গাইবান্ধা থেকে জোবায়ের আলী ও মো. জাহিদ হাসান
বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান এমপি বলেছেন, আপনারা এই রোদের মধ্যে উপস্থিত হয়েছেন এ জন্য আপনাদের ধন্যবাদ জানাই। তিনি দুঃখ ভ্রারাক্রান্ত মন নিয়ে বলেন, এই সাঘাটার ২ জন ভাই শহীদ হয়েছেন তাদের জন্য দোয়া করবেন এবং আমার জন্য দোয়া করবেন আল্লাহ যেন আমাকেও শহীদ হিসেবে কবুল করেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কেননা আল্লাহপাক কুরআনুল কারীমে বলেছেন, তোমরা তাদের মৃত বলো না যারা আল্লাহর পথে নিহত হয় বরং তারা জীবিত। তিনি উপস্থিত জনতার উদ্দেশ্যে বলেন, আপনারা বলেন তো এই ২ জন শহীদ কি এলাকায় সন্ত্রাসী ছিল? চাঁদাবাজ ছিল? মদখোর ছিল? তা কখনো নয় বরং আপনারাই বলেছেন, তারা এলাকায় সবচেয়ে সৎ চরিত্রবান ছেলে ছিল। তিনি বলেন, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর জামায়াতের ৫ জন কর্মীকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। এর মধ্যে সাঘাটার ২ জন হলেন সাইফুল্লাহ বারী ও সালাউদ্দিন। তিনি তাদের রুহের মাগফিরাত কামনা করেন এবং আল্লাহপাকের নিকট তাদের উচ্চ মর্যাদা কামনা করেন। তিনি সরকারি দলের উদ্দেশ্য বলেন, সাবধান এখানে থামুন, সামনে পা বাড়াবেন না আর হত্যাকাণ্ডের দিকে আগাবেন না। কারো দিকে চোখ রাঙাবেন না। বাংলাদেশের মানুষ কারো চোখ রাঙানিতে ভয় করে না, এগুলো ফ্যাসিস্টের আচরণ, আপনারা কি আওয়াম লীগের মতো ফ্যাসিস্ট হতে পারবেন? পারবেন না এবং ঐ পথে হাঁটবেন না। তিনি বলেন, বিএনপি’র একজন জ্যেষ্ঠ নেতা সম্প্রতি রংপুরে গিয়ে বলেছেন, জামায়াতে ইসলামী রংপুরে বেশিসংখ্যক আসন পাওয়ায় এই এলাকার মানুষ পিছিয়ে থাকবেন। কারণ তারা আমাদেরকে ভোট দেয়নি। তিনি বলেন, সরকার তাদের উন্নয়ন কাজ থেকে বঞ্চিত করছেন। এটা রংপুরের মানুষ মেনে নেবে না। মানুষের অধিকার কেড়ে নেওয়ার জন্য সামনের দিকে আর হাত বাড়াবেন না, আর পা বাড়াবেন না। এর পরিণতি ভালো হবে না। জনগণ কাকে ভোট দিবে আর কাকে ভোট দিবে না সেটা কি বিএনপি ঠিক করে দিবে? রাষ্ট্রের উন্নয়ন সম্পর্কে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, রাষ্ট্রের উন্নয়ন কি কারো বাবার তহবিল থেকে হয়? এটা জনগণের ট্যাক্সের টাকায় হয়। তিনি বলেন, কোনো এলাকার মানুষকে উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত করার অধিকার কারো নেই। তিনি রংপুরসহ উত্তরাঞ্চলের উন্নয়ন নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। গতকাল সোমবার দুপুরে গাইবান্ধার সাঘাটার বোনারপাড়া কাজী আজহার আলী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে আয়োজিত জনসমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। জামায়াতের জেলা সিনিয়র নায়েবে আমীর ও বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল ওয়ারেছ এমপির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত উক্ত সমাবেশে আরও বক্তব্য রাখেন কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য অধ্যক্ষ মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিন, বগুড়া জেলা জামায়াতের আমীর মাওলানা আব্দুল হক, গাইবান্ধা জেলা আমীর আব্দুল করিম এমপি, মাওলানা নজরুল ইসলাম লেবু এমপি, অধ্যাপক মাজেদুর রহমান এমপি, সাবেক আমীর ডা. আব্দুর রহিম সরকার, শহর আমীর অধ্যাপক ফেরদৌস আলম, শ্রমিক কল্যাণের সভাপতি নুরুন্নবি প্রধান, সেক্রেটারি নয়ামিয়া বিএসসি, সুন্দরগঞ্জ আমীর অধ্যাপক শহীদুল ইসলাম মঞ্জু, পলাশবাড়ী আমীর আবু বক্কর সিদ্দিক, গোবিন্দগঞ্জ আমীর আবুল হোসেন মাস্টার, সাঘাটার আমীর মাওলানা ইব্রাহীম আলী, ফুলছড়ি আমীর মাওলানা সিরাজুল ইসলাম, সাদুল্লাপুর আমীর এরশাদুল হক ইমন, সদর আমীর মাওলানা নুরুল ইসলাম মণ্ডল, জেলা জামায়াতের ভারপ্রাপ্ত আমীর সৈয়দ রোকনুজ্জামান, ফয়সাল কবির রানা, গাইবান্ধা জেলা ছাত্র শিবিরের সভাপতি ইউসুফ আল কার্যাভী, সাধারণ সম্পাদক ফাহিম মন্ডল, সাঘাটার শিবির সভাপতি মাজেদুর রহমান প্রমুখ।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে জামায়াত আমীর ডা. শফিকুর রহমান বলেন, মনে রাখবেন জুলাই সনদ ও গণভোট বাস্তবায়ন না করলে আপনারা ক্ষমতায় থাকতে পারবেন না। ফ্যাসিস্ট আপা যে পথে হেঁটেছেন আপনারাও সেই পথে হাঁটছেন। শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নিতে পেরেছে, আপনি কিন্তু লন্ডনে যাওয়ার সুযোগ পাবেন না। এভাবে চললে আপনারও এই বাংলায় জায়গা হবে না। তিনি বলেন, দেশের মানুষের বিরুদ্ধে যারাই অবস্থান নিবে, তাদের এই দেশে থাকা হবে না। এই পথ পালানোর পথ। দেশের মানুষ আর দিল্লির খবরদারি মানতে রাজি না। বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান আরো বলেন, যুবকরা এখন প্রতিবাদ করা শিখিছে। বিএনপি ‘হ্যাঁ’ ভোটের প্রচারণা চালিয়ে ক্ষমতায় গিয়ে জাতির সঙ্গে প্রতারণা শুরু করেছে। যারা ‘হ্যাঁ’ প্রচারণা চালিয়ে এখন ‘না’ বলছেন, তিনি বলেন, বর্তমানে সব জায়গায় চুরি-চামারি ও লুটপাট শুরু হয়েছে। চাঁদাবাজদের হাত বন্ধ করতে হবে, দুর্নীতিবাজদের হাত বন্ধ করতে হবে। দেশের জন্য একবার নয়, শতবার রাজপথে নামবেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি। দুই শিবির কর্মী হত্যার সমালোচনা করে তিনি বলেন, আমরা চাই না, ক্ষমতার লোভে আর কোনো মায়ের কোল খালি হোক। গায়ে পাড়া দিয়ে ঝগড়া বাধাতে আসবেন না।
