জনগণ যতক্ষণ সমর্থন দেবে, বিএনপি জনগণের জন্য, দেশের জন্য ইনশাল্লাহ কাজ করে যাবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, এর থেকে এক বিন্দুও এদিক ওদিক হবে না। গতকাল শনিবার বিকালে চাঁদপুর সদর উপজেলার শাহ মাহমুদপুর ইউনিয়নের কুমারডুলি গ্রামের ঘোষেরহাট সংলগ্ন ‘বিশ্ব খাল’ পুনঃখননের উদ্বোধন শেষে এক সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা করেন।
সরকার নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়ন শুরু করেছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এখন আমরা যখন খাল কাটা শুরু করেছি, আমরা ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড দেওয়া শুরু করেছি, যখন ইমাম-মোয়াজ্জিনদের রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সম্মানি ভাতা দেওয়া শুরু করেছি, বৃক্ষ রোপণ অভিযান শুরু করেছি- তখন কিছুসংখ্যক মানুষ এনিয়ে বিভ্রান্তিকর কথা বলছে। এর বিরোধিতা শুরু করেছে। তিনি বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে এই দেশের মানুষ সচেতন ছিল বলেই তারা বিএনপির পক্ষে রায় দিয়েছে। তাই আজকে পরিষ্কারভাবে হাজারো মানুষের সামনে আমি বলে দিতে চাই আমরা মানুষের পক্ষ থেকে যেই সমর্থন পেয়েছি, আমরা এক এক করে সেই কাজগুলো বাস্তবায়ন করব, সেই পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়ন করব।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘কেউ যদি এই কাজ বাধাগ্রস্ত করতে চায়, আমাদের কিছু করা লাগবে না, বাংলাদেশের মানুষই তাদের সেই পরিকল্পনা অবশ্যই রুখে দেবে। তাই আসুন যে কর্মসূচিগুলো বাস্তবায়ন করলে এই দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হবে, আমরা সে সকল কাজে নেমে পড়ি।’ তিনি বলেন, আজকে এই ‘বিশ্ব খাল’ পুনঃখননে আমরা সকলে মিলে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই, আমরা সকলে এলার্ট থাকব, আমরা সকলে সচেতন থাকবো। ওই বিভ্রান্তকারীদের বিভ্রান্তির ফাঁদে আমরা পা দেব না।
প্রধানমন্ত্রী উপস্থিত হাজারো মানুষের উদ্দেশে বলেন, ‘আমাদের সকলকে সজাগ থাকতে হবে যাতে খাল খনন কর্মসূচিতে কেউ বাধা দিতে না পারে, আমাদেরকে সজাগ থাকতে হবে যাতে মা-বোনদের হাতে ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দেওয়ার যে কর্মসূচি সেই কর্মসূচি যাতে কেউ বাধাগ্রস্ত করতে না পারে, আমাদেরকে সজাগ থাকতে হবে কৃষক কার্ড কৃষক ভাইদের কাছে পৌঁছে দেবার যে পরিকল্পনা সেই পরিকল্পনা যাতে কেউ বাধাগ্রস্ত করতে না পারে। আমরা দেশের বেকারদের কর্মসংস্থানের জন্য যে সকল কর্মসূচি গ্রহণ করেছি সেগুলো যাতে বাধাগ্রস্ত করতেন না পারে, সে ব্যাপারে আপনাদেরকে সচেতন থাকতে হবে।’
দেশ গঠনের তাগিদ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘আমাদের সামনে উদ্দেশ্য লক্ষ্য একটাই। এই দেশকে পুনর্গঠন করতে হবে, এই দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন করতে হবে এবং সেই কাজ আমরা শুরু করেছি। বিএনপি সব সময় একটি কথা বলে থাকে জনগণই হচ্ছে বিএনপির সকল রাজনৈতিক শক্তির উৎস এবং সেই জন্যই জনগণকে সাথে নিয়ে আমরা এসব কর্মসূচি শুরু করেছি, জনগণকে সাথে নিয়ে আমরা ফ্যামিলি কার্ডের কর্মসূচির কাজ শুরু করেছি। জনগণকে সাথে নিয়ে আমরা কৃষক কার্ডের কাজ শুরু করেছি। জনগণ যতক্ষণ সমর্থ দেবে আমরা জনগণের জন্য কাজ করে যাব।’
