বাংলাদেশের সংসদে কোনো খেলা চলছে না উল্লেখ করে চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি বলেছেন, সংসদে সরকার ও বিরোধী দল নিজ নিজ সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করছে। কেউ যদি এটিকে ‘ফ্রেন্ডলি গেম’ বলে থাকেন তাহলে সেটি তার ব্যক্তিগত মতামত।
গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদের এলডি হলে অনুষ্ঠিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট পরবর্তী সংসদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।
চিফ হুইপ বলেন, আমরা চাই, দেশের স্বার্থে সরকার ও বিরোধী দল গঠনমূলকভাবে একসঙ্গে কাজ করুক। বিরোধী দলের দায়িত্ব শুধু বিরোধিতা করা নয় বরং তাদের দায়িত্ব যৌক্তিক বিষয়ে সমর্থন দেওয়া। প্রয়োজন হলে সরকারের সমালোচনা করা। আজ বিরোধী দল যদি কোনো যৌক্তিক সমালোচনা করে, আমরা তা গ্রহণ করব। আবার তারা যদি দেশের স্বার্থে সহযোগিতা করে, সেটিকেও আমরা স্বাগত জানাব।
তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক দেশে সরকার ও বিরোধী দলের সম্পর্ক এমনই হওয়া উচিত। আজ তারা বিরোধী দলে আছে, ভবিষ্যতে তারা সরকারেও যেতে পারে, আবার আমরাও বিরোধী দলে যেতে পারি। তাই আমরা একটি সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা চাই। সংসদে বাজেট অধিবেশনে যে সহযোগিতার পরিবেশ তৈরি হয়েছে, আমরা সেটিকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছি।
জুলাই সনদ, সংবিধান সংস্কার ও উচ্চকক্ষ নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে চিফ হুইপ বলেন, সংবিধান সংশোধন হবে সংসদে আর সংস্কার আলোচনা হবে সংসদের বাইরে। জুলাই সনদের অনেক বিষয় বর্তমান সংবিধানের সঙ্গেই সম্পর্কিত। সংবিধানে ১৫৩টি অনুচ্ছেদ রয়েছে, আর জুলাই সনদে প্রায় ৩০টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে। তাই শুধু ওই ৩০টি বিষয়কে আলাদা করে বাস্তবায়ন করলে হবে না। পুরো সংবিধানের কাঠামোর মধ্যেই বিষয়গুলো বিবেচনা করতে হবে।
সংসদ সদস্যদের সামনে তিনটি পথ রয়েছে উল্লেখ করে চিফ হুইপ বলেন, প্রথমটি হলো নতুন সংবিধান প্রণয়ন করা, দ্বিতীয়টি হলো বিদ্যমান সংবিধান স্থগিত রেখে নতুন ব্যবস্থা চালু করা, আর তৃতীয়টি হলো বিদ্যমান সংবিধান সংশোধন ও সংস্কার করা। আমরা তৃতীয় পথেই এগোচ্ছি, অর্থাৎ আমরা সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় সংস্কার করতে চাই।
নুরুল ইসলাম মনি আরও বলেন, সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে মূল উদ্দেশ্যের কোনো বড় পার্থক্য আমি দেখি না। প্রধানমন্ত্রীও তার সমাপনী বক্তব্যে বলেছেন, সংস্কার-সংক্রান্ত আলোচনা সংসদের বাইরে সব রাজনৈতিক দলকে নিয়ে চলবে, আর সংসদের ভেতরে সংবিধান সংশোধনের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া এগোবে। সংবিধান সংশোধনের কাজ সময়সাপেক্ষ জানিয়ে নুরুল ইসলাম বলেন, এটি দেশের সর্বোচ্চ আইন। তাই সবদিক বিবেচনা করে ধীরে-সুস্থে এগোতে হবে। এজন্যই একটি কমিটি গঠন করা হবে এবং প্রয়োজনীয় আলোচনা চলবে। আমরা মনে করি, এ বিষয়ে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে দূরত্ব খুব বেশি নয়। আলোচনা চলমান থাকলে যেকোনো সময় একটি সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব হবে, ইনশাআল্লাহ।