তিনি আরও বলেন, গত ২১ জুন সরকার দলীয় সন্ত্রাসীদের হামলায় নিহত শহীদ সাইফুল্লাহ বারী ও সালাউদ্দিন নিহত হয়েছে। আজকে এসে আমি তার সাক্ষী হয়েছি। আমি চাই, আর কোনো মায়ের কিংবা বাবার বুক যেন খালি না হয়। এই বাংলাদেশকে আমরা সঠিক সমৃদ্ধ বাংলাদেশ হিসেবে দেখতে চাই। আমরা সকলকে নিরাপদ দেখতে চাই। তিনি বলেন, সাইফুল্লাহ বারী ও সালাউদ্দিন হত্যাকাণ্ডে জড়িত সকল আসামীকে দ্রুত গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। তিনি অবিলম্বে এই হত্যাকাণ্ডের মূলনায়ক পলাশকে দ্রুত গ্রেফতারের জন্য প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানান। জামায়াত আমীর বলেন, ইতোমধ্যেই দেশের সামগ্রীক কর্মকাণ্ডে দলীয়করণের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, চাদাবাজি দখলদারিত্ব এবং নারীদেরকে ব্যাপকভাবে বে-ইজ্জাতী করা হচ্ছে। ধর্ষণ বেড়ে গেছে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবস্থা ভালোনা। আমরাতো এজন্য ফ্যাসিস্টকে বিদায় দিয়েছি। একটি বৈষম্যমূলক দেশ গড়ার জন্য। তা কিন্তু পাইনি। ইতিমধ্যে তেল-গ্যাস-বিদ্যুতের হাহাকার শুরু হয়েছে। এগুলো দেখার দায়িত্ব সরকারের। তিনি জনগণের দাবিকে বাইপাস না করার জন্য আহ্বান জানান। সেই সাথে ৭০% লোকের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান।
সমাবেশে বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও বৃহত্তর রংপুর দিনাজপুর অঞ্চলের পরিচালক মাওলানা আব্দুল হালিম, তিনি তার বক্তব্যে বলেন, এই গাইবান্ধাতে দুটি উপজেলা পলাশবাড়ীতে কৃতি ছাত্র রেজবুল হক প্লাবন ও এই সাঘাটার দুজন সাইফুল্লাহ বারী ও সালাউদ্দিনসহ ৩ জনকে হত্যা করা হয়েছে। তিনি বলেন, বিগত হাসিনা সরকারও খুন, ঘুম, নির্যাতন চালিয়ে এমনকি এই সংগঠনকে নিষিদ্ধ করেও পার পায়নি। অবশেষে পালিয়ে যেতে হয়েছে। তিনি বিএনপির উদ্দেশ্য বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শান্তিপূর্ণ পরিবেশকে নষ্ট করার জন্য ছাত্রদল,যুবদলসহ সন্ত্রাসীরা যে পায়তারা করছে তা কখনও মেনে নেয়া যায়না। তিনি ২৪ঘন্টার মধ্যে সাঘাটার হত্যাকান্ডের সাথে জড়িত মূল্য আসামীর পলাশকে গ্রেফতারের দাবি জানান। বিশেষ অতিথির বক্তব্যে নির্বাহী কমিটির সদস্য অধ্যক্ষ সাহাবুদ্দিন বলেন, এত অল্প সময়ে সরকার গঠনের পর আপনাদের বিরুদ্ধে মাঠে নামতে হবে এটা আমরা আশা করিনি। ছাত্র-জনতার রক্তের উপর দাড়িয়ে যে সরকার গঠিত হয়েছে সে সরকার হচ্ছে জনগনের সরকার কিন্তু আজকে সর্বোত্তই আপনাদের কর্মকান্ড নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। দ্রব্যমূল্যের দামবৃদ্ধির কারনে জনগনের নাভিশ্বাস শুরু হয়েছে।
এর আগে, আমীরের জামায়াত ডা. শফিকুর রহমান শহীদ শিবির কর্মী সাইফুল্লাহ বারী ও জামায়াত কর্মী সালাউদ্দিনের পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাত করেন এবং পরে তাদের কবর জিয়ারত করেন। সব শেষে বিকেলে সার্কিট হাউসে সংগঠনের জেলা পর্যায়ে দায়িত্বশীলদের নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রাখেন।
বগুড়ায় দায়িত্বশীলদের সাথে আমীরে জামায়াতের মতবিনিময়
