স্টাফ রিপোর্টার

দেশে ডেঙ্গুর সংক্রমণ দ্রুত বাড়ছে। চলতি বছর এখন পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা গত তিন বছরের একই সময়ের তুলনায় সর্বোচ্চ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, ১ জানুয়ারি থেকে ৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৪০ হাজার ৪৪ জন। এ সময়ে মৃত্যু হয়েছে ১১১ জনের। জনস্বাস্থ্যবিদ ও কীটতত্ত্ববিদেরা আশঙ্কা করছেন, চলতি সেপ্টেম্বরেই পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। তাঁদের মতে, ঢাকার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এডিস মশার বিস্তার, মশা নিয়ন্ত্রণে ঘাটতি এবং ডেঙ্গু ভাইরাসের ডেন–২ ও ডেন–৩ সেরোটাইপের মিশ্র উপস্থিতি সংক্রমণ বাড়ার পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে দুই সেরোটাইপের উপস্থিতিই সংক্রমণ বৃদ্ধির নিশ্চিত কারণÑএমন সিদ্ধান্তে এখনই পৌঁছানো যাচ্ছে না।

রাজধানীর ফার্মগেটের একটি বেসরকারি হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে গতকাল শুক্রবার সকালে ডেঙ্গু আক্রান্ত স্বজনদের নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন বিভিন্ন বয়সি ১০ জন মানুষ। তাঁদের একজন খালেদা আক্তার। তাঁর ২২ বছর বয়সী ছেলে ফাতেমি ডেঙ্গুতে আক্রান্ত। দুটি সরকারি হাসপাতালে গিয়েও ছেলের জন্য শয্যা পাননি বলে জানান তিনি।

ওই বেসরকারি হাসপাতালের পুরুষ রোগীদের জন্য নির্ধারিত ছয়টি শয্যার একটিও তখন খালি ছিল না। একটি কেবিন খালি থাকলেও এর দৈনিক ভাড়া ৮ হাজার টাকা। বেসরকারি স্কুলের শিক্ষক খালেদা আক্তারের জন্য এ ব্যয় বহন করা কঠিন। তবু ছেলের চিকিৎসার জন্য কেবিন নেওয়ার কথাই ভাবছিলেন তিনি। খালেদা আক্তার বলেন, ‘শেষ পর্যন্ত কেবিনটাই নিতে হবে। ছেলের জীবন আগে। তিন দিনে অনেক টাকা গেছে। আরও হয়তো যাবে। উপায় নেই।’

তিন মাসে দ্রুত বেড়েছে রোগী

দেশে বড় পরিসরে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব শুরু হয় ২০০০ সালের দিকে। ২০১৯ সালে প্রথমবারের মতো এক লাখের বেশি রোগী হাসপাতালে ভর্তি হন। তবে ২০২৩ সালে আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যায় সংক্রমণ। ওই বছর ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন এবং মৃত্যু হয় ১ হাজার ৭০৫ জনের। বড় প্রাদুর্ভাবের পর আক্রান্ত জনগোষ্ঠীর একটি অংশে সংশ্লিষ্ট সেরোটাইপের বিরুদ্ধে প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হওয়ায় সাধারণত পরপর একই মাত্রার সংক্রমণ দেখা যায় না। ২০২৪ ও ২০২৫ সালেও সংক্রমণ ও মৃত্যু ২০২৩ সালের রেকর্ড ছাড়ায়নি। চলতি বছরের প্রথম কয়েক মাসেও পরিস্থিতি তুলনামূলক নিয়ন্ত্রণে ছিল। তবে জুনের পর থেকে রোগীর সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জুনে ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন ২ হাজার ৯০৭ জন। জুলাইয়ে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৯ হাজার ২০৬-এ। আগস্টে ভর্তি হয়েছেন ২০ হাজার ৫৩৬ জন। অর্থাৎ এক মাসে রোগী দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। সেপ্টেম্বরের প্রথম চার দিনেও সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি অব্যাহত রয়েছে।

চলতি বছরের ৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৪০ হাজার ৪৪। একই সময়ে ২০২৫ সালে এ সংখ্যা ছিল ৩৩ হাজার ৩০৭ এবং মৃত্যু হয়েছিল ১৩০ জনের। ২০২৪ সালের ৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ১৪ হাজার ৩২৫ জন, মৃত্যু হয়েছিল ৯৯ জনের।

তবে সরকারি এই হিসাব শুধু হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের। মৃদু উপসর্গ নিয়ে বাড়িতে চিকিৎসা নেওয়া কিংবা হাসপাতালে ভর্তি না হওয়া রোগীরা এ পরিসংখ্যানে অন্তর্ভুক্ত নন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগনিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক হালিমুর রশিদ বলেন, সরকারি হাসপাতালে সব সময়ই রোগীর তুলনায় শয্যা কম থাকে। চিকিৎসায় কোনো ত্রুটি হচ্ছে না বলেও দাবি করেন তিনি।

ডেন-২ ও ডেন-৩ এর মিশ্র উপস্থিতি

ডেঙ্গু ভাইরাসের চারটি সেরোটাইপ রয়েছেÑ ডেন-১, ডেনÑ২, ডেন-৩ ও ডেন-৪। একটি সেরোটাইপে আক্রান্ত হওয়ার পর সাধারণত ওই সেরোটাইপের বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি রোগ প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হয়। তবে অন্য সেরোটাইপের বিরুদ্ধে সুরক্ষা দীর্ঘস্থায়ী নয়। পরে ভিন্ন সেরোটাইপে আক্রান্ত হলে গুরুতর ডেঙ্গুর ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।

তবে কোনো একটি সেরোটাইপকে স্বাভাবিকভাবেই বেশি বিপজ্জনক বলা যায় না। রোগের তীব্রতা নির্ভর করে আক্রান্ত ব্যক্তির আগের সংক্রমণ, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা, বয়স, অন্যান্য অসুস্থতা এবং ভাইরাসের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের ওপর।

আইইডিসিআরের পরিচালক ডা. কাজী আহমেদ জাকী বলেন, গত জুনে বান্দরবান, বরগুনা ও পটুয়াখালীতে নমুনা জরিপ করা হয়। বরগুনা ও পটুয়াখালীর শহরাঞ্চলে প্রধানত ডেন–৩ পাওয়া গেছে। একই দুই জেলার গ্রামাঞ্চলে ডেনÑ২ বেশি ছিল। বান্দরবানেও ডেনÑ২ তে আক্রান্ত রোগী বেশি পাওয়া গেছে। তাঁর ভাষ্য, সার্বিকভাবে এবার ডেনÑ৩ বেশি পাওয়া যাচ্ছে। তবে ডেনÑ২ ও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে রয়েছে। ফলে এবার একটি মিশ্র পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

অবশ্য এই জরিপ ছিল মাত্র তিন জেলার সীমিত নমুনার ওপর ভিত্তি করে। তাই এর ফল দিয়ে সারা দেশের সেরোটাইপ পরিস্থিতি নির্ধারণ করা যায় না। তবে এতে অঞ্চল এবং শহর ও গ্রামভেদে সেরোটাইপের বিস্তারে পার্থক্যের বিষয়টি সামনে এসেছে।