ট্রলারে মানবপাচারে বিশ্বের বিপজ্জনক অভিবাসনের নতুন রুট হলো বঙ্গোপসাগর। ২০১৬ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত ট্রলারে করে মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া যাওয়ার পথে নিখোঁজ ও মৃত্যু হয় প্রায় ৫ হাজার জন রোহিঙ্গার। এই ভয়ংকর মৃত্যুযাত্রায় সঠিক সংখ্যা নির্ধারণ করা বেশ কঠিন, কারণ সাগরের মাঝপথে অনেক নৌকাডুবির ঘটনা অজানাই থেকে যায়। নিরাপদ জীবন এবং উন্নত ভবিষ্যতের আশায় এই ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা বন্ধে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বারবার আহ্বান জানিয়ে আসছে। তবে জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) এবং আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) গত মঙ্গলবার এক যৌথ বিবৃতিতে জানায়, আন্দামান সাগরে একটি ট্রলার ডুবির ঘটনায় নারী, পুরুষ ও শিশুসহ কমপক্ষে ২৫০ জন নিখোঁজ রয়েছেন। নিখোঁজদের মধ্যে রোহিঙ্গা শরণার্থী ছাড়াও বাংলাদেশী নাগরিক রয়েছেন বলে জানা গেছে। এই দুর্ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছে তারা। তারা আরও বলেন, এই সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। ট্রলারে করে সাগরপথে মালয়েশিয়া বা পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে যাওয়ার চেষ্টা করতে গিয়ে নিখোঁজ ও মৃত রোহিঙ্গার সংখ্যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। জানা গেছে, ট্রলারটি বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের টেকনাফ উপকূল থেকে অবৈধভাবে মালয়েশিয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছিল। পথে আন্দামান সাগরে প্রচ- বাতাস ও উত্তাল ঢেউয়ের কবলে পড়ে ট্রলারটি। ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই থাকায় ভারসাম্য হারিয়ে সেটি সমুদ্রে ডুবে যায়।
‘দুই দিন পানিতে ভাসছি’-আন্দামান সাগর থেকে বেঁচে ফেরা ব্যক্তির অভিজ্ঞতা: আমাদের নিয়ে ৪ এপ্রিল টেকনাফ থেকে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে বোটটা রওনা দিছে। ৮ এপ্রিল সকালে আন্দামান সাগরে ডুবে যায়। উদ্ধার হওয়ার আগে দুই দিন পানিতে ভাসছি। এভাবেই নিজের অভিজ্ঞতা বলছিলেন আন্দামান সাগরে ডুবে যাওয়া ট্রলার থেকে বেঁচে ফেরা কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দা মো. রফিক। ডুবে যাওয়ার আগেই ট্রলারটিতে থাকা অন্তত ৩০ জনের মৃত্যু হয় বলেও জানান রফিক। আরোহীদের মারধর করা হতো এবং মাছ রাখার কোল্ড স্টোরেজে পালাক্রমে লুকিয়ে রাখা হতো বলেও জানান তিনি। বোটের মাঝি বলেছিল যারা মারা গেছে তাদের লাশ পানিতে ফেলে দিতে। আর যারা জীবিত আছে তাদের রেখে দিতে। কিছুক্ষণের মধ্যে আমাদের বোটই ডুবে যায়, বলেন রফিক। ট্রলারে কতজন ছিলেন জানতে চাইলে তিনি স্থানীয় সাংবাদিকদের বলেন, আমরা পুরুষ ছিলাম ২৪০ জন, মহিলা ছিল ২০ জন। বাচ্চা ছিল চারজন। আর বোটের স্টাফ ছিল ১৩ জন।
অবৈধভাবে সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া যাওয়ার পথে আন্দামান সাগরে ডুবে যাওয়া ওই ট্রলারে নিজের ছোট ভাই ছিল বলে নিশ্চিত হয়েছেন টেকনাফের বাসিন্দা নেজাম উদ্দিন, যদিও তাকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। বেঁচে ফেরা ব্যক্তিদের ছোট ভাই তারেকের ছবি দেখিয়ে ডুবে যাওয়া ট্রলারে তার থাকার বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছেন বলে জানান নেজাম উদ্দিন। তিনি জানান, গত চার তারিখ থেকেই তারেকের সঙ্গে যোগাযোগ নেই পরিবারের। নিখোঁজ হওয়ার আগে দালালের মাধ্যমে মালয়েশিয়া যাওয়ার চেষ্টা করছিল সে। আমার ভাইকে পর্যটন ভিসায় মালয়েশিয়া পাঠানোর জন্য দেড় লাখ টাকা আর তার পাসপোর্ট দালালের কাছে দিছিলাম, বলেন তিনি। মালয়েশিয়া যাওয়ার পথে ডুবে যাওয়া ট্রলার থেকে উদ্ধার হওয়া কয়েকজনকে কোস্টগার্ড দেশে ফিরিয়ে এনেছে এমন খবর পেয়ে ছোট ভাইকে খুঁজতে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেন নেজাম উদ্দিন। এদিকে গত ৯ এপ্রিল আন্দামান সাগর থেকে উদ্ধার হওয়া নয়জনকে গভীর সমুদ্রে টহলরত কোস্ট গার্ডের জাহাজ ‘মনসুর আলী’র কাছে হস্তান্তর করে বাংলাদেশের পতাকাবাহী বাণিজ্যিক জাহাজ ‘মোটর ট্যাংকার মেঘনা প্রাইড’।
জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) এবং আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) বিবৃতিতে বলা হয়, এই মর্মান্তিক ঘটনাটি দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতি এবং রোহিঙ্গাদের জন্য টেকসই সমাধানের অভাবের এক ভয়াবহ পরিণতি। রাখাইন রাজ্যে চলমান সহিংসতা অদূর ভবিষ্যতে নিরাপদে বাড়ি ফেরার আশা ম্লান করে দিয়েছে। অন্যদিকে, মানবিক সহায়তা কমে যাচ্ছে। ক্যাম্পের জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়েছে; সেখানে রয়েছে শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের অভাব। এসব কারণে মানুষ নিরাপত্তা ও সুযোগের আশায় এমন বিপজ্জনক সমুদ্রযাত্রা বেছে নিচ্ছে। বিদেশে ভালো বেতনের আশা এবং পাচারকারীদের ভুল তথ্য মানুষকে বিশাল ঝুঁকি নিতে প্রলুব্ধ করে। এই পরিস্থিতি পাচারকারীদের অসহায় মানুষকে চরম বিপদের মুখে ঠেলে দেওয়ার সুযোগ করে দেয়। আন্দামান সাগর বারবার এমন বিপজ্জনক যাত্রায় বের হওয়া মানুষের প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে। এতে বলা হয়, আমরা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি জরুরি আহ্বান জানাই, তারা যেন তাদের সংহতি জোরদার করে এবং অর্থায়ন অব্যাহত রাখে। এতে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জীবনরক্ষাকারী সহায়তা নিশ্চিত হবে, পাশাপাশি স্থানীয় বাংলাদেশী জনগোষ্ঠীও উপকৃত হবে।
সাগরে রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশী নাগরিক বোঝাই ট্রলার ডুবির ঘটনা প্রসঙ্গে ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্মের সহযোগী পরিচালক শরিফুল ইসলাম হাসান বলেন, অবৈধ পথে মালয়েশিয়ার যাওয়ার মানবপাচারের ঘটনাগুলো দেশের উপকূলীয় এলাকার ও রোহিঙ্গা দালাল চক্রের মাধ্যমে ঘটছে। মৃত্যুঝুঁকি জেনেও স্থানীয় মানুষ ও রোহিঙ্গারা পাচারকারীদের প্রলোভনে পড়ে এই বিপজ্জনক পথ বেছে নিচ্ছে। তিনি এ ধরনের অবৈধ ও বিপজ্জনক যাত্রা রোধে মানুষকে সচেতন করার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন। উন্নত জীবনের লোভ দেখিয়ে দালাল চক্র এই অসহায় মানুষদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছে। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ যখন নতুন বছরকে বরণ করছে, তখন এই মর্মান্তিক ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, মিয়ানমারে বাস্তুচ্যুত হওয়ার মূল কারণগুলো দ্রুত সমাধান করা জরুরি। একই সঙ্গে এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যাতে রোহিঙ্গারা স্বেচ্ছায়, নিরাপদে এবং মর্যাদার সঙ্গে নিজ দেশে ফিরে যেতে পারে। সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া এমন ভয়ংকর সমুদ্রযাত্রায় আরও অনেক প্রাণ অকালে হারিয়ে যাবে।