বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর জেলা/মহানগরী আমীর ও নায়েবে আমীরদের নিয়ে ৬ থেকে ৮ আগস্ট তিন দিনব্যাপী কেন্দ্রীয় শিক্ষাশিবির অনুষ্ঠিত হয়েছে। গাজীপুরস্থ স্থানীয় একটি মিলনায়তনে গত ৬ আগস্ট (বৃহস্পতিবার) এই শিক্ষা শিবির শুরু হয়ে গতকাল ৮ আগস্ট (শনিবার) সন্ধ্যায় সম্পন্ন হয়েছে।
তারবিয়াত বিভাগীয় কমিটির সভাপতি ও সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা এটিএম মা’ছুমের সভাপতিত্বে ও কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ড. মাওলানা ছামিউল হক ফারুকীর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত শিক্ষাশিবিরে প্রধান অতিথি ছিলেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াত আমীর ডা. শফিকুর রহমান এমপি।
বিষয়ভিত্তিক আলোচনা উপস্থাপন করেন সংগঠনের সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি জনাব মিয়া গোলাম পরওয়ার, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আবদুল হালিম, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য এডভোকেট মতিউর রহমান আকন্দ ও অধ্যক্ষ মো. শাহাবুদ্দিন এবং কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ড. খলিলুর রহমান মাদানী।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে জামায়াত আমীর বলেন, জেলা আমীরসহ আমাদের দায়িত্বশীল ও রুকনদের সতর্ক হতে হবে। নিজের অবস্থান মূল্যায়ন করতে হবে। আল্লাহ মুসলমানদের বিপদ দিয়ে পরীক্ষা করেন। পরীক্ষা কখনো সহজ, কখনো কঠিন হয়। এটি তাঁর সুন্নাহ। মূলত মু’মিন জীবনের ময়লা পরিষ্কার করার জন্য আল্লাহ তাআলা পরীক্ষায় নিক্ষেপ করেন। এ পরীক্ষায় আমাদের উত্তীর্ণ হতে হবে।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামীর ত্যাগকে আল্লাহ তায়ালা কবুল করেছেন। আল্লাহ তায়ালা তার ইচ্ছায় সংগঠনের শীর্ষ কয়েকজন দায়িত্বশীলকে তাঁর কাছে তুলে নিয়েছেন। শীর্ষ দায়িত্বশীলসহ নেতা-কর্মীদের ত্যাগ-কুরবানির প্রেক্ষিতে নতুন বাংলাদেশ গড়ার সুযোগ এসেছে। আমাদের ত্যাগের তুলনায় কাশ্মীর, ফিলিস্তিন ও মিশরের মুসলিমরা আরও বেশি কষ্ট স্বীকার করছেন।
ফ্যাসিস্ট আওয়ামী জুলুম নির্যাতনের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, দীর্ঘ সাড়ে ১৬ বছর আমরা ৩ ঘণ্টার জন্যও বসতে পারিনি। তিনদিনের কাজ আমরা ৩ ঘণ্টায় করেছি। অনেক সময় কাজ অসমাপ্ত রেখে বের হয়ে যেতে হয়েছে। এজন্য বাস্তবতার আলোকে এখন নিজেদের মূল্যায়ন করতে হবে। নিজের ঈমানকে মজবুত করতে হবে।
আমীরে জামায়াত বলেন, ভারতীয় উপমহাদেশে মাওলানা সাইয়্যেদ আবুল আ’লা মওদূদী কুরআন ও সুন্নাহর গভীরে প্রবেশ করে উম্মাহর জন্য কিছু রেখে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন। তিনিই যে সঠিক আর অন্যরা বেঠিক- আমরা তা মনে করিনা। দ্বীনের জন্য তিনি সীমাহীন শ্রম দিয়ে গেছেন। তাঁর খুরধার লেখনির মাধ্যমে তিনি বিশ্বে ইসলামী চিন্তাবিদ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন।
জনশক্তিকে সতর্ক হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সংগঠনের আস্থার জায়গায় কেউ আঘাত দিলে তার দিকে তাকানো হবে না। সর্বোচ্চ নৈতিক মানে পৌঁছাতে সক্ষম না হলেও, ন্যূনতম নৈতিক মান বজায় রাখতে হবে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে ব্যক্তির হালাল রুজি, পারিবারিক ও সামাজিক অবস্থার দিকে খেয়াল রাখতে হবে।
দায়িত্বশীলদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বনের বিষয়ে আমীরে জামায়াত বলেন, যেসকল কাজে সন্দেহ থাকবে, তা থেকে দূরে থাকা ভালো। কারণ, শয়তান আমাদের সংগঠনের দিকে ঝাপিয়ে পড়েছে। এজন্য একে অন্যের দিকে খেয়াল রাখতে হবে। অভ্যন্তরীণ ফেতনার বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, প্রতিবেশীর হক আছে আমরা তা মানি। তবে আমাদের উপর জুলুম করাকে সহ্য করবো না। একটি দেশ আমাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র অব্যাহত রেখেছে। দেশকে অস্থিতিশীল করতে চায়। দেশকে অস্থির করার জন্য দেশটি ২৪ ঘণ্টা পাঁয়তারা করে যাচ্ছে। আমাদের উত্তেজিত হওয়া যাবে না, ধৈর্যের সাথে মোকাবিলা করতে হবে। দায়িত্বশীলদের বক্তব্য দেয়ার সময় সতর্ক থাকতে হবে।