বগুড়া অফিস জানায়, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ও বিরোধী দলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান বগুড়ায় জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের দায়িত্বশীলদের সাথে মতবিনিময় করেছেন। গাইবান্ধার সাঘাটায় বিএনপি ও যুবদল নেতাকর্মীদের হামলায় নিহত জামায়াত-শিবিরের দুই নেতার কবর জিয়ারত ও জনসমাবেশ শেষে রাজধানীতে ফেরার পথে গতকাল সোমবার বিকেলে বগুড়া পর্যটন মোটেলে এই মতবিনিময় সভায় মিলত হন তিনি। জামায়াতে ইসলামী বগুড়া মহানগর শাখার আমীর অধ্যক্ষ মাওলানা আবিদুর রহমান সোহেলের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভায় আমীরে জামায়াত বলেন, জামায়াতে ইসলামী এবং ইসলামী ছাত্রশিবিরের দায়িত্বশীলদের নীতি, নৈতিকতা ও মানবিক গুণাবলীতে উজ্জীবিত হয়ে দায়িত্ব পালন করতে হবে। এক্ষেত্রে কোন শৈথিল্য বরদাশত করা হবেনা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক নিয়োগে এনটিআরসিএর পরিবর্তে ম্যানেজিং কমিটিকে ক্ষমতা দেওয়ার সরকারি উদ্যোগের কঠোর সমালোচনা করে তিনি বলেন, এটা কোনভাবেই মেনে নেওয়া হবে না। এমনিতেই দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা দিনদিন বেড়েই চলেছে। মেধাবীরা তাদের মেধার যথার্থ মূল্য পাচ্ছেনা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়োগে ম্যানেজিং কমিটিকে দায়িত্ব দেওয়া হলে মেধার পরিবর্তে অর্থনৈতিক লেনদেন মূখ্য হয়ে উঠবে। ফলে মেধাবীরা আবারও বঞ্চিত হবে। তিনি মেধাবিরোধী সিদ্ধান্ত না নেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি দাবি জানান। আমীরে জামায়াত আরও বলেন, একই দিনে দুটি ভোট অনুষ্ঠিত হলেও সরকারী দল একটির ফলাফল মেনে সরকার গঠন করলেও গণভোটের ফলাফল মেনে নেয়নি। তারা প্রায় ৭০ শতাংশ জনগণের রায়কে অস্বীকারের মাধ্যমে জাতির সাথে প্রতারনা করেছে। কোন রকম টালবাহানা না করে গণভোটের রায় মেনে রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয় সংষ্কার করতে হবে। এক্ষেত্রে বিরোধীদল বিন্দুমাত্র ছাড় দিবে না। সংসদে দাবী আদায় না হলে জনগণকে সাথে নিয়ে রাজপথে দাবী মানতে সরকারকে বাধ্য করা হবে।
জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রিয় সহকারি সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আব্দুল হালিম, বগুড়া অঞ্চলের সহকারি প্রধান অধ্যাপক নজরুল ইসলাম, বগুড়া জেলা আমীর অধ্যক্ষ মাওলানা আব্দুল হক সরকার, জেলা নায়েবে আমীর মাওলানা আব্দুল হাকিম সরকার, আব্দুল বাছেদ, সেক্রেটারি মাওলানা মানুসুরুর রহমান, মহানগর নায়েবে আমীর মাওলানা আব্দুল হালিম বেগ, সেক্রেটারি অধ্যাপক আ.স.ম আব্দুল মালেকসহ জামায়াতে ইসলামী বগুড়া মহানগর, জেলা শাখার কর্মপরিষদ সদস্যবৃন্দ, মহিলা জামায়াতের কর্মপরিষদ সদস্যবৃন্দ এবং ইসলামী ছাত্রশিবর বগুড়া মহানগর, জেলা পূর্ব ও পশ্চিম শাখার সেক্রেটারিয়েট সদস্যরা মতবিনিময় সভায় উপস্থিত ছিলেন।