২০২৬ সালের মাঝামাঝি এসে আবারো বিশ্বরাজনীতি ও দক্ষিণ এশিয়ার গণমাধ্যমগুলোর নজর পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত আজাদ কাশ্মীরে। চলতি বছরের জুলাই-আগস্টে অঞ্চলটিতে পরবর্তী সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এই নির্বাচনকে সামনে রেখে এবং পূর্বের চুক্তি বাস্তবায়নের দাবিতে ‘জম্মু-কাশ্মীর জয়েন্ট আওয়ামী অ্যাকশন কমিটি’ (জেকেজেএ্যাক)-এর ব্যানারে নতুন করে ক্ষোভ ও নাগরিক অসন্তোষের পারদ চড়ছে।
তবে এবারের আন্দোলনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো—এখানে প্রথাগত রাজনৈতিক দলগুলোর চেয়েও বেশি রাজপথে সোচ্চার ভূমিকা রাখছে কাশ্মীরের নতুন শিক্ষিত তরুণ প্রজন্ম বা ‘জেনজি’।
আসলে কী হচ্ছে আজাদ কাশ্মিরে? কিসের এই বিক্ষোভ? আন্দোলনের মূল প্রেক্ষাপট এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের চুলচেরা বিশ্লেষণ নিচে তুলে ধরা হলো:
আন্দোলনের সূত্রপাত: ‘মুজাফ্ফরাবাদ চুক্তি’
আজাদ কাশ্মীরের বর্তমান পরিস্থিতির নেপথ্যে রয়েছে গত বছরের একটি বড় ধরনের গণঅভ্যুত্থান। দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের তীব্র আন্দোলনের মুখে, ২০২৫ সালের ৪ অক্টোবর পাকিস্তান সরকার এবং আন্দোলনকারীদের সংগঠন ‘জয়েন্ট আওয়ামী অ্যাকশন কমিটি’র মধ্যে একটি সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যা ‘মুজাফ্ফরাবাদ চুক্তি’ নামে পরিচিত।
এই চুক্তির প্রধান শর্তগুলো ছিল—আটা-ময়দার ওপর স্থায়ী সরকারি ভর্তুকি দেওয়া, স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত জলবিদ্যুৎ অনুযায়ী কম মূল্যে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা, আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা রাজনৈতিক মামলা প্রত্যাহার এবং আমলাদের অতিরিক্ত ভিআইপি সুবিধা বাতিল করা।
নতুন সংকটের নেপথ্য কারণ
চুক্তি স্বাক্ষরের পর চলতি মে ২০২৬ পর্যন্ত সরকারের পক্ষ থেকে বেশ কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নেওয়া হলেও আন্দোলনকারীদের সব দাবি এখনো পূরণ হয়নি। পাকিস্তান রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা এপিপি -এর মে ২০২৬-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, চুক্তি মেনেই আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে থাকা ১৭৭টি ফৌজদারি মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছে এবং আটার কোটা সচল করা হয়েছে।
তবে এখনো কিছু সাংবিধানিক সংস্কার এবং আইনসভায় জম্মু-কাশ্মীরের বহিরাগত শরণার্থীদের জন্য সংরক্ষিত ১২টি আসনের (Refugee Seats) ভবিষ্যৎ নিয়ে সরকারের সাথে অ্যাকশন কমিটির তীব্র টানাপোড়েন চলছে। জেনজি তরুণ ও অ্যাকশন কমিটির দাবি, এই ১২টি বিতর্কিত আসন বাতিল করতে হবে, কারণ এদের অনেকেই কাশ্মীরে থাকেন না অথচ ভোটের সময় ম্যান্ডেটকে প্রভাবিত করেন।
এর পাশাপাশি স্থানীয় ছাত্র সংগঠন ও তরুণদের দীর্ঘদিনের দাবি—আজাদ কাশ্মীরে দশকের পর দশক ধরে নিষিদ্ধ থাকা ‘ছাত্র সংসদ’ অবিলম্বে পুনরুদ্ধার করা এবং শিক্ষাখাতের ফি কমানো। এই অমীমাংসিত দাবিগুলোর কারণেই আগামী ৩১ মে, ২০২৬-এর ডেডলাইন এবং জুন মাসের ৯ তারিখে ‘লং মার্চ’-এর হুমকি দিয়ে রেখেছে অ্যাকশন কমিটি।
সহিংসতা ও হতাহত
