মাসব্যাপী চলমান যুদ্ধবিরতির মধ্যে সবচেয়ে বড় পরীক্ষার মুখে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। গতকাল বৃহস্পতিবার দুই দেশ একে অপরের লক্ষ্যবস্তুতে পাল্টাপাল্টি হামলা চালিয়েছে। তবে ইরান বলেছে, বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, তারা পরিস্থিতির আর অবনতি চায় না। ইরানের সামরিক বাহিনীর দাবি, যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালিতে প্রবেশ করা দুটি জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করেছে ও ইরানের ভূখণ্ডে হামলা চালিয়েছে। বিপরীতে মার্কিন বাহিনী বলেছে, ইরানের আক্রমণের পাল্টা জবাব দিতেই গুলী চালিয়েছে তারা। সি এন এন, বিবিসি, প্রেস টিভি, গালফ নিউজ, মিডল ইস্ট আই।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এ ঘটনাকে তেমন গুরুত্ব দিতে নারাজ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে তিনি এ পাল্টাপাল্টি হামলাকে ‘লাভ ট্যাপ’ (সামান্য আঘাত) বলে আখ্যায়িত করেছেন। তার দাবি, যুদ্ধবিরতি এখনো কার্যকর। এমন এক সময়ে এ পাল্টাপাল্টি হামলা হলো, যখন ওয়াশিংটন একটি শান্তি প্রস্তাবের ব্যাপারে ইরানের উত্তরের অপেক্ষায় ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া এ প্রস্তাবে যুদ্ধ বন্ধের কথা থাকলেও ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির মতো জটিল বিষয়গুলো অমীমাংসিত রাখা হয়েছে।
পাল্টাপাল্টি অভিযোগ: ইরানের সামরিক কমান্ড অভিযোগ করেছে, যুক্তরাষ্ট্র একটি তেলবাহী ট্যাংকার ও অন্য একটি জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করেছে। সামরিক কমান্ড আরও বলেছে, হরমুজ প্রণালির কেশম দ্বীপ (ইরানের সবচেয়ে বড় দ্বীপ) এবং মূল ভূখণ্ডের বন্দর খামির ও সিরিক এলাকায় বেসামরিক লোকজনের ওপর বিমান হামলা চালিয়েছে মার্কিন বাহিনী। জবাবে ইরান হরমুজ প্রণালির পূর্ব ও চাবাহার বন্দরের দক্ষিণে থাকা মার্কিন যুদ্ধজাহাজে হামলা চালায়। এমন এক সময়ে এ পাল্টাপাল্টি হামলা হলো যখন ওয়াশিংটন একটি শান্তি প্রস্তাবের ব্যাপারে ইরানের উত্তরের অপেক্ষায় ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া এ প্রস্তাবে যুদ্ধ বন্ধের কথা থাকলেও ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির মতো জটিল বিষয়গুলো অমীমাংসিত রাখা হয়েছে।
ইরানের খাতাম আল-আনবিয়া কেন্দ্রীয় সদর দপ্তরের একজন মুখপাত্র দাবি করেন, তাদের হামলায় মার্কিন বাহিনীর ‘উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতি’ হয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এ দাবি প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, তাদের কোনো সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি।
সেন্টকম বলেছে, ইরান তিনটি মার্কিন ডেস্ট্রয়ার (যুদ্ধজাহাজ) লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও ছোট নৌযান দিয়ে হামলা চালিয়েছিল। সেন্টকম এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, সেন্টকম পরিস্থিতির অবনতি চায় না, তবে মার্কিন বাহিনীকে সুরক্ষা দিতে তারা সদা প্রস্তুত এবং মোতায়েন রয়েছে।
ইরানও পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, আক্রান্ত হলে তারাও জবাব দেবে। দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের তথ্য অনুযায়ী, এক সামরিক মুখপাত্র বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের জেনে রাখা উচিত যে যেকোনো ধরনের আগ্রাসন বা হামলার জবাবে ইরান বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে অত্যন্ত শক্তিশালীভাবে পাল্টা আঘাত করবে।’যুদ্ধবিরতি এখনো কার্যকর আছে। যদি দ্রুত চুক্তি সই না করা হয়, তবে ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ ও কঠোর হামলা চালানো হবে। ইরানের প্রেস টিভি পরে জানিয়েছে, কয়েক ঘণ্টা ধরে পাল্টাপাল্টি গোলাগুলির পর হরমুজ প্রণালির ইরানি দ্বীপ ও উপকূলীয় শহরগুলোয় পরিস্থিতি এখন স্বাভাবিক রয়েছে।
যুদ্ধবিরতি এখনও বহাল আছে’: যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হরমুজ প্রণালিতে পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা ঘটলেও ‘যুদ্ধবিরতি এখনও বহাল আছে’ বলে দাবি করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মার্কিন সংবাদমাধ্যম তিনি বলেন, ‘যুদ্ধবিরতি চলছে। এটি কার্যকর আছে’। আর সংঘর্ষের ঘটনাকে ‘কেবল হালকা সংঘাত’ বলে বর্ণনা করেন ট্রাম্প। গভীর রাতে হামলা ও পাল্টা হামলার ঘটনাটি ঘটে। ইরানি বাহিনী ও মার্কিন বাহিনীও এই সংঘাতের কথা স্বীকার করেছে।
তেল উৎপাদনে ইরানের বাজিমাত: দীর্ঘ ৪০ দিনের মার্কিন-ইসরাইলী আগ্রাসন ও নানামুখী চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও ইরানের জ্বালানি খাতে কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়েনি বলে জানিয়েছে দেশটির সরকার। আজ শুক্রবার তেহরানে এক বিবৃতিতে ইরানের পেট্রোলিয়ামমন্ত্রী মহসেন পাকনেজাদ নিশ্চিত করেছেন, যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতেও তার দেশের অপরিশোধিত তেল উৎপাদন এবং রপ্তানি প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ছিল।
