গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত গণভোটে প্রতিফলিত প্রায় ৬৯ শতাংশ মানুষের রায় অবিলম্বে কার্যকর এবং জুলাই সনদের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছে সম্মিলিত ছাত্রসংগঠনসমূহ। বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল) ১৪টি ছাত্রসংগঠনের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ এক যৌথ বিবৃতির মাধ্যমে এ দাবি জানান।

বিবৃতিতে নেতৃবৃন্দ বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের শহীদদের স্বপ্ন ও জন-আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের লক্ষ্যেই এদেশের মানুষ গণভোটে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিয়ে সংস্কারের পক্ষে ম্যান্ডেট দিয়েছে। কিন্তু আমরা গভীর উদ্বেগের সাথে লক্ষ্য করছি যে, সরকার সেই জনরায়কে নস্যাৎ করে রাষ্ট্রকে পুনরায় পুরোনো ফ্যাসিবাদী কাঠামোর দিকে নিয়ে যাওয়ার ষড়যন্ত্র করছে। আমরা অবিলম্বে গণভোটের রায়কে সাংবিধানিক ও আইনি ভিত্তি দেওয়ার পাশাপাশি জুলাই সনদকে পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের জোর দাবি জানাচ্ছি।

বিবৃতিতে নেতৃবৃন্দ আরও বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের মূল অঙ্গীকার ছিল ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়ন, তথা রাষ্ট্রকাঠামোর আমূল সংস্কার। এই লক্ষ্যেই ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার, সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, পুলিশ কমিশন এবং গণভোট অধ্যাদেশসহ বিভিন্ন সংস্কারমুখী অধ্যাদেশ জারি করেছিল। গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত গণভোটে দেশের প্রায় ৬৯ শতাংশ মানুষ ‘হ্যাঁ’ ভোটের মাধ্যমে এই সংস্কারের প্রস্তাবনাগুলোকে সর্বাত্মক সমর্থন দেয়। কিন্তু নির্বাচিত হয়ে আসার পর বর্তমান সরকার এখন এই রায়কে নস্যাৎ করার জন্য নানাভাবে ষড়যন্ত্র করছে। জাতীয় সংসদে গঠিত বিশেষ কমিটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জারি করা গণভোট অধ্যাদেশসহ সংস্কারমুখী গুরুত্বপূর্ণ ১৬টি অধ্যাদেশ বিল আকারে উত্থাপন না করার যে সুপারিশ করেছে, তা সরাসরি জনরায়ের প্রতি অবজ্ঞা এবং জুলাইয়ের শহীদদের রক্তের সাথে স্পষ্ট প্রতারণা।

সরকারের ভূমিকার সমালোচনা করে নেতৃবৃন্দ আরও বলেন, সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী গত ১২ এপ্রিলের মধ্যে অধ্যাদেশগুলো সংসদে বিল আকারে পাস করার বাধ্যবাধকতা থাকলেও সরকার তা করেনি। সরকার দাবি করছে, গণভোট অনুষ্ঠিত হয়ে যাওয়ায় এই অধ্যাদেশগুলো আলাদা করে সংসদে তোলার প্রয়োজন নেই—যা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক এবং আইনি ফাঁকফোকর তৈরির অপচেষ্টা মাত্র। সময়সীমা পার হয়ে যাওয়ায় এই জনগুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশগুলো এখন বিলুপ্ত (Lapse) হওয়ার পথে। আমরা মনে করি, সরকার ইচ্ছা করেই একে আইনি সুরক্ষা দেয়নি, যাতে ভবিষ্যতে জুলাই সনদের সংস্কার ও গণভোটের রায়কে ভিত্তিহীন দাবি করে অকার্যকর করা যায়। বিশেষ করে গুম প্রতিরোধ কমিশন, মানবাধিকার কমিশন ও দুর্নীতি দমন কমিশনের মতো ১৬টি জনগুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশকে আইনি সুরক্ষা না দিয়ে সরকার মূলত প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনরায় দলীয়করণের পুরোনো ছকে নিয়ে যেতে চাচ্ছে। যে গুম ও নির্যাতনের সংস্কৃতির ভুক্তভোগী অতীতে খোদ বর্তমান সরকারের প্রধান ব্যক্তিরাও ছিলেন, আজ ক্ষমতায় এসে তারা কেন সেই নিপীড়নের পথ উন্মুক্ত রাখতে চাইছেন—জনমনে আজ সেই প্রশ্ন প্রকট হয়ে উঠেছে।

