেকে আকস্মিক কারিগরি ত্রুটির কারণে সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে রামপাল তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের এ ইউনিটটি। যদিও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দাবি করছে যে প্রথম ইউনিটটি সচল থাকায় জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ বর্তমানে স্বাভাবিক রয়েছে, তবুও একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদন ইউনিট এভাবে বারবার বন্ধ হয়ে যাওয়া দেশের সার্বিক বিদ্যুৎ ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা এবং প্রকল্পের দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন ও উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
বাগেরহাট জেলার রামপালে অবস্থিত ১৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার মৈত্রী সুপার থার্মাল পাওয়ার প্রজেক্টের দ্বিতীয় ইউনিটটি গত রোববার বেলা ১১টা থেকে পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। আকস্মিকভাবে দেখা দেওয়া কারিগরি ত্রুটির কারণে এই অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়। বিদ্যুৎকেন্দ্রের দায়িত্বশীল সূত্রগুলো জানিয়েছে, ত্রুটি সারাতে ইতোমধ্যে প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিবিদরা কাজ শুরু করেছেন। তবে ক্ষতিগ্রস্ত ইউনিটটি পুনরায় চালু হতে অন্তত চার দিন সময় লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কেন্দ্রটির মানবসম্পদ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক আনোয়ারুল আজিম গণমাধ্যমকে বিষয়টি নিশ্চিত করে জানিয়েছেন যে, কারিগরি ত্রুটির কারণে দ্বিতীয় ইউনিটটি বন্ধ রয়েছে এবং এটি সচল করার জন্য দ্রুত মেরামতের কাজ চলছে। তবে ঠিক কী ধরনের বা কী প্রকৃতির কারিগরি ত্রুটি দেখা দিয়েছে, সে বিষয়ে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে নির্দিষ্ট করে কোনো বিস্তারিত তথ্য দিতে পারেন নি।
দ্বিতীয় ইউনিট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদনে আংশিক ঘাটতি দেখা দিলেও, স্বস্তির বিষয় হলো কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিটটি এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিকভাবে চালু রয়েছে। প্রথম ইউনিট থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ নিয়মিতভাবে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হচ্ছে। ফলে তাৎক্ষণিকভাবে দেশব্যাপী বড় ধরনের কোনো লোডশেডিংয়ের আশঙ্কা বা বড় কোনো বিপর্যয়ের খবর পাওয়া যায়নি। বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের দাবি, প্রথম ইউনিটের এই অবিরাম উৎপাদন চলমান থাকায় সাধারণ ভোক্তারা আপাতত বড় ধরনের ভোগান্তির হাত থেকে রক্ষা পাচ্ছেন। তা সত্ত্বেও, একটি বড় ইউনিটের আকস্মিক নিষ্ক্রিয়তা সামগ্রিক উৎপাদন সক্ষমতাকে যে কমিয়ে দেয়, তা অস্বীকার করার জো নেই।
প্রকল্পের পটভূমি ও দীর্ঘ পথপরিক্রমা
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় বন্ধুত্বের প্রতীক এবং অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী এ প্রকল্পের ইতিহাস বেশ দীর্ঘ। ২০১০ সালে বাংলাদেশ ও ভারত যৌথভাবে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে একটি বড় তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করে। এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে ২০১২ সালের ২৯ জানুয়ারি বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) এবং ভারতের রাষ্ট্রীয় খাতের প্রতিষ্ঠান এনটিপিসি লিমিটেডের মধ্যে একটি আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
