দীর্ঘ অপেক্ষার পর অবশেষে প্রকাশ হতে যাচ্ছে এসএসসি-২০২৬ পরীক্ষার ফলাফল। সোমবার (১০ আগস্ট) সব শিক্ষা বোর্ডের ওয়েবসাইটে ফলাফল প্রকাশ করা হবে বলে আগেই জানিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। লিখিত পরীক্ষা শেষ হওয়ার ৮২ দিন পর এবার ফলাফল প্রকাশ হতে যাচ্ছে। এর আগে করোনার সময়ে ফলাফল প্রকাশ দেরিতে হলেও এতটা দেরি হয়নি। ফলে এবার ফলাফল প্রকাশে ভেঙে যাচ্ছে গত ২০ বছরের রেকর্ড।
শিক্ষক-অভিভাবকরা বলছেন, ফল প্রকাশে এমন বিলম্বে ফলপ্রার্থী প্রায় সাড়ে ১৮ লাখ শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকদের উদ্বেগে দিন কাটছে। তাদের অনেকে ট্রমায় ভুগছেন। এছাড়া ফল বিপর্যয়সহ নানান নেতিবাচক তথ্য ছড়িয়ে পড়ায় আতঙ্কে রয়েছেন শিক্ষক-অভিাবকরা।
শিক্ষাবিদরা মনে করছেন, ফল প্রকাশের এমন দেরিতে শিক্ষাপঞ্জিও এলোমেলো হয়ে পড়তে পারে। তারা বলছেন, দেরিতে ফল প্রকাশের কারণে উচ্চমাধ্যমিকে ভর্তিতেও দেরি হবে। এতে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির আগেই তিনমাসের সেশনজটে পড়তে যাচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। যার প্রভাব পড়বে এইচএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতিতেও। পর্যাপ্ত প্রস্তুতি না নিয়েই তাদের এইচএসসি পরীক্ষায় বসতে বাধ্য করা হবে। এতে শিখন ঘাটতি বাড়বে এবং নাম-সর্বস্ব ডিগ্রি অর্জন করে শিক্ষাজীবন শেষ করবেন অনেক শিক্ষার্থী।
চলতি বছরের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা শুরু হয় ২১ এপ্রিল। লিখিত পরীক্ষা শেষ হয় ২০ মে। পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর সচিবালয়ে এক ব্রিফিংয়ে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন পাবলিক পরীক্ষাগুলোর ফল প্রকাশের সময়সীমা কমিয়ে আনার ঘোষণা দেন। ওইদিন শিক্ষামন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছিলেন, ২০ জুলাইয়ের মধ্যে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হবে।
কিন্তু পরে আবার শিক্ষামন্ত্রী বিভিন্ন গণমাধ্যমকে জানান, ২০ জুলাই ফল প্রকাশ করা সম্ভব হচ্ছে না। ফল এখনো প্রস্তুত হয়নি। পূর্বঘোষিত সময়ে ফল প্রকাশ না করায় পরীক্ষার্থী-অভিভাবকদের মনে নানান প্রশ্ন দেখা দেয়। সন্দেহ-সংশয় দানা বাঁধতে শুরু করে। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানা আলোচনা-সমালোচনা শুরু হলে, ১০ আগস্ট ফল প্রকাশ করা হবে বলে জানানো হয়। সে অনুযায়ী সোমবার ফল প্রকাশ করতে যাচ্ছে শিক্ষা বোর্ডগুলো। এতে ২০ বছরের রেকর্ড ভাঙছে, যেটি কি না হতে যাচ্ছে সবচেয়ে দেরিতে ফল প্রকাশের রেকর্ড।
কেনো এতো দেরি এবার?
চলতি বছর ২১ এপ্রিল এসএসসি ও সমমান পরীক্ষা শুরু হয়। ২০ মে লিখিত পরীক্ষা শেষ হয়। সে হিসাবে ২০ জুলাইয়ের মধ্যে এসএসসির ফল প্রকাশের কথা ছিল। শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনও ২০ জুলাইয়ের মধ্যে ফল প্রকাশের ঘোষণা দিয়েছিলেন। একই সঙ্গে এসএসসি ও এইচএসসির মতো পাবলিক পরীক্ষার ফল প্রকাশের সময়সীমা আরও কমিয়ে আনার উদ্যোগের কথা জানান মন্ত্রী।
মন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী ২০ জুলাইয়ের মধ্যে ফল প্রস্তুতের কথা জানান শিক্ষা বোর্ডগুলোর চেয়ারম্যানরাও। গত ১১ জুলাই ঢাকা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান জাগো নিউজকে জানিয়েছিলেন, তারা সব প্রস্তুতি শেষ করেছেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয় অনুমোদন দিলেই ফল প্রকাশ করা হবে। অথচ এর এক সপ্তাহ পর বোর্ড চেয়ারম্যান ২০ জুলাই ফল প্রকাশ করা হচ্ছে না বলে জানান।
বিষয়টি নিয়ে খোঁজ নিয়ে দুই ধরনের তথ্য পাওয়া যায়। বোর্ড চেয়ারম্যানসহ কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে এক ধরনের কারণ জানান। আবার নাম প্রকাশ না করে ভিন্ন তথ্য জানান বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক শাখার কর্মকর্তারা।
প্রকাশ্যে বোর্ড কর্মকর্তারা জানান, অতিবৃষ্টি ও বন্যার কারণে এইচএসসি পরীক্ষা ঘিরে ঝামেলার কারণে ফল প্রকাশের প্রস্তুতি নিতে পারেননি তারা। এতে সংকটের তৈরি হয়েছে।
আর নাম প্রকাশ না করে ফল বিপর্যয়ের ইঙ্গিত করে বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক দপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, ভুল-ত্রুটি ও ‘ফল সমন্বয়’ করার জন্য প্রস্তুতিতে সময় লেগেছে। প্রথম দফায় কাজ শেষ হলেও তা পুনরায় আবার প্রস্তুত করা হয়। যদিও ফল বিপর্যয়ের এমন গুঞ্জন ও অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ঢাকা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান।
নিয়ম অনুযায়ী- এসএসসি পরীক্ষা শেষে ফল প্রকাশ করা হবে। সেটা জুলাইয়ের আগেই শেষ করতে হবে। কারণ শিক্ষাপঞ্জি অনুযায়ী, জুলাই থেকে একাদশ শ্রেণির শিক্ষাবর্ষ শুরু হয়। তার আগেই এসএসসি পাস করাদের আবেদন, ভর্তি শেষ করার কথা।
অথচ এবার এসএসসির ফল প্রকাশ করতেই আগস্টের ১০ তারিখ অর্থাৎ, এক মাস ১০ দিন পিছিয়ে পড়েছে শিক্ষার্থীরা। আবেদন ও ভর্তি শেষ করতে আরও দেড় থেকে দুইমাস লাগতে পারে। সেক্ষেত্রে ক্লাস শুরু হতে পারে অক্টোবরে। অর্থাৎ, একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীরা ক্লাস শুরুর আগেই তিন মাসের সেশনজটে পড়বেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইআর) অধ্যাপক মজিবুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, ‘পাবলিক পরীক্ষাগুলোর কারণে আমাদের শিক্ষার্থীদের জীবন থেকে প্রায় এক থেকে দেড় বছর সময় নষ্ট হচ্ছে। এসএসসির পর বিরতি এবং অলস সময়। এইচএসসির পরও ফল পেতে তাদের অপেক্ষায় থাকতে হয়। এ গ্যাপ (বিরতি) কমাতে পারলে আরও কম সময়ে শিক্ষার্থীদের ডিগ্রি শেষ হবে।