রাজনৈতিক দ্বিচারিতার প্রতিবাদ জানিয়ে নেতৃবৃন্দ বলেন, বর্তমান সরকার নির্বাচনের আগে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ৫১ শতাংশ সমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় এসে এখন প্রায় ৬৯ শতাংশ মানুষের সংস্কারের ম্যান্ডেটকে অস্বীকার করছে। ক্ষমতার গ্রহণের পর জনগণের রায়কে ছুড়ে ফেলা সরকারের রাজনৈতিক দ্বিচারিতা ও নব্য ফ্যাসিবাদেরই বহিঃপ্রকাশের সুস্পষ্ট প্রতিফলন। আমরা অবিলম্বে এই জনবিরোধী অবস্থান পরিহার করে জুলাই সনদের পূর্ণ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করার জন্য সরকারের প্রতি জোর দাবি জানাচ্ছি। এদেশের ইতিহাস সাক্ষী, যারা জনগণের রায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে, তাদের পরিণতি কখনোই ভালো হয়নি। আমরা সরকারকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিতে চাই, ৫ আগস্টের চেতনাকে ধারণ করে এদেশের মানুষ নব্য ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠার যেকোনো দুঃসাহস রাজপথেই রুখে দেবে।

পরিশেষে নেতৃবৃন্দ সরকারকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, আইনি জটিলতা এড়াতে এবং গণভোটের ফলাফলকে স্থায়ী ভিত্তি দিতে এসব অধ্যাদেশ অবশ্যই নতুন করে বিল আকারে সংসদে উত্থাপন করে পাস করতে হবে। আমরা অবিলম্বে ৬৯ শতাংশ মানুষের দেওয়া ‘হ্যাঁ’ ভোটের রায় সংবিধানে স্থায়ীভাবে অন্তর্ভুক্ত করে সকল জনমুখী সংস্কার আইন আকারে পাসের জোর দাবি জানাচ্ছি। জুলাই সনদের পূর্ণ বাস্তবায়ন ও গণরায়ের সাথে কোনো ধরনের চক্রান্ত ছাত্রসমাজ বরদাশত করবে না। রাজপথের লড়াইয়ের মাধ্যমে অর্জিত বিজয়কে আইনি মারপ্যাঁচে নস্যাৎ করতে চাইলে সম্মিলিত ছাত্রসংগঠনসমূহ সাধারণ মানুষকে সাথে নিয়ে পুনরায় রাজপথে নামতে বাধ্য হবে।

বিবৃতিদাতা নেতৃবৃন্দ হলেন: বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নূরুল ইসলাম, জাগপা ছাত্রকাফেলা সভাপতি আব্দুর রহমান ফারুকী, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র মজলিস সভাপতি মুহাম্মদ রায়হান আলী,

বাংলাদেশ খেলাফত ছাত্র মজলিস সভাপতি মুহাম্মাদ আব্দুল আজীজ, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রসমাজ সভাপতি বিএম আমীর জিহাদি, বাংলাদেশ ছাত্র মিশন সভাপতি সৈয়দ মোঃ মিলন, গণতান্ত্রিক ছাত্রদল (এলডিপি) সভাপতি মেহেদি হাসান মাহবুব, বাংলাদেশ খেলাফত ছাত্র আন্দোলন সভাপতি আবু দারদা, বাংলাদেশ জাতীয় ছাত্র সমাজ আহ্বায়ক সাইফুল ইসলাম, নাগরিক ছাত্র ঐক্য আহ্বায়ক মোহাম্মদ ফজলে রাব্বি, বাংলাদেশ ছাত্রপক্ষ সভাপতি মোহাম্মদ প্রিন্স আল আমিন, ইসলামী ছাত্র ফোরাম বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক প্যানেল সদস্য শেখ সাব্বির আহমদ, ন্যাশনাল ছাত্র মিশন সভাপতি মোঃ রেজাউল ইসলাম, ছাত্র ফোরাম আহ্বায়ক রিয়াদ হোসেন।