এই চুক্তির সফল বাস্তবায়নের জন্য ‘বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কোম্পানি (প্রা.) লিমিটেড’ বা সংক্ষেপে বিআইএফপিসিএল (ইওঋচঈখ) নামে একটি যৌথ উদ্যোগ কোম্পানি গঠিত হয়। এই কোম্পানির অধীনেই বাগেরহাট জেলার রামপাল উপজেলার রাজনগর ও গৌরম্ভা ইউনিয়নের সাপমারী কৈ-গর্দ্দাশকাঠি মৌজায় ১ হাজার ৩৪ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়। প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকা বিশাল ব্যয়ে বাস্তবায়িত হয় এই ১৩২০ মেগাওয়াট মৈত্রী সুপার থার্মাল পাওয়ার প্রজেক্ট, যা রামপাল তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র হিসেবে দেশজুড়ে পরিচিত।
বাণিজ্যিক যাত্রা ও বারবার উৎপাদন বন্ধের রেকর্ড
দীর্ঘ নির্মাণকাজ এবং নানামুখী প্রক্রিয়া শেষে ২০২২ সালের ২৩ ডিসেম্বর রামপাল তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিট আনুষ্ঠানিকভাবে বাণিজ্যিক উৎপাদনে যায়। এরপর প্রায় এক বছর পর ২০২৩ সালের ২৪ অক্টোবর পরীক্ষামূলকভাবে উৎপাদনে প্রবেশ করে দ্বিতীয় ইউনিটটি। সবশেষে সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে ২০২৪ সালের ১২ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করে এই দ্বিতীয় ইউনিট।
তবে কাগজপত্রে বাণিজ্যিক উৎপাদনের দীর্ঘ গৌরবগাথা থাকলেও, বাস্তব চিত্রটি বেশ ভিন্ন। স্থানীয় ও জাতীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদনে যাওয়ার পর থেকে বিভিন্ন ধরনের কারিগরি ত্রুটি, যান্ত্রিক জটিলতা, যন্ত্রাংশের ত্রুটি এবং অনেক সময় জ্বালানি তথা কয়লা সংকটের কারণে এই বিদ্যুৎকেন্দ্রটির উৎপাদন ৩০ বারেও বেশি সময় ধরে বন্ধ হয়েছে। একটি মেগা প্রকল্পে এ ধরনের ঘন ঘন যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেওয়া বিদ্যুৎ খাতের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ঘন ঘন ত্রুটির কারণ ও বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ
বিশেষজ্ঞদের মতে, বড় আকধংঃবৎ বা সুপার থার্মাল পাওয়ার প্লান্টে কারিগরি ত্রুটি হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়, তবে তা যদি নিয়মিত বিরতিতে বারবার ঘটে, তবে তা প্লান্টের রক্ষণাবেক্ষণ মান, যন্ত্রাংশের গুণগত মান কিংবা পরিচালনা প্রক্রিয়ার দুর্বলতাকেই নির্দেশ করে। রামপাল প্রকল্পের ক্ষেত্রে বারবার ইউনিট বন্ধ হওয়ার মূল কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে বয়লারের সমস্যা, টারবাইনে ত্রুটি, কনভেয়র বেল্ট বা কয়লা সরবরাহ লাইনে জটিলতা এবং গ্রিড আউটেজজনিত সমস্যা।
একটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ইউনিটগুলো চালু করার পর তা আবার ঠান্ডা করে মেরামত করা এবং পুনরায় চালু করা অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল প্রক্রিয়া। বারবার এই প্রক্রিয়া পুনরাবৃত্তির ফলে কেবল উৎপাদন খরচই বৃদ্ধি পায় না, বরং প্লান্টের দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্বও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এছাড়া, দেশের দক্ষিণাঞ্চলের বিদ্যুৎ চাহিদার একটি বড় অংশের জোগানদাতা হিসেবে এই কেন্দ্রটির নিরবচ্ছিন্ন সচল থাকা অত্যন্ত জরুরি।
নির্ধারিত চার দিনের মধ্যেই প্রকৌশলীদের নিবিড় প্রচেষ্টায় রামপালের দ্বিতীয় ইউনিটটির ত্রুটি দূর হবে এবং এটি পুনরায় জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহে যুক্ত হতে পারবে। তবে দীর্ঘমেয়াদে দেশের জ্বালানি খাতের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে এ ধরনের স্পর্শকাতর ও ব্যয়বহুল প্রকল্পগুলোর মান নিয়ন্ত্রণ এবং নিয়মিত তদারকি আরও জোরদার করা সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।