হামে শিশু মৃত্যুর বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে চিফ হুইপ বলেন, স্বাস্থ্যমন্ত্রী ইতোমধ্যে এ বিষয়ে বক্তব্য দিয়েছেন। তার তথ্য অনুযায়ী, আগের দুই বছরে দেশে পর্যাপ্ত হামের টিকা আনা হয়নি। ফলে টিকাদান কর্মসূচিতে ঘাটতি তৈরি হয়েছে এবং বর্তমানে হামের প্রকোপ বেড়েছে।
তিনি বলেন, শিশুমৃত্যুর বিষয়টি আমরা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। এটি এমন কোনো বিষয় নয়, যা অবহেলা করা যায়। প্রধানমন্ত্রী নিজেও ব্যক্তিগতভাবে বিষয়টি তদারকি করছেন। তার উদ্যোগে দ্রুত টিকার সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়েছে। বর্তমানে দেশে পর্যাপ্ত টিকা রয়েছে এবং সারাদেশে টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। তবে যেসব শিশু ইতোমধ্যে সংক্রমিত হয়েছে বা আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে ছিল, তাদের ক্ষেত্রে সেই প্রভাব এখন প্রকাশ পাচ্ছে। আমরা আশা করছি, চলমান টিকাদান কর্মসূচির মাধ্যমে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণে আসবে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দুর্নীতির কথা উল্লেখ করে চিফ হুইপ বলেন, আপনারা জানেন, এটা মানুষও বলাবলি করে গত সরকারের সময় ভয়াবহ দুর্নীতি হয়েছে। প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলারের মতো দুর্নীতি হয়েছে। সেটা তদন্তের আওতায় আনার কথা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং অন্যান্য মন্ত্রী ও সদস্যরাও বলেছেন। দুর্নীতি দমন কমিশনকে আমি বলতে চাই, যে কোনো অপরাধই অপরাধ, মানে কোনো অপরাধই ছেড়ে দেওয়ার মতো না।
চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বলেন, “সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখবেন, আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলো তাদের জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে কতটা ঐক্যবদ্ধ। তারা নিজেদের দেশের পক্ষে কথা বলে। আমাদেরও উচিত দেশের গণতন্ত্র, স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় একইভাবে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করা। আপনারা (সাংবাদিক) সবাই অভিজ্ঞ ও সচেতন মানুষ। তাই বিস্তারিত বলবো না। শুধু একটি বিষয় মনে করিয়ে দিতে চাই।”
চিফ হুইপ বলেন, “আমরা এমন একটি তরুণ প্রজন্ম পেয়েছি, যারা জুলাই আন্দোলনের মাধ্যমে স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটিয়েছে। এটি আমাদের জন্য বড় আশার জায়গা। তাই দেশের স্বার্থবিরোধী যেকোনও অপপ্রচারের বিরুদ্ধে সবাইকে সচেতন থাকতে হবে। বিশেষ করে গণমাধ্যমের প্রতি আমার আহ্বানÑ আপনারা সত্য তুলে ধরুন এবং দেশের গণতন্ত্র ও স্বাধীনতা রক্ষায় দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করুন।”
চিফ হুইপ আরও বলেন, “একটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখ করতে চাইÑ সরকার ও বিরোধী দল উভয়েই এই বাজেট বাস্তবায়নের বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছে। এটি অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। আপনাদের দোয়া ও সহযোগিতা চাই। আমাদের লক্ষ্য, আগামী পাঁচটি বাজেটের মাধ্যমে অর্থনীতিকে এমন অবস্থায় নিয়ে যাওয়া, যেখানে বর্তমানের ঘাটতি কাটিয়ে উদ্বৃত্ত বাজেট