১ হাজার ৭৫৭ কোটি ৯৪ লাখ ২০ হাজার টাকা ব্যয়ে আরও এক লাখ টন ডিজেল আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। দেশে জরুরি জ্বালানি চাহিদা পূরণের জন্য এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে এই ডিজেল আমদানির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। জাতীয় সংসদ ভবনে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
বৈঠকে শেষে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছে, ইরান এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে উদ্ভূত অস্থিতিশীল ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দেশে জরুরি জ্বালানি চাহিদা পূরণের জন্য মাজেদা অয়েল কোম্পানি লিমিটেড থেকে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতির মাধ্যমে এক লাখ টন ইএন৫৯০-১০ পিপিএম ডিজেল আমদানির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ থেকে এই ডিজেল কেনার প্রস্তাব আনা হয়। এতে ব্যয় হবে ১ হাজার ৭৫৭ কোটি ৯৪ লাখ ২০ হাজার টাকা।
এর আগে, গত ২১ এপ্রিল অনুষ্ঠিত অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে দেশের জ্বালানি সরবরাহ প্রক্রিয়া আরও দ্রুত ও কার্যকর করতে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) কর্তৃক পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রের সময়সীমা ৪২ দিন থেকে কমিয়ে ১০ দিন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
ওই বৈঠকে দরপত্র প্রস্তুত ও দাখিলের সময়সীমা কমানোর পাশাপাশি দেশে জরুরি জ্বালানি চাহিদা পূরণের জন্য আর্চার এনার্জি এলএলসির কাছ থেকে আন্তর্জাতিক ক্রয়ে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতির মাধ্যমে ১ লাখ টন ইএন ৫৯০-১০ পিপিএম মানমাত্রার সালফারযুক্ত ডিজেল কেনার নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। পরবর্তীতে সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে ৬৭৪ কোটি ৬০ লাখ ২০ হাজার টাকা দিয়ে এই ডিজেল কেনার অনুমোদন দেওয়া হয়।
এদিকে দুই মাস পরে স্বস্তি ফিরেছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি তেলে। রাজধানীর পাম্পগুলোতে তেল পেতে লম্বা লাইন ধরতে হচ্ছে না। অন্যদিকে বৃষ্টিতে তাপমাত্রা কমে যাওয়ায় অসহনীয় লোডশেডিং থেকে মুক্তি পেয়েছে জনগণ।
তবে এখনও অস্বস্তি রয়ে গেছে রান্নার কাজে ব্যবহৃত এলপিজি ও পাইপলাইনের গ্যাসে। গত ডিসেম্বর মাস থেকেই এলপি গ্যাসে অরাজকতা চলছে। এক সময় দ্বিগুণ দামে বিক্রি হলেও এখন ২০০ থেকে ৪০০ টাকা বাড়তি গুণতে হচ্ছে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
এপ্রিল মাসে নজিরবিহীনভাবে দুই দফায় ৫৯৯ টাকা দাম বাড়িয়ে ১২ কেজি এলপিজি ১৯৪০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। তারপরও নির্ধারিত দামে পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানিয়েছে অনেকেই। বনশ্রীর বাসিন্দা নজরুল ইসলাম বলেন, ২৫ এপ্রিল ২২০০ টাকা দিয়ে কিনতে হয়েছে।
মাতুয়াইল এলাকার বাসিন্দা তৌফিক বলেন, ওমেরা গ্যাসের দাম আরও বেশি। এক সময় ১৩০০ টাকার এলপিজি ২৫০০ টাকায় বেচাকেনা হয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শেষ দিকে ডিসেম্বর থেকে এই অরাজকতা চলছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার থেকে শুরু করে নতুন সরকারও শুধু ব্যবসায়ীদের চাওয়া পূরণ করে যাচ্ছে। বলা যায় তারা যা চেয়েছে সবটাই দিয়ে দেওয়া হয়েছে। তারপরও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না এলপিজির বাজারদর।
অন্যদিকে জ্বালানি তেল নিয়ে নজিরবিহীন ঘটনার সাক্ষী হয়েছে বাংলাদেশ। ইরান যুদ্ধের কারণে আতঙ্কিত লোকজন বেশি তেল কেনা শুরু করলে গত ৬ মার্চ তেল সরবরাহে রেশনিং করা হয়। এতে করে পাম্পে যানবাহনের সারি লম্বা হতে থাকে।
১৫ মার্চ রেশনিং তুলে নেওয়া হলেও পরিস্থিতির উন্নতি না হয়ে আরও অবনতি হয়। তেল পেতে পাম্পের সামনে রাত্রীযাপনসহ অনেক ঘটনা ঘটতে থাকে। সরকার বাধ্য হয়ে ট্যাগ অফিসার নিয়োগসহ মোবাইল কোর্ট পরিচালনা শুরু করে। তারপরও পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক করা যায়নি। সরকারের পক্ষ থেকে বারবার বলা হচ্ছে পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। চাহিদানুযায়ী সরবরাহ করা হচ্ছে কোন কিছুতেই লাইন থামছিল না। অবশেষে চলতি সপ্তাহ থেকে লাইন কমতে শুরু করেছে।
বুধবার রাজধানীর মেঘনা মডেল পাম্পসহ অনেক পম্প ঘুরে স্বস্তির চিত্র মিলেছে। পরিবাগে অবস্থিত মেঘনা মডেল পাম্পে কয়েকদিন আগেও তেল পেতে সময় লেগেছে ৮ থেকে ১২ ঘণ্টা। এখন সেখানে কয়েক মিনিটের মধ্যে তেল নিতে পারছে প্রাইভেটকার ও বাইকচালকরা।
তেল নিয়ে দুর্ভোগের মধ্যেই কয়েকদিন ধরে শুরু হয়েছিল বিদ্যুৎ বিভ্রাট। তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে লোডশেডিংয়ের মাত্রাও বেড়ে যায়। কোন কোন এলাকা থেকে ৮ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিংয়ের খবর আসতে থাকে। সরকারি হিসেবেই ৩ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিংয়ের কথা স্বীকার করা হয়। তবে কয়েক দিনের বৃষ্টিতে সেখানেও পুরোপুরি স্বস্তি নেমেছে বলে দাবি করেছে বিদ্যুৎ বিভাগ।
গত মঙ্গলবার সকালের দিকে মাত্র ৪৮ মেগাওয়াট লোডশেডিং করা হয়েছে। এদিন রাত ১টায় সর্বোচ্চ চাহিদা ছিল ১২ হাজার ৫৫৫ মেগাওয়াট। এর আগে কয়েকদিন সেই চাহিদা উঠেছিল ১৬ হাজার মেগাওয়াটের উপরে।
এখন চ্যালেঞ্জ হচ্ছে বৃষ্টি শেষে তাপমাত্রা বেড়ে গেলে সামাল দেওয়া যাবে কি-না। বিপিডিবি দাবি করেছে, ইতোমধ্যেই অনেক জায়গায় বোরো ধান কর্তন শুরু হয়েছে। বৃষ্টি হওয়ায় দেরিতে রোপণ করা বোরোতেও আর সেচের প্রয়োজন হবে না। সেদিক থেকে চাহিদা কিছুটা কমে আসবে। যে কারণে আগামী সপ্তাহে লোডশেডিং কমে আসবে বলে ঘোষণা দিয়েছে বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। লোডশেডিং হলেও আগের মতো আর অসহনীয় হবে না।