তিনি বলেন, অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যবাদ আমাদের উপর চাপানোর চেষ্টা করা হয়। বিদেশিরা উচ্চমূল্যে তাদের পণ্য আমাদের কিনতে বাধ্য করতে চায়, আর আমাদের সম্ভাবনাগুলোকে তাদের করায়ত্ত করতে চায়। সাম্রাজ্যবাদীদের বড় হাতিয়ার হলো মিডিয়া। সাম্রাজ্যবাদ প্রতিষ্ঠা করে দুটি প্রক্রিয়ায়। এর একটি হলো শিক্ষাকে ধ্বংস করে, আরেকটি হলো সংস্কৃতিকে ধ্বংস করে। এটি তারা করে মিডিয়ার মাধ্যমে। আমাদের সজাগ ও সাবধানে চলতে হবে।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বিশ্বব্যাপী ইসলামোফোবিয়া ব্যাপকভাবে ছড়িয়েছে। বর্তমান বিশ্ব একটি অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। মুসলিম বিশ্ব সবচেয়ে চাপে আছে। আগামীর বিশ্বব্যবস্থা কেমন হবে তা নির্ভর করছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের চলমান যুদ্ধের ফলাফলের উপর। আমাদের ভয় দেখানো হচ্ছে, পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। বৈশ্বিক আগ্রাসন চলছে। এক্ষেত্রে আমরা মুসলিম বিশ্বকে ঐক্যবদ্ধভাবে মোকাবিলার আহ্বান জানাচ্ছি। উম্মাহর স্বার্থে আমাদের ঐক্য কাম্য। মুসলমানদের ভয় পাওয়ার কিছু নেই। সতর্ক থাকতে হবে, আল্লাহ চাইলে সমস্ত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা যাবে।
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, আমরা পররাষ্ট্রনীতি ও ব্যবসা বাণিজ্যের ক্ষেত্রে দ্বিপক্ষীয় স্বার্থ সংরক্ষণে বিশ্বাসী। একই সঙ্গে আমরা সকল দেশের সাথে সমতার ভিত্তিতে পারস্পরিক সম্মানজনক ও ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক চাই।
আমীরে জামায়াত বলেন, সমাজ আমাদের কাছে আমানত। চোখ ও কান খোলা রাখতে হবে। আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইতে হবে। দায়িত্বশীলদের উত্তম পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করতে হবে। সমাজের ছোট বিষয়ে নজর না দিয়ে বড় বিষয়গুলোর দিকে নজর দিতে হবে। কারণ মানুষ শক্ত আশ্রয় চায়, তা দিতে হবে। সমাজের সর্বস্তরে সুদ, ঘুষ ও মানুষের ইজ্জতের উপর হামলা চালানো হচ্ছে। ব্যবসা-বাণিজ্য লুন্ঠন করা হচ্ছে। এজন্য মানুষ জামায়াতের উপর আস্থা রাখতে চায়।
জামায়াতের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে, সংগঠনকে বিতর্কিত করতে যেকোনো ঘটনাকে শতগুণ বাড়িয়ে প্রচার করা হচ্ছে। ষড়যন্ত্র মোকাবিলায় আল্লাহর সাহায্য চাইতে হবে, আল্লাহ চাইলে মোকাবিলা করা যাবে। তাঁর উপরই ভরসা করতে হবে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর দায়িত্বশীলরা মানবিক হলে সংগঠন মানবিক রূপ লাভ করবে। গোটা দেশ মানবিক হয়ে যাবে। আল্লাহ আমাদের প্রত্যাশার মঞ্জিলে পৌঁছে দেবেন ইনশাআল্লাহ।
সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার তাঁর বক্তব্যে বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী নতুন বাংলাদেশে নির্বাচিত সরকারের কাছে জনগণের যে প্রত্যাশা ছিল, বিএনপি সরকার তা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। বিশেষ করে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ঐতিহাসিক গণভোটের রায়কে বাস্তবায়ন না করে বিএনপি জনগণের সাথে দেওয়া প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে। তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ এবং সর্বস্তরের দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি ও দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতিতে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। দেশের জনগণ পরিবর্তনের প্রত্যাশা নিয়ে জামায়াতে ইসলামীর দিকে তাকিয়ে আছে। জামায়াতে ইসলামীর দায়িত্বশীলদের সেই প্রত্যাশা পূরণে সততা, যোগ্যতা ও নৈতিকতার মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হতে হবে।
তিনদিনব্যাপী শিক্ষাশিবিরে কুরআন ও হাদীস স্টাডি ক্লাস, পুস্তক ও বিষয়ভিত্তিক গ্রুপ আলোচনায় ডেলিগেটগণ অংশগ্রহণ করেন।