প্রণয়ন সম্ভব হবে। আমরা এমন একটি শক্তিশালী ও স্বাবলম্বী বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাই, যেখানে উন্নয়নের সুফল দেশের প্রতিটি মানুষ ভোগ করতে পারবেন। আমরা এমন একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি পেয়েছি, তারপরও গত কয়েক মাসে দেশে বড় ধরনের হাহাকার সৃষ্টি হয়নি। মানুষের নিত্যজীবনে কিছুটা স্বস্তি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হয়েছে। এটিই আমাদের প্রচেষ্টা।”
‘পুশইন’ নিয়ে সংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে চিফ হুইপ বলেন, “আমরা যেমন চাই না অন্য কোনও দেশের নাগরিককে বাংলাদেশে জোরপূর্বক পাঠানো হোক, তেমনি অন্য দেশও নিশ্চয়ই এমন পরিস্থিতি চায় না। আমাদের অবস্থান হলোÑ পারস্পরিক মর্যাদা, বোঝাপড়া এবং সুপ্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ক বজায় রেখে সমস্যার সমাধান করা।”
তিনি বলেন, “তারেক রহমানের অবস্থানও স্পষ্টÑ বাংলাদেশের মাটি কোনও দেশের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না। একইভাবে আমরা চাই না, অন্য কোনও দেশও বাংলাদেশের বিরুদ্ধে কোনও উসকানিমূলক অবস্থান নিক।”
তিনি আরও বলেন, “বাংলাদেশ একটি শক্তিশালী ও স্বাধীনচেতা রাষ্ট্র। বিশেষ করে আমাদের তরুণ প্রজন্ম সাহসী, দেশপ্রেমিক এবং সংগ্রামী। জুলাই আন্দোলনে যারা শহীদ হয়েছেন, তাদের প্রতি আমরা গভীর শ্রদ্ধা জানাই এবং আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করি। সরকার তাদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। এই জাতিকে সহজে দমিয়ে রাখা সম্ভব নয়। আমরা স্বাধীনচেতা জাতি। দেশের কল্যাণে যা প্রয়োজন, সরকার সেই পথেই এগিয়ে যেতে চায়। ভবিষ্যতেও জনগণের স্বার্থে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”
নূরুল ইসলাম মনি বলেন, “মানুষ আগের মতো টেলিফোনে কথা বলতেও ভয় পায় না। এমন একটি পরিবেশ তৈরি হয়েছে, যেখানে মানুষ স্বাভাবিকভাবে জীবনযাপন করতে পারছে। এই পরিস্থিতি ধরে রাখতে তারেক রহমান দিনরাত পরিশ্রম করছেন। গভীর রাত বা ভোরÑ যেকোনও সময় তিনি রাষ্ট্রীয় কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। ব্যক্তিগত আরাম-আয়েশের জন্য নয়, দেশের মানুষের জন্যই তিনি এই দায়িত্ব নিয়েছেন। চাইলে তিনি বিদেশে স্বাচ্ছন্দ্যে থাকতে পারতেন, কিন্তু সে পথ বেছে নেননি।”
সাংবাদিকদের আহ্বান জানিয়ে চিফ হুইপ বলেন, “আমরা চাই, আপনারাও (সাংবাদিক) এই পরিবর্তনের অংশীদার হোন। দেশের কল্যাণে যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা বাস্তবায়নে জনগণের সহযোগিতা প্রয়োজন। আরেকটি বিষয় হলো, আমাদের সমাজে নেতিবাচক সংবাদ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে ইউটিউব ও ফেসবুকে প্রচারিত অনেক তথ্যই ভুয়া বা বিভ্রান্তিকর। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে অসংখ্য ভুয়া কনটেন্ট তৈরি হচ্ছে। তাই যাচাই-বাছাই ছাড়া এসব তথ্য বিশ্বাস না করে মূলধারার গণমাধ্যমের ওপর আস্থা রাখা উচিত। আমাদের দুর্ভাগ্য, অনেক সময় ভালো উদ্যোগের চেয়ে নেতিবাচক খবরই বেশি প্রচার পায়। অতীতেও স্বাস্থ্য খাতে ভালো উদ্যোগ নানা বিতর্কে আড়ালে চলে গেছে। অথচ মানুষের উপকারে আসেÑ এমন কাজগুলোকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।”