মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে যুদ্ধের ঘনঘটা কি কেবলই এক দীর্ঘস্থায়ী ‘স্থির সংঘাতের’ (Frozen conflict) পূর্বাভাস, নাকি এটি কোনো এক মহাক্ষমতার পতনের মহড়া? ট্রাম্পের সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতি ঘোষণা এবং ইরানের রণকৌশল এই প্রশ্নটিকেই এখন বড় করে তুলছে।

ট্রাম্প নিউইয়র্ক পোস্টকে জানিয়েছেন, শুক্রবারের মধ্যে ইরানের সঙ্গে আলোচনা হতে পারে। অথচ আল্টিমেটাম শেষ হওয়ার মাত্র এক ঘণ্টা আগে তিনি অনির্দিষ্টকালের জন্য যুদ্ধবিরতি বাড়ালেন। কেন এই পিছুটান? ট্রাম্প দাবি করছেন, পাকিস্তান অনুরোধ করেছে। কিন্তু তেহরানের সুর ভিন্ন। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্পষ্ট জানিয়েছে, তারা কোনো যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দেয়নি। এর প্রমাণ হিসেবে তারা রাতের অন্ধকারে বিশাল ‘মিলিটারি ডিসপ্লে’ বা শক্তি প্রদর্শন করেছে।

সাবেক আমেরিকান কর্নেল ডেভিসের ভাষায় যা ছিল এক ‘ডুমসডে প্যারেড’। ইরান আসলে বিশ্বকে দেখাতে চেয়েছে—অসম যুদ্ধ হলেও কৌশলগতভাবে তারা পিছিয়ে নেই। সস্তা প্রযুক্তিতে তৈরি অথচ নিখুঁত নিশানার ড্রোন ও মিসাইল দিয়ে তারা পুরো অঞ্চলকে হাতের মুঠোয় রাখার ক্ষমতা রাখে।

পেন্টাগনের উদ্বেগ ও সামরিক সীমাবদ্ধতা

সিএনএন-এর বরাতে পেন্টাগনের বিশেষজ্ঞদের যে তথ্য সামনে এসেছে, তা রীতিমতো চমকে দেওয়ার মতো। মাত্র ৪০ দিনের যুদ্ধে আমেরিকার থাড ও প্যাট্রিয়ট মিসাইলের অর্ধেকই শেষ হয়ে গেছে। ৪৫ শতাংশ শেষ হয়ে গেছে তাদের নির্ভুল আঘাত হানার মিসাইল (Precision Strike Missile)। গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বলছে, এত কিছুর পরও ইরানের সামরিক সক্ষমতার অর্ধেকও ধ্বংস করা সম্ভব হয়নি।

এ অবস্থায় প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক—আমেরিকা কি আসলে আর যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার অবস্থায় আছে? যদি আজ রাশিয়া বা চীনের সঙ্গে কোনো বড় সংঘাতে জড়াতে হয়, তবে পেন্টাগন কি টিকে থাকতে পারবে? সম্ভবত এই বাস্তবতাই ট্রাম্পকে আলোচনায় বসতে বাধ্য করছে। ইরান এখানে স্পষ্টতই ‘আউটলাস্ট’ বা টিকে থাকার লড়াইয়ে এগিয়ে যাচ্ছে।

হরমুজ অবরোধ ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

বর্তমানে মূল যুদ্ধটা ভূখণ্ড ছেড়ে সমুদ্রপথের দিকে মোড় নিয়েছে। ইরান জাহাজ জব্দ করছে, আমেরিকাও পাল্টা ব্যবস্থা নিচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, হরমুজ প্রণালীর এই অচলাবস্থা কে আগে ভাঙবে? ব্রিটিশ সামরিক বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মাইকেল ক্লার্ক মনে করছেন, আমেরিকা সরঞ্জাম গোছানোর জন্য সময় নিচ্ছে এবং আগামী সপ্তাহে বড় হামলা চালাবে। তবে বর্তমান পরিস্থিতি বলছে ভিন্ন কথা। যুদ্ধটা সম্ভবত একটি স্থির সংঘাত বা ‘ফ্রোজেন কনফ্লিক্ট’-এ রূপ নিতে পারে।

এই পুরো পরিস্থিতি আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে ১৯৫৬ সালের ‘সুয়েজ ক্যানেল সংকট’-এর কথা। তৎকালীন মিশরের নেতা আবদেল নাসের যখন সুয়েজ খাল জাতীয়করণ করেন, তখন ব্রিটিশ সাম্রাজ্য ফ্রান্স ও ইসরায়েলকে নিয়ে আধিপত্য ফিরে পেতে নৌবহর পাঠিয়েছিল। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং খোদ আমেরিকার চাপে ব্রিটেনকে পিছু হটতে হয়। ইতিহাসবিদরা মনে করেন, সেই সুয়েজ সংকটই ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পতনের কফিনে শেষ পেরেক।

নতুন বিশ্বব্যবস্থার ইঙ্গিত?

আজকের হরমুজ প্রণালীতে আমেরিকা ঠিক একই ধরনের সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্য বজায় রাখার চেষ্টা করছে। কিন্তু এবার প্রেক্ষাপট ভিন্ন। ইরানের পেছনে পাহাড়ের মতো দাঁড়িয়ে আছে রাশিয়া ও চীন। যদি আমেরিকা এই সংকটে সম্মানজনকভাবে বেরিয়ে আসতে না পারে, তবে এটিই হতে পারে আমেরিকান সামরিক শক্তির ‘সুয়েজ মুহূর্ত’।

আমেরিকার অভ্যন্তরীণ মিসাইল সংকট এবং ইরানের কৌশলগত অবস্থান ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, বিশ্ব এক নতুন ‘গ্লোবাল অর্ডার’ বা বিশ্বব্যবস্থার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে। সামরিক শক্তির দম্ভ যখন ফুরিয়ে আসে, তখনই শুরু হয় নতুন কোনো শক্তির উত্থান। আগামী কয়েক সপ্তাহ হয়তো নির্ধারণ করে দেবে, বিশ্বমঞ্চে আমেরিকার একচ্ছত্র আধিপত্যের সূর্য অস্তমিত হতে চলেছে কি না।