সারাদেশে কৃষকদের মাঝে যথাসময়ে সার সরবরাহ করার জন্য সার সংকট দূর করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য জাতীয় সংসদে আলোচনা হয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমান মোমেন এর প্রস্তাবে কার্যপ্রণালী বিধি ৬৮ অনুযায়ী এ আলোচনা হয়। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সারের কোন সংকট নেই। যথাযথভাবে সরবরাহ করা হচ্ছে। শুধুমাত্র আগের আমলের কিছু ডিলারের কারণে কিছু জায়গায় অব্যবস্থাপনা হয়েছে। সরকার কঠোরভাবে তা মনিটর করছে। বিরোধী দলের পক্ষ থেকে ডিজিটাল মনিটরিং করে সার সরবরাহে স্বচ্ছতা আনার জন্য তাগিদ দেয়া হয়েছে।

আলোাচনায় অংশ নিয়েছেন মৎস্য ও প্রাণী সম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাহ উদ্দিন টুকু, বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী শরিফুল ইসলাম, পটুয়াখালী-২ আসনের সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম মাসুদ, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, কুড়িগ্রাম -৩ এর সংসদ সদস্য মাহবুব আলম প্রমুখ।

দেশে সারের কোনো ঘাটতি নেই, বরং চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত মজুত রয়েছে বলে দাবি করেছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতি মন্ত্রী মীর শাহে আলম। তিনি বলেছেন, বিগত স্বৈরাচার সরকারের আমলে নিয়োগ পাওয়া ডিলাররা, যাদের অনেকেই এখন পলাতক-তারাই সরকারকে হেয় করতে সারের কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা করছে।

সংকট নিরসনে সরকার সারা দেশে নতুন করে প্রায় ৫ হাজার ডিলার এবং তাদের অধীনে আরও ১৬ হাজার খুচরা ডিলার নিয়োগ দিচ্ছে বলেও জানান তিনি।

সার সংকট দূর করার বিষয়ে ৬৮ বিধি অনুযায়ী বিশেষ আলোচনার প্রস্তাব উত্থাপন করে জামায়াতের সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমান মোমেন বলেছেন, বর্তমানে সারা দেশেই ইউরিয়া, ডিএপি ও টিএসপিসহ প্রয়োজনীয় সারের সংকট দেখা দিয়েছে। সঠিক সময়ে সার না পাওয়ায় এবং বাজারে সারের সংকট ও অতিরিক্ত দামের কারণে সারা দেশের কৃষি কাজ চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। সারের অপ্রতুলতায় কাঙ্ক্ষিত ফসল উৎপাদন না হওয়ার আশঙ্কায় সাধারণ কৃষকদের মাঝে চরম উদ্বেগ ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে। বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ। সেই কারণে সময়মতো সারের সরবরাহ নিশ্চিত করতে না পারলে মারাত্মক খাদ্য ঘাটতি এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের অনাকাঙ্ক্ষিত মূল্যবৃদ্ধির ঝুঁকি রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে কৃষকদের স্বার্থ রক্ষা, সারের সুষ্ঠু সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং সম্ভাব্য খাদ্য সংকট মোকাবেলায় সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের প্রয়োজন রয়েছে।

নাজিব মোমেন বলেন, আমাদের সার সংকট মূলত মজুদের সমস্যা না। ব্যবস্থাপনার সমস্যা, দুর্নীতির সমস্যা, হরিলুটের অপচেষ্টার সমস্যা। সরকারের কাজটা কি? গভর্নমেন্ট শুড গভর্ন। সরকারের সাফল্য এবং ব্যর্থতা তার ব্যবস্থাপনার দক্ষতার ওপর নির্ভর করে। এক্ষেত্রে আমাকে বলতে বাধ্য হচ্ছি আমি, সরকার সার বিতরণ ব্যবস্থাপনায় চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে। সার কারখানাগুলোকে বন্ধ রেখে বেশি দামে জনগণের টাকায় আপনারা সার কিনছেন, বলছেন মজুদ আছে, ঠিকই আছে। কিন্তু এটা কৃষকের হাতে পৌঁছাতে পারছে না কেন? এটাই আপনাদের ব্যর্থতা।

