- হরমুজ-এ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে অনড় ইরান
- পোপকে ইরানী প্রেসিডেন্টের বার্তা
হরমুজ প্রণালি ঘিরে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে যুক্তরাষ্ট্র ও বাহরাইনের যৌথ উদ্যোগে উত্থাপিত খসড়া প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করেছে চীন। প্রস্তাবটির বিষয়বস্তু ও সময় নির্বাচনকে ‘অনুপযুক্ত’ উল্লেখ করে বেইজিং স্পষ্ট জানিয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে এমন কোনো প্রস্তাব সংকট সমাধানে সহায়ক হবে না। জাতিসংঘে নিযুক্ত চীনের স্থায়ী রাষ্ট্রদূত ফু চং বলেন, হরমুজ পরিস্থিতি নিয়ে একপেশে অবস্থান গ্রহণ করে কোনো প্রস্তাব পাস করা হলে তা সংকট আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, বর্তমান সময়ে সবচেয়ে জরুরি হলো সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনা। রয়র্টাস, এএফপি, নিউইয়র্ক টাইমস, আল জাজিরা।
নিরাপত্তা পরিষদে জমা দেওয়া মার্কিন-বাহরাইনের খসড়া প্রস্তাবে ইরানের প্রতি হরমুজ প্রণালিতে সামরিক হামলা ও মাইন স্থাপন বন্ধের আহ্বান জানানো হয়েছে। তবে কূটনৈতিক মহলের ধারণা, এই প্রস্তাব চূড়ান্ত অনুমোদন পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। প্রস্তাবটি নিরাপত্তা পরিষদে ভোটে উঠলে রাশিয়া ও চীনের ভেটোর মুখে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর আগে গত মাসেও প্রায় একই ধরনের একটি মার্কিন সমর্থিত প্রস্তাবের বিরুদ্ধে চীন ও রাশিয়া ভেটো প্রয়োগ করেছিল। তখন দুই দেশই অভিযোগ তোলে, প্রস্তাবের ভাষা সম্পূর্ণ একপেশে এবং তা কেবল ইরানের ওপর দায় চাপানোর উদ্দেশ্যে তৈরি। জাতিসংঘভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ‘পাসব্লু’ তে প্রকাশিত এক ভিডিও সাক্ষাৎকারে ফু চং বলেন, “আমরা মনে করি না যে এই প্রস্তাবের বিষয়বস্তু সঠিক। এমনকি এর জন্য নির্ধারিত সময়ও মোটেও উপযুক্ত নয়।” তিনি আরও বলেন, “এই জটিল মুহূর্তে কোনো জোড়াতালির প্রস্তাব পাস করলে পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত হবে সব পক্ষকে আন্তরিক কূটনৈতিক আলোচনায় উৎসাহিত করা।”
চীনের এই অবস্থানের ফলে মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালি ঘিরে ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা আরও তীব্র হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে পরাশক্তিগুলোর মধ্যে বিভক্তিও নতুন করে সামনে এসেছে।
শীর্ষ উপদেষ্টাদের ইরান যুদ্ধের পরিকল্পনা তৈরি
শান্তি আলোচনা স্থবির হয়ে পড়ায় আগামী সপ্তাহেই ইরানের ওপর নতুন নামে বড় ধরনের সামরিক হামলা চালাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যৌথভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছে। চীন সফর থেকে ফেরার পথে ট্রাম্প ইরানের শান্তি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং চুক্তি না হলে ইরানকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন। হামলার পাশাপাশি পারমাণবিক কেন্দ্রে স্থল অভিযানের পরিকল্পনা, এ জন্য মার্কিন বিশেষ বাহিনীকে সরাসরি নামানোর পরিকল্পনাও রয়েছে। ইরানও যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে, হরমুজ প্রণালিতে তাদের ৩০টি ক্ষেপণাস্ত্রকেন্দ্র আবার সচল করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চীন সফর শেষে গত শুক্রবার দেশে ফিরেছেন। এখন তিনি ইরান নিয়ে বড় ধরনের কিছু সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। ট্রাম্প আরও বেশি বোমা মেরে এই অচলাবস্থা ভাঙার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, এমনটা মাথায় রেখে আবার অভিযান শুরু করতে ইতিমধ্যেই পরিকল্পনা তৈরি করে রেখেছেন তার শীর্ষ উপদেষ্টারা। উপদেষ্টারা জানিয়েছেন, ট্রাম্প তার পরবর্তী পদক্ষেপের বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেননি। তবে স্বার্থসংশ্লিষ্ট দেশগুলোর কর্মকর্তারা সমঝোতায় পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন। তারা ইরানকে বুঝিয়ে হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়ার পদক্ষেপ নিচ্ছেন। এটা হলে ট্রাম্প নিজেকে বিজয়ী ঘোষণা করতে পারবেন। তিনি সন্দিহান মার্কিন ভোটারদের বোঝাতে পারবেন, ইরানে এই ব্যয়বহুল ও প্রাণঘাতী সামরিক অভিযান সফল ছিল। কিন্তু বেইজিং ছাড়ার পরপরই শুক্রবার এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের কাছে ট্রাম্প আবারও স্পষ্ট করে দিয়েছেন, ইরানের সর্বশেষ শান্তি প্রস্তাবটি গ্রহণযোগ্য ছিল না।
অভিযান শুরুর পরিকল্পনা করছে পেন্টাগন
