দীর্ঘ আট মাস কাঁচাপাট রফতানি বন্ধ থাকায় দেশের অর্থনীতিতে মহাবিপর্যয় নেমে আসতে শুরু করেছে। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে ধস, আন্তর্জাতিক বাজারে অর্জিত দীর্ঘদিনের সুনাম নষ্ট এবং হাজার হাজার কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ে আজ ধ্বংসের কিনারে দাঁড়িয়েছে ‘সোনালী আঁশ’ খ্যাত পাট খাত। এই গভীর সংকটের পেছনে বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রভাবশালী উপদেষ্টা ও তাঁর পরিবারের ব্যবসায়িক সিন্ডিকেটের হাত রয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছেন বাংলাদেশ জুট এসোসিয়েশন (বিজেএ)-এর নেতৃবৃন্দ। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে সরাসরি হস্তক্ষেপ ও আর্তনাদ জানিয়েছেন তারা। গত ৭ মে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রীকে এসোসিয়েশনের উদ্যোগে পাটখাতকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষার জন্য আরোপিত শর্ত প্রত্যাহারের মাধ্যমে কাঁচামাল রফতানি চালুর দাবি জানানো হয়েছে। এর আগে ২১ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রীকে একই বিষয়টি লিখিতভাবে অবগত করা হয়েছে।
বিজেএ’র তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর দেশের অভ্যন্তরীণ সরকারি-বেসরকারী জুট মিলের চাহিদা মেটানোর পর উদ্বৃত্ত ৮-১০ লক্ষ বেল কাঁচাপাট রফতানি করে বাংলাদেশ প্রায় ১৫০০-২০০০ কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে। কিন্তু গত আট মাস ধরে রফতানি বন্ধ থাকায় দেশ এই বিশাল পরিমাণ আয় থেকে বঞ্চিত হয়েছে। বর্তমানে বাজারে প্রায় ১৫-২০ লক্ষ বেল কাঁচাপাট অবিক্রিত অবস্থায় পড়ে আছে। রপ্তানি বন্ধ থাকায় একদিকে যেমন ব্যাংক ঋণের সুদ বাড়ছে, অন্যদিকে গুদাম ভাড়া ও শ্রমিকদের বেতন দিতে গিয়ে ব্যবসায়ীরা দেউলিয়া হওয়ার উপক্রম হয়েছেন। সবচেয়ে বড় ক্ষতি হচ্ছে আন্তর্জাতিক বাজার হারানো; সময়মতো পাট সরবরাহ করতে না পারায় বিদেশী ক্রেতারা এখন বাংলাদেশ ছেড়ে অন্য দেশের প্রতি ঝুঁকছে।
প্রধানমন্ত্রীকে দেওয়া চিঠিতে বিজেএ’র ব্যবসায়ীরা দাবি করেছেন, বিগত সরকারের বস্ত্র ও পাট এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একজন সাবেক উপদেষ্টা ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা দেশের বৃহত্তম পাটকলগুলোর মালিক। তাঁরা নিজেদের পাটকলের স্বার্থে বাজারে একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে কাঁচাপাট রফতানি বন্ধের পাঁয়তারা করেন। যার ফলে ২০২৫ সালের ৮ সেপ্টেম্বর বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একটি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে কাঁচাপাটকে ‘শর্তযুক্ত রফতানি পণ্যের’ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, কোনো আলোচনা ছাড়াই নেওয়া এই হটকারী সিদ্ধান্তের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে কৃষকদের কাছ থেকে নামমাত্র মূল্যে সব পাট কিনে নেওয়া। তাছাড়া বাংলাদেশে যে কাঁচা পাট উৎপাদন হয় তা স্থানীয় মিল কলকারখানার চাহিদা মেটানোর পরই রফতানি করা হয়। চাহিদা না মিটিয়ে কখনোই রফতানি করা হয় না।