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যম ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে কেন্দ্র করে মানবপাচারকারী চক্রের তৎপরতা বৃদ্ধি পায় বিগত বছরগুলোতে। বছর ভিত্তিক নিখোঁজ ও মৃত্যুর হিসাব হলো: ২০১৬-২০১৭ সালে প্রায় ৫০০ জনের বেশি। ২০১৭ সালের সামরিক অভিযানের সময় নাফ নদী ও বঙ্গোপসাগরে ব্যাপক নৌকাডুবি ঘটে। ২০১৮-২০১৯ সালে প্রায় ৬০০ জন। ২০২০-২০২১ সালে প্রায় ৪৫০ জনের বেশি। করোনাকালীন সময়ে মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ড পুশ-ব্যাক করায় কয়েক মাস সাগরে ভাসতে গিয়ে অনাহারে মৃত্যুবরণ করে অনেক রোহিঙ্গা। ২০২২-২০২৩ সালে প্রায় ৯৫০ জনের বেশি। এই দুই বছরে অবৈধভাবে সাগরে যাত্রার হার ৩ গুণ বেড়ে যায়, ফলে মৃত্যুর সংখ্যাও লাফিয়ে বাড়ে। ২০২৪ সালে ৬৬০ জনের বেশি। ২০২৫ সালে ৬৫০ জনের বেশি। ঐবছর মে মাসের দুটি বড় নৌকাডুবিতেই ৪২৭ জন মারা যান। ২০২৬ (এপ্রিল পর্যন্ত) ৩০০ জনের বেশি। ১৪ এপ্রিল টেকনাফ থেকে অবৈধভাবে মালয়শিয়া যাওয়ার পথে বড় ট্রলার ডুবির ঘটনায় ২৫০ জন নিখোঁজ।
জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা (ইউএনএইচসিআর), আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) এবং বামরুকের মতে, ভয়াবহতার কারণ হলো অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই মাত্র ৫০-৬০ জনের ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন ট্রলারে ১৫০ থেকে ২০০ জন যাত্রী তোলা হয়। খাদ্য ও পানীয়র অভাব দেখা দেওয়া। অনেক সময় ইঞ্জিন বিকল হয়ে মাসখানেক সাগরে ভেসে থাকতে হয়। এতে পানিশূন্যতা ও অনাহারে শিশু ও নারীরা সবচেয়ে বেশি মারা যান। বঙ্গোপসাগর পাড়ি দিয়ে আন্দামান সাগরে প্রবেশের সময় গভীরতা এবং উত্তাল ঢেউয়ের কারণে ছোট ট্রলারগুলো নিয়ন্ত্রণ হারায়।
জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) এবং আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম)-এর ‘মিসিং মাইগ্রেন্ট প্রজেক্ট’-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, বঙ্গোপসাগর এবং আন্দামান সাগর বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম বিপজ্জনক অভিবাসন রুট। প্রতি ১০ থেকে ১২ জন যাত্রীর মধ্যে অন্তত ১ জনের সলিল সমাধি ঘটে। নিরাপদ জীবন এবং উন্নত ভবিষ্যতের আশায় এই ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা বন্ধে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বারবার আহ্বান জানিয়ে আসছে।
উদ্ধারকারীদের বরাত দিয়ে কোস্টগার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন জানান, নয়ই এপ্রিল দুপুরে আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের কাছাকাছি এলাকা থেকে ভাসমান অবস্থায় আটজন পুরুষ ও একজন নারীকে উদ্ধার করে বাংলাদেশি জাহাজটি। তিনি আরও বলেন, “ট্রলারডুবির ঘটনা যেখানে ঘটেছে সেখানে আসলে কী হয়েছে বা কতজন ট্রলারে ছিল সে বিষয়ে আমাদের জানার সুযোগ ছিল না। আমাদের কাছে নয়জনকে হস্তান্তর করার পর আমরা তাদেরকে দেশের নিয়ে আসি। উদ্ধারকৃতদের বরাত দিয়ে তিনি বলেন, “তারা প্রায় দুই দিন সমুদ্রে ড্রাম এবং কাঠের টুকরো আঁকড়ে ধরে ভেসেছিলেন।” কোস্ট গার্ডের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নিখোঁজদের কোনো হদিস এখন পর্যন্ত মেলেনি এবং ডুবে যাওয়া ট্রলারটিরও কোনো ধ্বংসাবশেষ পাওয়া যায়নি।
কোস্টগার্ড বলছে, গভীর সমুদ্রে বেশ কিছু মানুষকে পানির ড্রাম ও কাঠের টুকরো নিয়ে ভাসমান অবস্থায় দেখতে পায় তারা। পরে মধ্যরাতে কোস্ট গার্ডের কাছে তাদের হস্তান্তর করা হয়।