সকলের প্রতি আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আসুন আজকে এই খাল পুনঃখনন কর্মসূচি থেকে আমরা সকলে মিলে একটি প্রতিজ্ঞায় আবদ্ধ হই, তা হচ্ছে এই দেশ আমাদের দেশ। এই দেশকে ’৭১ সালে আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধ করে স্বাধীন করেছিলেন। কাজেই এখন আমাদের এই দেশকে গড়ে তোলার পালা। আমরা সকলে মিলে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমিকে ইনশা আল্লাহ আমাদের সেই প্রত্যাশিত বাংলাদেশ হিসেবে গড়ে তুলব।’ স্থানীয় সংসদ সদস্য জেলা সভাপতি শেখ ফরিদ আহমেদ মানিক অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন। এর আগে প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানস্থলে এসে নিজে কোদাল দিয়ে মাটি কেটে বিশ্ব খাল পুনঃখনন কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন। সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন চাঁদপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপি সভাপতি শেখ ফরিদ আহমেদ মানিক। চাঁদপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য ও শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন, কৃষি এবং প্রাণীসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ, ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনামন্ত্রী আসাদুল হক দুলু, সমাজকল্যাণ এবং মহিলা ও শিশু বিষয়কমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন, বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ড. মাহদী আমিন, শরীয়তপুর সদর আসনের সংসদ সদস্য মিয়া নুরুদ্দিন অপু, সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য রাশেদা বেগম হীরা, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের চেয়ারমান আশিক চৌধুরীসহ জেলা বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা এ সময় উপস্থিত ছিলেন।
কুমিল্লাকে বিভাগ করার প্রতিশ্রুতি
এর আগে শনিবার দুপুরে কুমিল্লার বরুড়া উপজেলার লক্ষ্মীপুর বাজার মাঠে পথসভায় বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী। এরপর চাঁদপুর সফরে যাওয়ার পথে এ পথসভায় অংশ নেন। এক দিনের এই সফরে তারেক রহমান চাঁদপুরে খাল পুনঃখনন কার্যক্রমের উদ্বোধন, ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ এবং জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সভাসহ বিভিন্ন কর্মসূচিতে যোগ দেন।
বরুড়ার পথসভায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপি জনগণের কাছে যে ওয়াদা দেয়, সরকার পরিচালনার দায়িত্বে থাকলে সেই ওয়াদা অক্ষরে অক্ষরে পূরণ করে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে দেশের মানুষের বিপুল সমর্থনে বিএনপি সরকার গঠন করেছে উল্লেখ করে তিনি দেশ পুনর্গঠনে জনগণের সক্রিয় সহযোগিতা ও ধৈর্য ধারণের আহ্বান জানান।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘আমরা নির্বাচনের আগে বলেছিলাম, প্রত্যেক পরিবারের হাতে ধীরে ধীরে আমরা ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছাব, কৃষক কার্ড দেব এবং মসজিদ-মাদরাসাসহ বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ধর্মীয় গুরুদের জন্য সম্মানীর ব্যবস্থা করব। আমরা ইতিমধ্যে সেই কাজগুলো শুরু করেছি। বাংলাদেশের প্রায় ৬০ হাজার ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সম্মানীর ব্যবস্থা করা হয়েছে। দেশের মা-বোনদের হাতে ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দেওয়ার কাজ শুরু হয়েছে। কৃষক ভাইদের হাতে কৃষক কার্ড দেওয়ার কাজ অল্প করে হলেও শুরু করা হয়েছে। এর মানে দাঁড়ায়, বিএনপি দেশের মানুষকে যে কথা দেয়, সরকারে থাকলে তা সব সময় রক্ষা করার চেষ্টা করে।’
