অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের (ক্রুড অয়েল) তীব্র সংকটের কারণে চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় অবস্থিত দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারির উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে। এতে দেশে পেট্রোল, অকটেন ও ডিজেলসহ অন্তত ১৬ ধরনের জ্বালানি উৎপাদন মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত সোমবার (১৩ এপ্রিল) বিকালে সর্বশেষ পরিশোধন কার্যক্রম চালানো হয়। পরদিন গত মঙ্গলবার দুপুর থেকে ক্রুড অয়েলের পর্যাপ্ত মজুত না থাকায় তিনটি উৎপাদন ইউনিটের মধ্যে পেট্রোল, অকটেন ও ডিজেল উৎপাদনকারী দুটি ইউনিট সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়।
ক্রুড সংকটে থমকে গেল উৎপাদন : মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘœ সৃষ্টি হওয়ায় চলতি মাসের শুরু থেকেই কাঁচামালের সংকটে পড়ে শোধনাগারটি। পরিস্থিতি সামাল দিতে গত ৫ এপ্রিল থেকে বিকল্প উপায়ে সীমিত পরিসরে উৎপাদন চালু রাখা হলেও শেষ পর্যন্ত তা বন্ধ করতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ।
ইস্টার্ন রিফাইনারির সাবেক মহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মনজারে খোরশেদ আলম জানান, অপরিশোধিত তেলের অভাবে শোধনাগারটির প্রধান উৎপাদন ইউনিটগুলো বন্ধ রয়েছে। বর্তমানে শুধুমাত্র সীমিত পরিসরে বিটুমিন উৎপাদন চালু আছে।
তিনি বলেন, দেশের জ্বালানি চাহিদার বড় অংশই পেট্রোল, ডিজেল ও অকটেন নির্ভর। এসব পণ্যের ঘাটতি মোকাবিলায় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) বিদেশ থেকে পরিশোধিত জ্বালানি আমদানি করে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছে।
সীমিত উৎপাদন, বাড়ছে চাপ : বর্তমানে শোধনাগারটির তৃতীয় ইউনিটে অল্প পরিমাণে বিটুমিন এবং সীমিত আকারে কিছু জ্বালানি উৎপাদন হচ্ছে, যা দেশের মোট চাহিদার তুলনায় অত্যন্ত কম। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪ হাজার থেকে ৪ হাজার ৫০০ টন জ্বালানি পরিশোধনের সক্ষমতা থাকা এই প্রতিষ্ঠান দেশের মোট চাহিদার প্রায় ২০ শতাংশ সরবরাহ করে থাকে।
কর্মকর্তারা জানান, ক্রুড সংকটের কারণে গত মাস থেকেই উৎপাদন কমিয়ে দৈনিক প্রায় ৩ হাজার ৫০০ টনে নামিয়ে আনা হয়েছিল। সর্বশেষ মজুত ২ হাজার টনের নিচে নেমে এলে উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ করতে হয়। এমনকি মহেশখালীর সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) পাইপলাইনে জমে থাকা প্রায় ৫ হাজার টন এবং ট্যাংকের ডেড স্টক ব্যবহার করেও উৎপাদন চালু রাখা সম্ভব হয়নি।
আমদানি জটিলতা ও বৈশ্বিক প্রভাব : সংকটের অন্যতম কারণ হিসেবে সৌদি আরব থেকে ক্রুড অয়েলবাহী জাহাজ নির্ধারিত সময়ে না পৌঁছানোকে দায়ী করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নতুন চালান পাঠানোর প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। আগামী ১৮ এপ্রিল প্রায় ১ লাখ মেট্রিক টন ক্রুড অয়েল জাহাজে তোলার কথা রয়েছে, যা ৫ মে চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছালে পুনরায় পূর্ণমাত্রায় উৎপাদন শুরু করা সম্ভব হতে পারে।
অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইরান ও ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত পরিস্থিতির কারণে গত প্রায় দুই মাস ধরে অপরিশোধিত তেল আমদানিতে স্থবিরতা তৈরি হয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে দেশের জ্বালানি খাতে।
সরবরাহ নিয়ে আশ্বস্ত সরকার : এদিকে জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে, দেশে পরিশোধিত জ্বালানির পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় তাৎক্ষণিক কোনো প্রভাব পড়বে না। তবে দীর্ঘমেয়াদে সংকট অব্যাহত থাকলে আমদানিনির্ভরতা আরও বাড়বে বলে সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন।
বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে প্রায় ৬৫ থেকে ৬৮ লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানি করা হয়। এর মধ্যে প্রায় ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত তেল মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসে, যা ইস্টার্ন রিফাইনারিতে পরিশোধন করা হয়।
মজুত সক্ষমতা : ইস্টার্ন রিফাইনারির নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির ক্রুড অয়েল সংরক্ষণ ক্ষমতা প্রায় দেড় লাখ টন এবং পরিশোধিত জ্বালানি সংরক্ষণ ক্ষমতা আড়াই লাখ টন।
যোগাযোগে ব্যর্থতা : এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শরীফ হাসনাত এবং বিপিসির চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সমাপনী বিশ্লেষণ
দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত তেল শোধনাগার বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জ্বালানি খাতে ঝুঁকি তৈরি হলেও আপাতত আমদানি নির্ভরতা বাড়িয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা চলছে। তবে দ্রুত ক্রুড সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা ও বাজার স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়তে পারে।