তিনি বলেন, আমরা জ্বালানি বিদ্যুতের সংকটেও লক্ষ্য করেছি, সারের সংকটের ক্ষেত্রেও লক্ষ্য করছি— আমাদের বিপর্যয়, আমাদের সংকট, আমাদের বিপদ একটা কায়েমী স্বার্থবাদী মহল লুটপাটের মহা সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করে। জনগণের কষ্টের উপর আঙ্গুল ফুলে তারা কলাগাছ হয়। এটা বন্ধ করতে হবে, কঠোর হস্তে দমন করতে হবে। সারের সংকটের কারণে আপনারা সেই ফ্যাসিবাদের আমলের ডিলারদেরকে বাদ দিচ্ছেন, ঠিকই আছে। লক্ষ লক্ষ টাকা নিয়ে নতুন যে সমস্ত দলীয় লোককে নিয়োগ দিচ্ছেন ডিলার হিসেবে, তারা যদি দুর্নীতি করে, জনগণের স্বার্থকে জলাঞ্জলি দেয়, আমার কৃষক যদি সার না পায়, তখন এই ব্যর্থতার দায়ভার আপনাদেরকেই নিতে হবে। আমাদের সার যদি মিয়ানমারে ইয়াবার পরিবর্তে পাচার হয়ে যায়, তাহলে তো দেশের সর্বনাশ! একদিকে সামাজিক অবক্ষয় হচ্ছে, অন্যদিকে কৃষি কাজের বারোটা বাজছে। মাননীয় প্রতিমন্ত্রী স্বীকার করলেন যে আমাদের সার মিয়ানমারে পাচার হচ্ছে। আমাদের এক্ষেত্রে জিজ্ঞাসা হলো— সার পাচার রোধে সরকার কি ব্যবস্থা নিচ্ছে, এটা জনগণকে জানাতে হবে, সংসদকে জানাতে হবে।

তিনি বলেন, আমি এখানে কিছু সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা দিতে চাই। আমাদেরকে এই সার সংকট মোকাবেলার জন্য যেই শর্ট টার্ম পদক্ষেপগুলা নিতে হবে, তড়িৎ পদক্ষেপগুলা নিতে হবে, সেটা হলো আমাদেরকে প্রথম যেই কাজ করতে হবে সেটা হলো— রিয়েল টাইম ডিজিটাল মনিটরিং। কেন্দ্রীয় গুদাম থেকে ডিলার পর্যন্ত ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালু করতে হবে। কোন গুদামে কত সার আছে, কোথায় যাচ্ছে, কখন পৌঁছাবে— সব তথ্য রিয়েল টাইমে দেখাতে হবে। এবং জনগণ যেন এটা দেখতে পারে, চেক করতে পারে সেটার ব্যবস্থা রাখতে হবে। ডিএই, বিসিআইসি এবং বিএডিসি র মধ্যে তথ্য সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে। অঞ্চল এবং ফসলভিত্তিক প্রকৃত চাহিদার উপর ভিত্তি করে বরাদ্দ দিতে হবে। যেখানে চাহিদা বেশি সেখানে দ্রুত সার পাঠাতে হবে। কালোবাজারি এবং মজুতদারি, একই সাথে সার পাচার এবং মাদক যে আসছে— এর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। টাস্কফোর্স গঠন করে দরকার হলে এই ইয়াবা যে আসছে আমাদের দেশে, সার যে চলে যাচ্ছে, এটার ব্যাপারে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। কৃষকের কাছে সার সরাসরি পৌঁছানোর ব্যবস্থা করতে হবে। নতুন ডিলার ব্যবস্থা কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত বাফার গুদাম থেকে সরাসরি কৃষকের কাছে সারের বিক্রি— কৃষকের কাছে সার বিক্রির ব্যবস্থা করতে হবে। জাতীয় পরিচয়পত্রের মাধ্যমে নির্ধারিত মূল্যে সার দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। এখন যে রেশনিং সিস্টেম রয়েছে, ১০-২০ কেজির কৃত্রিম সীমা না রেখে কৃষকের বাস্তব প্রয়োজন অনুযায়ী সার দিতে হবে।

তিনি আরো বলেন, দীর্ঘমেয়াদী যে সংস্কারগুলো নেওয়া প্রয়োজন সেগুলো হলো— ডিলার ব্যবস্থায় আমূল সংস্কার আনতে হবে। রাজনৈতিক প্রভাব এবং স্থানীয় সিন্ডিকেটমুক্ত ডিলার নিয়োগ দিতে হবে। যোগ্যতা এবং পারফরম্যান্স ট্র্যাক রেকর্ড-এর ভিত্তিতে ডিলারশিপ নিয়োগ দিতে হবে। লাইসেন্স নবায়ন এবং নিয়োগ প্রক্রিয়া স্বচ্ছ এবং দ্রুত করতে হবে। একই সাথে বিকল্প বিতরণ চ্যানেলের ব্যবস্থাও রাখতে হবে। আমদানি ব্যবস্থায় কাঠামোগত পরিবর্তন আনতে হবে। গ্যাসকে খাদ্য নিরাপত্তার কাঁচামাল হিসেবে দেখতে হবে। ডিলারের মাধ্যমে ভর্তুকি না দিয়ে ডাইরেক্ট বেনিফিট ট্রান্সফার এর মাধ্যমে এই কৃষকদেরকে এই ভর্তুকিটা দিতে হবে।

