• ব্যাংক খাতের সংকটের সমাধান না হলে অর্থনীতির ধস ঠেকানো যাবে না : ড. হোসেন জিল্লুর রহমান
  • ব্যাংক দখল নিয়ে যা বের হচ্ছে, তা দিয়ে থ্রিলার সিনেমা হতে পারে : ড. বদিউল আলম মজুমদার
  • সরকার ব্যাংক লুট করার জন্য পথ তৈরি করে দেয় : বারবিডা সভাপতি

ব্যাংক গ্রাহক ফোরাম আয়োজিত এক সেমিনারে বিশিষ্টজনরা বলেছেন, ব্যাংক খাতের যে সংকট চলছে, তার সমাধান না হলে অর্থনীতির ধস ঠেকানো যাবে না। ইসলামী ব্যাংকে আবার কিছু হলে আর কখনো ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না। এবার গ্রাহকেরাই প্রতিরোধ গড়ে তুলবেন।

তারা বলেন, সরকার ব্যাংক লুট করার জন্য পথ তৈরি করে দেয়, এমন উদাহরণ বাংলাদেশ ছাড়া পৃথিবীতে বিরল। পুঁজিবাদের চেহারা কেমন হওয়া উচিত? লুটেরা, অলিগার্ক তৈরির মতো নাকি আইনসিদ্ধ হওয়া উচিত, এই সিদ্ধান্ত বর্তমান সরকারকে নিতে হবে। সভায় বক্তাদের মধ্যে কেউ কেউ ব্যাংক খাতের লুটেরাদের ছবি জাদুঘরে প্রদর্শনের প্রস্তাব করেন।

গতকাল শনিবার সকালে রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে দেশের ব্যাংকিং খাতের বিপর্যয়; প্রেক্ষিত ইসলামী ব্যাংকিং খাত: জাতীয় অর্থনীতিতে এর প্রভাব ও উত্তরণের পথ’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমান। সেমিনারে স্বাগত বক্তব্য দেন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট আবুল কাসেম হায়দার। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মিজানুর রহমান। অনুষ্ঠানে ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহকদের পাশাপাশি খাতসংশ্লিষ্ট ব্যাক্তিরা বক্তব্য দেন।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, ব্যাংক খাতের যে সংকট চলছে, তার সমাধান না হলে অর্থনীতির ধস ঠেকানো যাবে না। এ জন্য রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তে রাজনৈতিক প্রভাব আছে। তাঁর প্রশ্ন, যারা সমস্যা তৈরি করেছে, তাদের আবার ফেরত আনতে আইনে নতুন ধারা কেন।

হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, অর্থনীতির পরিস্থিতি নিয়ে অনেকে অনেক রকম মন্তব্য করেন। তবে ছয়টি বিষয়ে সবাই একমত। এর টেকসই সমাধান করতে হবে। ছয় সমস্যার মধ্যে রয়েছে ১. অর্থনীতিতে বিপর্যয় হয়েছে; ২. কলুষিত নীতি প্রক্রিয়া অর্থনীতির সংকট ত্বরান্বিত করেছে, যা এখনো চলছে; ৩. আমানতকারীরা নীরবে দুঃখকষ্ট ভোগ করছেন; ৪. অর্থনীতি স্থবির অবস্থায় আছে, চাকা সচল হয়নি, বিনিয়োগ নেই, বেকারত্ব বাড়ছে; ৫. দেশের বড় পরিবর্তনের সংকট সমাধানের সুযোগ হিসেবে এসেছে; ৬. এই সংকটের টেকসই সমাধান প্রয়োজন, নৈতিকতার মানদণ্ডে যা উচ্চ পর্যায়ে থাকতে হবে।

হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, অনেকেই ব্যাংক থেকে জমানো টাকা তুলতে পারছে না। এর সমাধান করতে হবে। গ্রাহক স্থিতিশীলতার জন্য কাজ করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক এ নিয়ে কাজ করছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি নৈতিকতার মানদন্ডে দাঁড়াতে পারছে কি না, তাও দেখতে হবে। সে জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন খুবই জরুরি।

হোসেন জিল্লুর- আরও বলেন, বেকারত্ব সমস্যার সমাধান না হলে সমাজে অন্য সমস্যা ছড়িয়ে পড়বে। এ জন্য সংকট সমাধানে নৈতিকভাবে উচ্চ স্থানে যেতে হবে। পেশাদারি ও সক্ষমতা বাড়াতে হবে। সময়োপযোগী ও সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়ে টেকসই সমাধান করতে হবে।