দাবি আদায়ের এই দীর্ঘ লড়াইয়ে আজাদ কাশ্মীরের সাধারণ মানুষকে বড় মূল্য চোকাতে হয়েছে। বিশেষ করে গত বছরের সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরের চূড়ান্ত সংঘাতের সময় আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা এবং বিক্ষোভকারীদের মধ্যে তীব্র সংঘর্ষ হয়।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের তথ্য এপি এবং আরব নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই সহিংসতায় মোট ৯ জন নিহত হন—এর মধ্যে ৩ জন দায়িত্বরত পুলিশ কর্মকর্তা এবং ৬ জন বেসামরিক নাগরিক। সংঘর্ষে ২০০ জনেরও বেশি মানুষ গুরুতর আহত হন। তবে সাম্প্রতিক চুক্তি বাস্তবায়ন কমিটির রিপোর্ট অনুযায়ী, নিহত ও আহতদের পরিবারকে সরকার ইতিমধ্যে আর্থিক ক্ষতিপূরণ ও সরকারি চাকরি প্রদান করেছে।
স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক মিডিয়ার ন্যারেটিভ
আজাদ কাশ্মীরের এই পরিস্থিতি নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যমগুলোর মধ্যে এক তীব্র ‘মনস্তাত্ত্বিক ও আখ্যানের যুদ্ধ’ লক্ষ্য করা গেছে- ডন ও জিও নিউজ এই বিক্ষোভকে কোনো ‘রাষ্ট্রবিরোধী’ বা বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন হিসেবে দেখছে না। তাদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এটি সম্পূর্ণভাবে ‘আর্থ-সামাজিক ও নাগরিক অধিকার আদায়ের আন্দোলন’। তাদের মতে, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের কারণেই এই জনরোষ।
ভিন্ন চিত্র ভারতীয় মিডিয়ায়। এনডিটিভি ও উইয়ন -এর প্রতিবেদনে একে একটি বিচ্ছিন্নতাবাদী বিক্ষোভ এবং পাকিস্তান শাসন থেকে মুক্তির অভ্যুত্থান হিসেবে চিত্রায়িত করা হচ্ছে। ভারতের নিউজ চ্যানেলগুলোর দাবি, এখানকার মানুষ মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হয়ে এখন ভারতের জম্মু-কাশ্মীরের মতো উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতা চাইছে।
আল জাজিরা এবং অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মতো নিরপেক্ষ থিংক-ট্যাংকগুলোর মতে, এই আন্দোলন কোনো ভূ-রাজনৈতিক এজেন্ডা নয়, বরং এটি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের একটি স্বতঃস্ফূর্ত নাগরিক লড়াই। জলবিদ্যুৎ সমৃদ্ধ অঞ্চল হওয়া সত্ত্বেও কেন স্থানীয়দের চড়া মূল্যে বিদ্যুৎ কিনতে হবে এবং গ্যাস সিলিন্ডারের দাম কেন আড়াই হাজার থেকে ৬ হাজারে উঠবে—সেই মৌলিক অর্থনৈতিক অধিকারের দাবিই এই আন্দোলনের চালিকাশক্তি।
নেতাদের বক্তব্য ও বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ জেকেজেএ্যাক-এর শীর্ষ কেন্দ্রীয় নেতা ও কো-চেয়ারম্যান ইমতিয়াজ আসলাম এবং শওকত নওয়াজ মীর আল জাজিরাকে জানান, ‘আমাদের এই আন্দোলন সম্পূর্ণ নাগরিক ও অর্থনৈতিক অধিকারের পক্ষে, এর পেছনে কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদী বা রাষ্ট্রবিরোধী এজেন্ডা নেই। আমরা স্রেফ আমাদের ন্যায্য উন্নয়ন ও বিদ্যুৎ-খাবারে ভর্তুকি চাইছি।’
কায়েদ-ই-আজম বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. জাফর জাসপাল বলেন, ‘আজাদ কাশ্মীরের সাধারণ মানুষের এই তীব্র অসন্তোষের মূল কারণ হলো ‘আর্থিক ও শাসতান্ত্রিক ব্যবধান’। একদিকে পাকিস্তানের মূল ভূখণ্ড এবং কাশ্মীরের স্থানীয় রাজনীতিবিদ ও আমলারা বিলাসী জীবনযাপন করছেন, অন্যদিকে সাধারণ মানুষ বিশেষ করে শিক্ষিত তরুণ প্রজন্ম মুদ্রাস্ফীতি এবং জীবনযাত্রার ব্যয়ের যাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছেন। এই চরম বৈষম্যই মূলত ক্ষোভের মূল জ্বালানি হিসেবে কাজ করেছে।’