দেশের মধ্যবিত্ত ও সাধারণ মানুষের এক সময়ের সবচেয়ে নিরাপদ বিনিয়োগের জায়গা ‘সঞ্চয়পত্র’ এখন ফিকে হয়ে আসছে। গত কয়েক বছরের ধারাবাহিকতায় এবারও সঞ্চয়পত্র থেকে সরকার কোনো নিট ঋণ তো নিতে পারছেই না, উল্টো আগের বিনিয়োগকারীদের পাওনা পরিশোধ করতে গিয়ে সরকারি কোষাগারে টান পড়ছে। গত আট মাসের পরিসংখ্যান বলছে, সাধারণ মানুষ নতুন করে সঞ্চয়পত্র কেনার চেয়ে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই তা ভাঙানোর দিকে বেশি ঝুঁকছেন। এর ফলে বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকার এখন ব্যাংক ব্যবস্থার ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের বেসরকারি খাতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদরা।
সঞ্চয়পত্রের করুণ চিত্র: বিক্রির চেয়ে পরিশোধ বেশি অর্থ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে সঞ্চয়পত্র বিক্রি করে ১২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছিল সরকার। কিন্তু বাস্তবতা এর সম্পূর্ণ উল্টো। চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) সঞ্চয়পত্র থেকে সরকারের নিট আয় ঋণাত্মক ৫৫৫ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ এই আট মাসে মানুষ যে পরিমাণ টাকা সঞ্চয়পত্রে খাটিয়েছেন, সরকার তার চেয়ে বেশি টাকা গ্রাহকদের ফেরত দিয়েছে।
জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের মহাপরিচালক রওশন আরা বেগম স্বাক্ষরিত একটি চিঠি সম্প্রতি অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ (আইআরডি)-এর সচিব আবদুর রহমান খানের কাছে পাঠানো হয়েছে। সেখানে দেখা যায়, শুধু ফেব্রুয়ারি মাসেই সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি ঋণাত্মক হয়েছে ১ হাজার ১৬৫ কোটি টাকা। ওই মাসে ৬ হাজার ৪০৭ কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হলেও গ্রাহকদের পরিশোধ করতে হয়েছে ৭ হাজার ৫৭১ কোটি টাকা। পুরো আট মাসের হিসাবে মোট বিক্রি হয়েছে ৬১ হাজার ৩১৩ কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র, আর বিপরীতে পরিশোধ করতে হয়েছে ৬১ হাজার ৮৬৮ কোটি টাকা।
টানা চার বছরের ধারাবাহিক পতন পরিসংখ্যান বলছে, এটি কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়; বরং টানা চার বছর ধরে সঞ্চয়পত্র খাত থেকে ঋণাত্মক প্রবাহ চলছে।
২০২৪-২৫ অর্থবছর নিট বিক্রি ছিল ঋণাত্মক ৬ হাজার ৬৩ কোটি টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ ছিল, ঋণাত্মক ১৭ হাজার ৯৯৯ কোটি টাকা। ২০২১-২২ অর্থবছরে এই বছরে সরকার এ খাত থেকে ২০ হাজার ২৬০ কোটি টাকার নিট ঋণ পেয়েছিল। এরপর থেকে মূলত সঞ্চয়পত্রের ওপর কর বৃদ্ধি, মুনাফার হার কমানো এবং জাতীয় পরিচয়পত্রের কড়াকড়ির কারণে মধ্যবিত্তের এই আস্থার জায়গাটি সংকুচিত হয়ে পড়ে।
সুদের বোঝা ও সরকারি ব্যয় সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ নেওয়া সরকারের জন্য ‘দামি ঋণ’ হিসেবে পরিচিত। কারণ ব্যাংক বা ট্রেজারি বন্ডের তুলনায় সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার কিছুটা বেশি থাকে। আইআরডি সচিব আবদুর রহমান খান জানান, আগামী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে ঋণের সুদ পরিশোধ বাবদ ১ লাখ ২২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এই বিপুল অর্থের একটি বড় অংশই চলে যাবে সঞ্চয়পত্র ও ট্রেজারি বিল-বন্ডের সুদ পরিশোধে। বিগত সরকারের সময় সুদ ব্যয় কমাতে নানা বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছিল, যার ফলে নতুন বিনিয়োগ কমেছে। কিন্তু পুরনো সঞ্চয়পত্রের মেয়াদ শেষ হওয়ায় এখন সুদ-আসলে সরকারকে বিপুল অর্থ পরিশোধ করতে হচ্ছে।
বিকল্প গন্তব্য: ব্যাংক ঋণের বিপজ্জনক সীমা সঞ্চয়পত্র থেকে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী অর্থ না আসায় সরকার এখন বাজেট বাস্তবায়নে বাণিজ্যিক ব্যাংক এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখাপেক্ষী। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের ক্ষমতা গ্রহণের মাত্র ৫২ দিনের মধ্যেই ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে প্রায় ৪৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছে। চলতি অর্থবছরের বাজেটে ব্যাংক ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। অথচ এপ্রিলের শুরুতেই এই ঋণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১২ হাজার ৭৬১ কোটি টাকাÑযা লক্ষ্যমাত্রার ১০৮ শতাংশ। অর্থাৎ বছরের একটি বড় সময় বাকি থাকতেই সরকার তার ঋণের সীমা অতিক্রম করে ফেলেছে।
অর্থনীতিবিদদের উদ্বেগ: বেসরকারি খাত ও কর্মসংস্থান সরকার যখন ব্যাংক থেকে অতিরিক্ত ঋণ নেয়, তখন বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর হাতে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত তহবিল থাকে না। একে অর্থনীতির ভাষায় ‘ক্রাউডিং আউট ইফেক্ট’ বলা হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকার এভাবে ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নিলে দেশের শিল্পায়ন বাধাগ্রস্ত হবে। নতুন কলকারখানা তৈরি হবে না, যার ফলে কর্মসংস্থান কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। এছাড়া উচ্চ ব্যাংক ঋণ দেশে মূল্যস্ফীতি বা দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিতেও সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে।
কেন সঞ্চয়পত্র ভাঙছেন গ্রাহকরা? বাজারে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে সাধারণ মানুষের সঞ্চয় করার ক্ষমতা কমেছে। মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় এখন আয়ের চেয়ে বেশি। ফলে অনেকে জমানো সঞ্চয়পত্র ভেঙে দৈনন্দিন খরচ মেটাচ্ছেন। এছাড়া মুনাফার হারের ওপর বর্ধিত কর এবং বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কারণে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা এখন সঞ্চয়পত্রের বিকল্প খুঁজছেন।
সঞ্চয়পত্র খাতের এই নেতিবাচক অবস্থা কাটাতে সরকারকে নীতিগত পরিবর্তনের কথা ভাবতে হবে। কেবল সুদের হার কমিয়ে ঋণের বোঝা কমানোর চেষ্টা করলে তা হিতে বিপরীত হতে পারে। যদি সাধারণ মানুষের বিনিয়োগের আস্থার জায়গাটি নষ্ট হয়, তবে সরকারকে চরম সুদে বিদেশি অথবা ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভর করতে হবে। বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটের কালে ব্যাংক ঋণের লাগাম টেনে ধরে সঞ্চয়পত্রের মতো অভ্যন্তরীণ উৎসগুলোকে আরও জনবান্ধব করা সময়ের দাবি। অন্যথায়, বেসরকারি খাতের বিকাশ থমকে গিয়ে সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হতে পারে।