তিনি বলেন, সংকটের চরিত্র আমরা বুঝতে পেরেছি। অর্থনৈতিক দুরবস্থা তথা ব্যাংকিং খাতের সংকট এখন দৃশ্যমান। ব্যাংকিং খাতের সংকট শুধু অভ্যন্তরীণ নয়, বাহ্যিকও কিছু সমস্যা আছে। এখানে সুশাসনের অভাব যেমন আছে, একইসঙ্গে আইনের কাঠামোতেও সমস্যা আছে। এখন আমাদের সমাধানের দিকে এগোতে হবে। সমাধানের পথ কি হতে পারে, সেটি খুঁজতে হবে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক এই উপদেষ্টা বলেন, অর্থনীতির নীতি নির্ধারক যারা রয়েছেন, তাদের কাছে এই ম্যাসেজটি পৌঁছে দিতে হবে যে, ব্যাংকিং খাতের বিপর্যয় সমাধান না হলে অর্থনৈতিক ধসও মোকাবিলা সম্ভব হবে না। আমাদের দেশে অনেক অনেক সংকট রয়েছে। কিন্তু অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের বিষয়টি আসলেই সেখানে ব্যাংকিং খাতের সংকটের কথা আসে। এই সংকট মোকাবিলায় শুধু অর্থনৈতিক পরিবর্তন দিয়ে নয়; বরং রাজনৈতিক অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিও পাল্টাতে হবে।

তিনি আরও বলেন, ব্যাংকিং রেজুলেশনের ধারা সংশোধন নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, এটিকেও সমাধান করতে হবে। এছাড়া আরও যে বিষগুলোকে গুরুত্ব দিতে হবে, এর মধ্যে সাধারণ গ্রাহকদের জন্য স্বল্পমেয়াদি একটি সমাধানের দিকে যেতে হবে। তাদের আমানতের বিপরীতে পর্যাপ্ত ফান্ডের ব্যবস্থা রাখতে হবে। তাদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। এই অর্থনীতিবিদ মনে করেন, স্থবির অর্থনীতি যদি আরও ঘনীভূত হয়, তাহলে আমাদের আরও বড় সংকট মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীন করতে জোরালো পদক্ষেপ নিতে হবে। এক্ষেত্রে যারা দায়িত্বে আসবেন, তাদের তিনটি বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে। (এক) নৈতিক উচ্চতা, (দুই) পেশাদারিত্ব এবং (৩) সংকট সমাধানে সাহসী উদ্যোগ নিতে হবে।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ব্যাংক খাত হলো অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকা শক্তি। এই খাতে লুট হলে অর্থনীতিতে বিপর্যয় হয়, এখন তাই হয়েছে। এখন ব্যাংক দখল নিয়ে যা বের হচ্ছে, তা দিয়ে থ্রিলার সিনেমা হতে পারে। বর্তমান রাষ্ট্রপতি দখল করা ব্যাংকের ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন। এখন অনেক ব্যাংকে টাকা তোলার লাইন পড়েছে। আমি নিজেও ক্ষতিগ্রস্ত। এর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।

বদিউল আলম মজুমদার আরও বলেন, ব্যাংক পুনর্গঠনপ্রক্রিয়া অব্যাহত রাখতে হবে। পাশাপাশি নগদ টাকার ব্যবহার কমিয়ে আনতে হবে। ব্যাংক রেজোল্যুশন আইনের নতুন ধারা বাতিল করতে হবে।

বারবিডা সভাপতি মো. আব্দুল হাই বলেন, সরকার ব্যাংক লুট করার জন্য পথ তৈরি করে দেয়, এমন উদাহরণ বাংলাদেশ ছাড়া পৃথিবীতে বিরল। পুঁজিবাদের চেহারা কেমন হওয়া উচিত? লুটেরা, অলিগার্ক তৈরির মতো নাকি আইনসিদ্ধ হওয়া উচিত, এই সিদ্ধান্ত বর্তমান সরকারকে নিতে হবে। বর্তমান সরকার যেহেতু বিপ্লবী রক্তের ওপরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তারা নিশ্চয়ই বাংলাদেশের পুঁজিবাদকে জনবান্ধব করে গড়ে তুলতে উদ্যোগ নেবে।

ট্রাস্ট ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফারুক মঈনউদ্দীন বলেন, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া ব্যাংক খাত ঠিক হবে না। কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। ব্যাংকগুলোতে যে লুটপাট হয়েছে, তার হিসাব পৃথক করে ব্যাংকগুলোকে এগিয়ে যেতে হবে।

সেমিনারে ইসলামী ব্যাংকের কয়েকজন গ্রাহক ও পেশাজীবী বক্তব্য দেন। তাঁরা বলেন, রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে ইসলামী ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক দখল করা হয়েছিল। সে জন্য আগে থেকেই পরিবেশ তৈরি করা হয়। তখন সবাই চুপ ছিল। ২ শতাংশ শেয়ার থাকলেই একটি ব্যাংক দখল করা যায়, এটি কেমন সুযোগ। তখন গোয়েন্দা সংস্থার ভূমিকা নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, তা নিয়ে সরকারের বিবৃতি দেওয়ার প্রয়োজন। তাঁরা আরও বলেন, ইসলামী ব্যাংকে আবার কিছু হলে আর কখনো ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না; এবার গ্রাহকেরাই প্রতিরোধ গড়ে তুলবেন।