দেশ পুনর্গঠনের ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা ১৯৭১ সালে যুদ্ধ করে এই দেশ স্বাধীন করেছিলাম। একই সময়ে স্বাধীন হওয়া এশিয়ার অন্য দেশগুলো আজ আমাদের থেকে অনেক এগিয়ে গিয়েছে। কারণ, আমরা এক বিরাট স্বৈরাচারের কবলে পড়েছিলাম। ১৯৭১ সালে যেভাবে হানাদার বাহিনীর হাত থেকে স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনা হয়েছিল, ঠিক তেমনিভাবে দেশের মানুষ এবার স্বৈরাচারের কবল থেকে দেশকে মুক্ত করেছে। তবে শুধু দেশ স্বাধীন করলেই হবে না, এখন প্রধান কাজ হচ্ছে দেশকে পুনর্গঠন করা।’
তারেক রহমান তার সরকারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে বলেন, ‘দেশের মানুষের জন্য ব্যবসা-বাণিজ্য ও চাকরিবাকরির নিশ্চয়তা বিধান করা হবে। মা-বোনেরা যাতে শিক্ষায় ও অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে পারেন, সেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দেশের কৃষক ভাইদের স্বাবলম্বী করা এবং দেশে নতুন নতুন কলকারখানা স্থাপন করে বেকার সমস্যার সমাধান করা হবে। একই সঙ্গে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এমনভাবে নিশ্চিত করা হবে, যাতে নারী-পুরুষনির্বিশেষে দিনে-রাতের যেকোনো সময় নিরাপদে চলাচল করতে পারেন এবং ব্যবসায়ীরা নির্বিঘ্নে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারেন।’
পথসভায় কুমিল্লা বিভাগ প্রতিষ্ঠা, কুমিল্লায় একটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন এবং কুমিল্লা সদর হাসপাতালকে ১০০ শয্যা থেকে ২৫০ শয্যায় রূপান্তরের দাবি জানানো হয়। এসব দাবি প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘কুমিল্লা বিভাগ দাবিটি যদি জনগণের প্রকৃত দাবি হয়ে থাকে, তবে ইনশা আল্লাহ সেটির বাস্তবায়ন করা হবে। এ ছাড়া সমগ্র কুমিল্লা জেলা ও আশপাশের এলাকায় প্রচুর শাকসবজি উৎপাদন এবং বিদেশে রপ্তানি হয়। আপনাদের কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবিটি নিয়ে আমি আগামী কয়েক দিনের মধ্যে শিক্ষামন্ত্রীর সাথে কথা বলব এবং সবকিছু বিবেচনা করে দ্রুত বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করব। পর্যায়ক্রমে আপনাদের সকল যৌক্তিক দাবি পূরণ হবে।’
বক্তব্যের শেষে দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে উঠতে জনগণের কাছে ধৈর্য প্রত্যাশা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বিগত ১৬-১৭ বছরের স্বৈরাচারী সরকার যেমন মানুষের ওপর অত্যাচার, গুম ও খুন চালিয়েছে, ঠিক তেমনি দেশের অর্থ-সম্পদ বিদেশে লুটপাট করে পাচার করেছে। এই ব্যাপক লুটপাটের কারণে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা বর্তমানে কিছুটা চাপের মুখে আছে। এই পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে আমাদের কঠোর পরিশ্রম করতে হবে এবং কিছুটা সময় ধৈর্য ধারণ করতে হবে। কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির সভাপতি এবং গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের সুমনের সভাপতিত্বে পথসভায় উপস্থিত ছিলেন কৃষি এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ, কুমিল্লা-২ আসনের সংসদ সদস্য মো. সেলিম ভূঁইয়া, কুমিল্লা-১০ আসনের সংসদ সদস্য মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়া, কুমিল্লা জেলা পরিষদের প্রশাসক মোস্তফা মিয়া, কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ইউসুফ মোল্লা (টিপু), কুমিল্লা মহানগর বিএনপির সভাপতি উদবাতুল বারীসহ (আবু) জ্যেষ্ঠ নেতারা। সঞ্চালনা করেন কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আশিকুর রহমান মাহমুদ (ওয়াসিম)। এর আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কুমিল্লা জেলা অংশে প্রবেশের পর পথিমধ্যে বিভিন্ন স্থানে তাকে অভ্যর্থনা ও স্বাগত জানান বিএনপির নেতা-কর্মীসহ সাধারণ মানুষ।