কাঁচা পাট রফতানিকারকদের অভিযোগ, বেসরকারী মিল মালিকরা রফতানিতে বাধা দিচ্ছে। পাট রফতানি না হলে দেশে পাটের দাম কমে যাবে এতে তারা লাভবান হবে। কিন্তু পাটের দাম কমে গেলে কৃষকরা পাট চাষে আগ্রহ হারানোর শঙ্কাও থেকে যায়।
বাংলাদেশ জুট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের তথ্যানুযায়ী, প্রতিবছর প্রায় ৭০ থেকে ৮০ লাখ বেল পাটের উৎপাদন হয়। দেশের বিভিন্ন মিল কল কারখানায় চাহিদা রয়েছে ৪৫ থেকে ৫০ লাখ বেল। এছাড়া প্রতি বছর ১০ থেকে ১৫ লাখ বেল রফতানি করা হয়। যতটুকু কাঁচাপাট রফতানি করা হয় সেটা দিয়ে বাংলাদেশের বড় একটি আন্তর্জাতিক বাজারে সুসম্পর্ক রয়েছে। ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধের কারণে এবং ভারতে আগের তুলনায় পাট উৎপাদন বৃদ্ধি ও পাটের মিল বেড়ে যাওয়ায় রফতানি কিছুটা থমকে গিয়েছে। এরপর সাবেক উপদেষ্টার প্রজ্ঞাপন এখনো বহাল থাকায় কাঁচাপাট রফতানির সাথে জড়িত ব্যবসায়ী থেকে শ্রমিক সকলেই বিপদগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। রফতানি বাধাগ্রস্ত হওয়ায় এবং বাজারে চাহিদা হ্রাস পাওয়ায় সাধারণ কৃষকরা পাটের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন না। পাটের দাম না পেয়ে চাষিরা চরম হতাশায় দিন কাঁটাচ্ছেন, যা আগামী মওসুমে পাট চাষে বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
দৌলতপুর জুট প্রেস এন্ড বেলিং ওয়াকার্স ইউনিয়নের (রেজিঃ ১১৫৫) সাধারণ সম্পাদক শরিফুল ইসলাম মিঠু বলেন, আমাদের শ্রমিকরা মানবেতার জীবন কাঁটাচ্ছে। অনেকে রিকশা, ভ্যান, ইজিবাইক চালাচ্ছে। অনেকে রাজমিস্ত্রির কাজও করছে করছে। যারা পাটের কাজ ছাড়া কিছুই জানতো না তারা পড়েছে সবচেয়ে বেশি বিপদে।
প্রেস অনার্স এসোসিয়েশন খুলনার সভাপতি আক্তার হোসেন ফিরোজ জানান, আঁশটি প্রেসে প্রায় ১৫ থেকে ২০ হাজার শ্রমিক ও কর্মচারী খুলনাতেই কর্মরত ছিল যারা বেকার হয়ে পড়েছে। কাঁচা পাট রফতানির এই সিদ্ধান্ত অতি দ্রুত প্রত্যাহার করতে হবে।
বাংলাদেশ জুট এসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান খন্দকার আলমগীর বলেন, সাবেক একজন উপদেষ্টা বাংলাদেশের পাট শিল্পকে জিম্মি করতে চেয়েছিলেন। যার কারণে তিনি একটি প্রজ্ঞাপন দিয়েছিলেন। বর্তমানে সারাদেশে প্রায় এক লাখ শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েছে। খুলনা, নারায়ণগঞ্জসহ সারাদেশে ৪০টি প্রেস বন্ধ হয়ে আছে। ব্যবসায়ীরা কোটি কোটি টাকার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা ধৈর্যহীন হয়ে পড়লে তাদের ক্ষতিপূরণের জন্য মাঠে নেমে যেতে পারে। এমনকি সাবেক উপদেষ্টার বিরুদ্ধে মামলাও হতে পারে। আমরা অতি দ্রুত কাঁচাপাট রফতানির নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার দাবি করি।
তিনি আরো বলেন, কাঁচাপাট রফতানিকে সম্পূর্ণ উন্মুক্ত করে দিতে হবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সহানুভূতিশীল সহযোগিতা এবং দ্রুত কার্যকরী পদক্ষেপই পারে সোনালী আঁশকে এই ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে এবং জাতীয় অর্থনীতিকে সচল রাখতে।