এই যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্পকে দ্বিমুখী পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে। যদিও এটি তার জন্য রাজনৈতিক দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাকে বিষয়টি পার করে সামনে এগিয়ে যেতে উদ্গ্রীব বলে মনে হয়েছে। তবে প্রেসিডেন্ট এখনো সেই লক্ষ্য অর্জন করতে পারেননি। তিনি প্রায়ই যুদ্ধের চূড়ান্ত লক্ষ্য হিসেবে বলেছিলেন, ইরানকে কখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে দেওয়া হবে না। অপারেশন এপিক ফিউরি’ আগামী দিনগুলোতে আবার শুরুর সম্ভাবনা নিয়ে পরিকল্পনা করছে পেন্টাগন। গত মাসে প্রেসিডেন্ট যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করার পর সাময়িকভাবে এ অভিযান স্থগিত করা হয়েছিল। তবে এবার এটি নতুন কোনো নামেও শুরু হতে পারে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এ সপ্তাহে কংগ্রেসে সাক্ষ্য দেওয়ার সময় আইনপ্রণেতাদের বলেন, ‘প্রয়োজন হলে যুদ্ধ আরও তীব্র করার পরিকল্পনা আমাদের রয়েছে।’ হেগসেথ আরও বলেন, সবকিছু গুটিয়ে বাড়ি ফিরে যাওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে। যদি তাই হয়, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যে বর্তমানে মোতায়েন অতিরিক্ত ৫০ হাজারের বেশি সেনাকে আবার স্বাভাবিক দায়িত্বে ফিরিয়ে আনা হবে। অভিযানসংক্রান্ত বিষয়ে আলোচনার বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে মধ্যপ্রাচ্যের দুজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আগামী সপ্তাহের মধ্যেই ইরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য হামলা আবার শুরুর জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ব্যাপক প্রস্তুতি নিচ্ছে। যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে এটাকে সবচেয়ে বড় প্রস্তুতি বলে মনে হচ্ছে। চীন সফরের উদ্দেশে রওনা দেওয়ার আগে গত মঙ্গলবার ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘তারা হয় একটি চুক্তিতে আসবে, না হয় পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাবে। যেভাবেই হোক, জয় আমাদেরই হবে।’
হরমুজ প্রণালির ওপর ‘নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে’ অনড় ইরান
বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালির বিষয়ে নিজেদের অবস্থানে অনড় রয়েছে ইরান। ফলে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ ইস্যুতে দেশটির কোনো মনোভাব পরিবর্তন হয়নি।
গতকাল শনিবার কাতারভিত্তিক গণমাধ্যম এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান কেবল এটাই বলছে, হরমুজ প্রণালিতে কোনো আন্তর্জাতিক জলসীমা নেই। এটি শুধুমাত্র ইরান এবং ওমানের আঞ্চলিক জলসীমা। আর এই কারণেই তারা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে যে এই প্রণালিটি কেবল এই দু’টি দেশের মাধ্যমেই পরিচালিত হওয়া উচিত।
তেহরান এবং মাস্কাটের (ওমানের রাজধানী) মধ্যে ইতোমধ্যে দুই দফা প্রযুক্তিগত আলোচনা হয়েছে। তবে, প্রকাশ্যভাবে ওমান পক্ষ এখনো এই কৌশলগত জলপথটিকে একটি আন্তর্জাতিক জলপথ হিসেবেই স্বীকৃতি দেয়। কিন্তু ইরানিরা যখন বলে এটি আন্তর্জাতিক জলপথ নয়, তখন তারা তাদের অবস্থানে বেশ অটল থাকে।
ফলস্বরূপ, তারা বলছে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যদি কোনো শান্তি চুক্তিও হয়, তবুও ইরানিরা হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতেই রাখবে। এটিই এখন যুদ্ধরত পক্ষগুলোর মধ্যে উত্তেজনার প্রধান উৎস।
পোপকে বার্তা ইরানের প্রেসিডেন্টের
ইরান এখনও কূটনীতি এবং শান্তিপূর্ণ সমাধানের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ রয়েছে বলে জানিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। ক্যাথলিক খ্রিস্টানদের প্রধান ধর্মগুরু পোপ লিও চতুর্দশের কাছে পাঠানো এক বার্তায় তিনি এই মনোভাব ব্যক্ত করেন। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের বরাত দিয়ে এই তথ্য জানা গেছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনা জানিয়েছে, বারবার ইরানের ওপর হওয়া সাম্প্রতিক সামরিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে পোপের নৈতিক ও যৌক্তিক অবস্থানের জন্য তেহরানের পক্ষ থেকে গভীর কৃতজ্ঞতা ও প্রশংসা প্রকাশ করেছেন প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান।
বার্তায় ইরানি প্রেসিডেন্ট উল্লেখ করেন, তার দেশ ‘বৈধ আত্মরক্ষার কাঠামোর মধ্যে থেকে’ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে। একই সঙ্গে আমেরিকার সকল বেআইনি কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করার আহ্বান জানান তিনি।