তিনি আরো বলেন, আমাদের লক্ষ্য শুধু আজকের সার সংকট মোকাবেলা হওয়া উচিত নয়, বরং একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিতামূলক এবং কৃষককেন্দ্রিক সার ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা; যাতে আগামী দিনে কোনো কৃষক সার পাওয়ার জন্য লাইনে দাঁড়াতে না হয়, অতিরিক্ত দাম দিতে না হয়, গুলি খেয়ে মরতে না হয় এবং কালোবাজারের দ্বারস্থ হতে না হয়।

শফিকুল ইসলাম মাসুদ বলেছেন, সরকার সংশোধন করতে চায়, দেশ সংস্কারে হাত দিতে চায় না। আর আমরা বলছি সংশোধন না, সংস্কারের জন্য দেশের ছেলেরা জীবন দিয়েছে। রাস্তা আটকে লাল কালি দিয়ে লেখা ছিল— দেশ সংস্কারের কাজ চলছে, বিকল্প রাস্তা ব্যবহার করুন। কোথাও সংশোধন লেখা ছিল না।

তিনি বলেন, কুড়িগ্রামে গোডাউন ভেঙে ১০,০০০ কেজি সার নিয়ে গেল কৃষকরা। কেন গোডাউন ভাঙতে হলো? গোডাউন ভাঙতে যদি হয়, তারমানে পরিস্থিতি আমাদের স্বাভাবিক? এটা প্রমাণ করে? ভর্তুকির সার পাচার হচ্ছে মিয়ানমারে। আমি কিছুদিন আগে এই জায়গার কাছাকাছি ঘুরে এসেছি, উখিয়া গিয়েছি, টেকনাফে গিয়েছি। সেখানে আমি প্রকাশ্যে তাদের সাথে কথা বলার সৌভাগ্য আমার হয়েছে, গরিব প্রান্তিক মানুষের। 'স্যার, আমাদের কথা সংসদে বলবেন?' আমি বললাম, 'কি বলব?' বলবেন, 'স্যার, আমাদের কাছ থেকে এখানে প্রভাবশালী সরকার দলের লোকেরা সার পাচার করে, আর ওখান থেকে মাদক আমাদের দেশে ঢুকিয়ে দিচ্ছে।' আমি বললাম, 'নাম বলেন।' বলে যে, 'মাননীয় সংসদ সদস্য স্যার।' আমি বললাম, 'স্যারও বললেন না, মাননীয় সংসদ সদস্যও বললেন না, ভাই বলেন।' বলে যে, 'ভাই, তা মনে থাকবে না। বলিয়েন আমাদের কথা। 'ভর্তুকি দেওয়া সরকারের সার, বিপরীতে আমাদের কাছে আসছে মাদক। বিপরীতে আসছে আমাদের কাছে আইস। দিস ইজ ভেরি— মানে এস্টোনিশিং— এস্টোনিশিং ব্যবস্থা কথা! এটা কি করে আমরা এই বিস্ময়কর ব্যাপারে আমরা বাস করছি!

তিনি বলেন, তাহলে আমাদের করণীয়টা কি? আমাদের করণীয় হচ্ছে— কালবেলার রিপোর্ট, 'সার নিয়ে গুজব বিভ্রান্ত, কৃষক ভুগছেন আস্থা সংকটে।' এই যে সার সংকট নিয়ে অস্থিরতা, আমাদের দেশ রূপান্তর, 'সার সংকট ছড়াচ্ছে অস্থিরতা।' আমরা আমাদের এই জায়গায় যে কথাটা বলছি সেটি হলো দেশীয় উৎপাদন বাড়ানো। আমরা আমাদের আমদানির জায়গাটা, আমাদের এটার উপরে নির্ভর না করে আমরা যদি এই কাজটা করতে পারি যে আমাদের বোরো মৌসুমে— মৌসুমের আগে ইউরিয়া, ডিএসপি, টিএসপি ডিলার পর্যায়ে কঠোর নজরদারি।