মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় সিন্ডিকেটের হাতে তুলে দেওয়ার চক্রান্ত বন্ধ, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের কারণে শিল্পকারখানা বন্ধ ও শ্রমিক ছাঁটাই রোধ, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণ এবং সব পেশার শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি পুনর্নির্ধারণের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন।

মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) দুপুর ১২টায় রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে এসব দাবিতে আয়োজিত মানববন্ধনে সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সভাপতি অ্যাডভোকেট আতিকুর রহমান বলেন, “শ্রমবাজারে সিন্ডিকেট করে শ্রমিকের পকেট কাটার অপচেষ্টা করছে কুচক্রী মহল।”

তিনি বলেন, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের শ্রমিকরা সেখানে গিয়ে কাজ করে রেমিট্যান্স পাঠাবেন। কিন্তু বিগত সরকারের আমলে দলীয়করণ ও সিন্ডিকেটের কারণে এই শ্রমবাজার বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ২০২৪ সালের ৩১ মে বিভিন্ন সিন্ডিকেটের কারণে ঢাকার বিমানবন্দর থেকে প্রায় ১৭ হাজার শ্রমিক মালয়েশিয়ায় যেতে পারেননি বলেও তিনি দাবি করেন।

দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় খোলার উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে আতিকুর রহমান বলেন, সম্ভাবনাময় এই শ্রমবাজার আবারও বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। ২৪-পরবর্তী জনগণের ম্যান্ডেট পাওয়া সরকার মাত্র ২৫টি রিক্রুটিং এজেন্সিকে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে কাজের সুযোগ দিয়ে আবারও পুরোনো পথে হাঁটছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

তিনি বলেন, দেশে দুই হাজারেরও বেশি রিক্রুটিং এজেন্সি রয়েছে। শ্রমিকদের নিজেদের পছন্দমতো বৈধ এজেন্সির মাধ্যমে বিদেশ যাওয়ার সুযোগ দেওয়া উচিত। মাত্র কয়েকটি এজেন্সিকে সুযোগ দেওয়া হলে আবারও সিন্ডিকেট তৈরি হতে পারে। এতে একজন শ্রমিকের মালয়েশিয়া যেতে ৭ থেকে ৮ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ হতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।

আতিকুর রহমান বলেন, “বাংলাদেশের শ্রমজীবী মানুষ মালয়েশিয়া যাওয়ার জন্য ভিটেমাটি বিক্রি করে টাকা জোগাড় করবেন, আর সেই টাকা সিন্ডিকেটের মধ্যস্বত্বভোগী রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর পকেটে যাবে—নতুন বাংলাদেশের শ্রমজীবী মানুষ তা হতে দেবে না।”

গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে শিল্পকারখানা বন্ধের অভিযোগ

দেশের শিল্প খাতে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের প্রসঙ্গ তুলে ধরে শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের সভাপতি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে ইতোমধ্যে তিন শতাধিক কলকারখানা বন্ধ হয়েছে এবং বিপুলসংখ্যক শ্রমিক বেকার হয়েছেন। বিভিন্ন কোম্পানি থেকে একের পর এক শ্রমিক ছাঁটাই করা হচ্ছে বলেও তিনি দাবি করেন।

সরকার ১৮ মাসে দেশে এক কোটি শ্রমিকের বেকারত্বের সমস্যা সমাধানের কথা বললেও গত ছয় মাসে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে প্রায় ৬২ হাজার শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি। নতুন করে চাকরি দেওয়ার প্রতিশ্রুতির আগে বিদ্যমান চাকরি রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, “আমরা যে চাকরিতে আছি, যেখানে আছি, সেখানকার গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট নিরসন করে চাকরির নিশ্চয়তা দিন। না হলে চাকরি ছেড়ে বাসায় গিয়ে পরিবার-পরিজন নিয়ে অভিশপ্ত জীবনযাপন করতে হবে। শ্রমিকরা কখনো তা চায় না।”

দেশের শিল্প উৎপাদন কমে যাওয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সংকটের কারণে উৎপাদন প্রায় ৪০ শতাংশ কমে গেছে এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন অর্ডার প্রতিবেশী দেশগুলোতে চলে যাচ্ছে। দেশের সব কলকারখানায় নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ ও মজুরি পুনর্নির্ধারণের দাবি

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন আতিকুর রহমান। তিনি বলেন, গত চার-পাঁচ মাসে সরকার বাজার নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছে। “বাজারে যে আগুন লেগেছে, সেই আগুন আপনাদেরই নেভাতে হবে,” বলেন তিনি।

তিনি বলেন, বাজারমূল্য নিয়ন্ত্রণ না করে গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বাড়ানো গ্রহণযোগ্য নয়। একই সঙ্গে শ্রমিকদের মজুরি পুনর্নির্ধারণের জন্য দ্রুত মজুরি বোর্ড গঠনের দাবি জানান তিনি।

চা শ্রমিকদের দুরবস্থার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, দেশের চা শ্রমিকরা দৈনিক ৫০০ টাকা মজুরির দাবিতে আন্দোলন করছেন। তাঁদের মানবেতর জীবনযাপন করতে হচ্ছে। চা-বাগানগুলোতে শ্রমিকদের পরিস্থিতি উন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

অবিলম্বে পোশাকশিল্পসহ সব খাতের শ্রমিকদের মজুরি পুনর্নির্ধারণের দাবি জানিয়ে আতিকুর রহমান বলেন, জাতীয় মজুরি বোর্ড ও পেশাভিত্তিক মজুরি বোর্ড গঠন করতে হবে। শ্রমজীবী মানুষ যাতে দুবেলা দুমুঠো খাবার খেতে পারেন, সরকারকে সেই ব্যবস্থা করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, “রাষ্ট্রযন্ত্রের সামনে সুন্দর সুন্দর ছবক দিলে সাধারণ মানুষ আর তা শুনতে চায় না। বাজারমূল্য নিয়ন্ত্রণ করুন, বিদ্যুৎ দিন, তেল ও গ্যাসের দাম কমান, মজুরি বোর্ড গঠন করুন। এসব করতে না পারলে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ আপনাদের আর সময় দেবে না।”

মানববন্ধনে কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক লসকর মো. তসলিমের সঞ্চালনায় আরও বক্তব্য দেন কেন্দ্রীয় সহসভাপতি কবির আহমদ, মজিবুর রহমান ভূঁইয়া, সহসাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আলমগীর হোসাইন, আব্দুস সালাম, এস এম লুৎফর রহমান, মাওলানা মহিবুল্লাহসহ কেন্দ্রীয় নেতারা।

কর্মসূচিতে সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ ছাড়াও বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় ও বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।