যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানে বর্তমানে যারা ক্ষমতায় আছেন তাদের সঙ্গেই চুক্তিতে পৌঁছাতে প্রস্তুত। ইরানের প্রেসিডেন্ট বলেছেন, নৌ-অবরোধ ও হুমকির মুখে ইরান কোনো আলোচনা করবে না। আল-জাজিরা, রয়টার্স, ইরনা।

নৌ-অবরোধ ও হুমকির মধ্যে আলোচনা করবে না ইরান : যুক্তরাষ্ট্রের আরোপ করা নৌ-অবরোধ ও হুমকির মুখে ইরান কোনো আলোচনা করবে না জানিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের সঙ্গে এক ফোনালাপে পেজেশকিয়ান বলেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের চাপিয়ে দেওয়া’ আলোচনায় অংশ নেবে না তেহরান। ইরানের প্রেসিডেন্টের দপ্তর থেকে পাঠানো এক বিবৃতিতে এসব তথ্য জানানো হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফকে বলেছেন, চলমান সংঘাত নিরসনে আলোচনা যেন শুরু করা যায় সেজন্য যুক্তরাষ্ট্রকে আগে ‘বাধা’ দূর করতে হবে। যার মধ্যে আছে ইরানি বন্দরে আরোপ করা তাদের নৌ-অবরোধ। এরআগে শেহবাজ শরিফ মাইক্রো ব্লগিং সাইট এক্সে পেজেশকিয়ানের সঙ্গে ফোনালাপের ব্যাপারে তথ্য জানিয়েছিলেন। তিনি বলেন, “আঞ্চলিক শান্তি এবং স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে পাকিস্তান একটি সৎ ও একনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে কাজ করতে এবং অক্লান্ত প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।”

ইরানের বর্তমান নেতৃত্বের সঙ্গেই চুক্তিতে প্রস্তুত ট্রাম্প : যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইরানে বর্তমানে যারা ক্ষমতায় আছেন, তাদের সঙ্গেই একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে তিনি প্রস্তুত। সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি তেহরানের সঙ্গে আলোচনার এই আগ্রহ প্রকাশ করেন। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়।

যুদ্ধ বন্ধের চুক্তি নিয়ে আলোচনা প্রসঙ্গে ট্রাম্প আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলেন, “তারা (ইরান) যখন চাইবে আমাকে ফোন করতে পারে। সব কার্ড এখন আমাদের হাতে। আমরাই সবকিছুতে জিতেছি।”

ইরানের পক্ষ থেকে আসা প্রস্তাবের বিষয়ে ট্রাম্প জানান, তেহরানের আগের প্রস্তাবগুলো সন্তোষজনক ছিল না। তিনি বলেন, “মজার বিষয় হলো, আমি যখন পাকিস্তানে দূত পাঠানো বাতিল করলাম, তার ১০ মিনিটের মধ্যেই আমরা নতুন একটি প্রস্তাব পেলাম। সেটি আগের চেয়ে অনেক ভালো ছিল।” তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, ইরানের কাছে কোনও পারমাণবিক অস্ত্র থাকবে না, এটিই তার প্রধান শর্ত। তিনি বলেন, “তারা অনেক কিছুরই প্রস্তাব দিয়েছে, কিন্তু তা যথেষ্ট ছিল না।” বর্তমানে চলমান যুদ্ধবিরতি বা উত্তেজনা নিরসনের প্রক্রিয়া চালিয়ে যাবেন কিনা, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প কিছুটা রহস্য বজায় রেখে বলেন, “আমি এ নিয়ে এখনও চিন্তাও করিনি।”

পাঁচ শর্তে আটকে আছে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি আলোচনা

দীর্ঘদিনের উত্তেজনা ও প্রায় দুই মাস ধরে চলা যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে আলোচনা শুরু হলেও বেশ কিছু মৌলিক শর্তে দুপক্ষের বড় ধরনের মতপার্থক্য রয়ে গেছে। দুই দেশের মধ্যে একটি স্থায়ী চুক্তিতে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে বাধা হয়ে থাকা প্রধান পাঁচ শর্ত নিচে তুলে ধরা হলো:

পারমাণবিক কর্মসূচি

যুক্তরাষ্ট্র চায় ইরান তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ করে দিক। তবে তেহরান এ দাবিতে রাজি নয়। তার ভাষ্য, পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধে যেকোনো ধরনের বিধিনিষেধ শুধু নির্দিষ্ট কয়েক বছরের জন্য হতে পারে, স্থায়ীভাবে নয়।

ইউরেনিয়াম মজুত

ইরানের কাছে বর্তমানে ৪০০ কেজি (৮৮০ পাউন্ড) উচ্চ মাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত রয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চান, এই ইউরেনিয়ামের পুরোটা যুক্তরাষ্ট্রের হেফাজতে থাকবে। তবে তেহরান এ প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে।

হরমুজ ও বন্দর অবরোধ

ইরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র তাদের বন্দরগুলোর ওপর থেকে অবরোধ প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের ওপর আরোপিত বিধিনিষেধ বহাল থাকবে। অন্যদিকে ট্রাম্পের অবস্থান হলো, চূড়ান্ত কোনো চুক্তিতে পৌঁছানোর আগে ইরানি বন্দরগুলোর ওপর থেকে অবরোধ তুলে নেওয়া হবে না।

আটকা পড়া অর্থ

একটি দীর্ঘস্থায়ী চুক্তির অংশ হিসেবে ইরান তাদের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও বিদেশে আটকা পড়ে থাকা প্রায় ২ হাজার কোটি (২০ বিলিয়ন) ডলার অর্থ ফেরত দেওয়ার দাবি জানিয়েছে।

যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ

আলোচনায় ইরান এক বড় অঙ্কের ক্ষতিপূরণ দাবি করেছে। তেহরানের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় তাদের যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তার বিনিময়ে দেশ দুটিকে দিতে হবে প্রায় ২৭ হাজার কোটি (২৭০ বিলিয়ন) ডলার ক্ষতিপূরণ।

পাকিস্তানে পৌঁছেছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ওমানের রাজধানী মাসকাট থেকে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে পৌঁছেছেন। একটি ইরানি সূত্র সিএনএনকে এ তথ্য জানিয়েছে।

এর আগে আরাগচির নেতৃত্বে ইরানের একটি প্রতিনিধিদল গতকাল পাকিস্তান সফর করে। প্রতিনিধিদলটি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ও সেনাপ্রধানের সঙ্গে পৃথক বৈঠক শেষে ওমানের উদ্দেশ্যে ইসলামাবাদ ছেড়েছিলেন।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের দ্বিতীয় দফা আলোচনার জন্য কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে পাকিস্তানসহ কয়েকটি দেশ।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কাল আবার বৈঠক হতে পারে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর

ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য আলোচনার ক্ষেত্রে একে আশাব্যঞ্জক ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে। পাকিস্তানি কর্মকর্তারা জোর দিয়ে বলছেন, আরাগচির আবার ইসলামাবাদে আসাটা এটাই তুলে ধরছে যে, আলোচনার চেষ্টা ভেস্তে যায়নি বরং এটা কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতা।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসলামাবাদ পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাহ শরিফ ও সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের সঙ্গে পৃথকভাবে বৈঠক করেন। পরে তিনি ওমান সফরে যান। ওমানে আরাগচি দেশটির উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করেন। সেই আলোচনার ফলস্বরূপ তিনি রোববার ইসলামাবাদে ফেরার পরিকল্পনা করছেন।

পাকিস্তানের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আজ সোমবার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সম্ভবত আবার পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী এবং সেনাপ্রধানের সঙ্গে বৈঠক করবেন। একে আশাব্যঞ্জক ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে। অন্য কথায়, তাঁরা আশা করছেন কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় ধাপে ধাপে কিছু অগ্রগতি হতে পারে এবং এটি অগ্রগতির দিকে এগিয়ে যাবে।