২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া ওই সংঘাতের সময় কিছু জ্বালানি স্থাপনায় হামলা হলেও তেল খাতের কর্মীদের নিরলস প্রচেষ্টায় সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রাখা সম্ভব হয়েছে। মন্ত্রী আরও জানান, শত্রুভাবাপন্ন শক্তির হামলায় যেসব স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, সেগুলোর পুনর্গঠন কাজ বর্তমানে দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই সেগুলো পুনরায় পুরোদমে চালু করা হবে।
এদিকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে ইরানের কঠোর অবস্থান বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ৮ এপ্রিল পাকিস্তান-মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তি মার্কিন প্রশাসন লঙ্ঘন করেছে, এমন অভিযোগ তুলে ইরান ওই এলাকায় শত্রুপক্ষের জাহাজের জন্য চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে।
তবে এই অবরোধের মধ্যেই মার্কিন নৌবাহিনীর কড়া নজরদারি এড়িয়ে তিনটি ইরানি ট্যাঙ্কার সফলভাবে তেহরানে ফিরে এসেছে বলে খবর পাওয়া গেছে। ট্যাঙ্কার ট্র্যাকিং সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৫০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহনে সক্ষম এই বিশাল জাহাজগুলো পাকিস্তানের জলসীমা ব্যবহার করে ইরানের বন্দরে পৌঁছেছে, যা মার্কিন অবরোধকে কার্যত ব্যর্থ করে দিয়েছে।
অন্যদিকে, হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে কেবল সামরিক কৌশল নয় বরং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির নতুন পথ খুঁজছে তেহরান। ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা ও বৈদেশিক নীতি বিষয়ক সংসদীয় কমিশনের সদস্য আলি খেজরিয়ান জানিয়েছেন, মন্ত্রিসভার সাম্প্রতিক বৈঠকে এই প্রণালীর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা থেকে রাজস্ব আয়ের একটি পরিকল্পনা পেশ করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ট্রানজিট ফি, সামুদ্রিক পরিষেবা এবং উন্নত ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার মাধ্যমে ইরান এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ থেকে বড় অংকের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সম্ভাবনা দেখছে। ইরানের পক্ষ থেকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, যতক্ষণ পর্যন্ত তাদের বন্দরে মার্কিন অবরোধ বজায় থাকবে, ততক্ষণ পর্যন্ত শত্রুপক্ষের জন্য এই জলপথ রুদ্ধ থাকবে এবং আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনকারী এই অবরোধকে তারা জলদস্যুতা হিসেবেই বিবেচনা করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধ ভেঙে ইরানে গেলো দেশটির তিন ট্যাংকার
গতকাল যুক্তরাষ্ট্রের আরোপ করা নৌ-অবরোধ ভেঙে নিজ দেশে ফিরে গেছে ইরানের তিনটি খালি তেলের ট্যাংকার। শুক্রবার এ তথ্য জানিয়েছে ট্রেকিং ওয়েবসাইট ট্র্যাংকার ট্রেকার্স। তারা বলেছে, গত দুইদিনে পাকিস্তানের বিশেষ অর্থনৈতিক জোন দিয়ে ট্যাংকারগুলো ইরানে ফিরেছে। দুটি ট্যাংকারকে স্যাটেলাইটের ছবিতে দেখা গেছে।
আকাশসীমা খুলে দিলো সৌদী-কুয়েত
হরমুজ প্রণালিতে আটকে থাকা জাহাজগুলোকে নিরাপত্তা দিয়ে বের করে নিতে গত রোববার ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ নামে একটি অভিযান শুরুর ঘোষণা দিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে দুদিন পেরোতেই সিদ্ধান্ত বদল করেন তিনি। কারণ হিসেবে ট্রাম্প জানান, ইরানের সঙ্গে তাদের আলোচনায় অগ্রগতি হয়েছে। তবে গতকাল বৃহস্পতিবার জানা যায়, যুক্তরাষ্ট্রকে এ অভিযানের জন্য নিজেদের ঘাঁটি ও আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি দেয়নি সৌদি আরব ও কুয়েত। এতে ট্রাম্প এমন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হন।
তবে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়ালস্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের জন্য আকাশসীমা ও ঘাঁটি ব্যবহারের নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছে সৌদি ও কুয়েত। এরফলে আবারও প্রজেক্ট ফ্রিডম চালুর দিকে এগোচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র।
মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র ওয়ালস্ট্রিট জার্নালকে জানিয়েছেন, চলতি সপ্তাহের মধ্যেই আবারও অভিযান শুরুর সম্ভাবনা আছে। গত রোববার যখন ট্রাম্প প্রজেক্ট ফ্রিডম অভিযান শুরুর ঘোষণা দেন তখন বিষয়টি আরব দেশগুলোকে অবাক করে। কারণ তাদের সঙ্গে এ ব্যাপারে মার্কিন সরকার কোনো ধরনের আলোচনাই করেনি। এরপর সৌদী ও কুয়েত যুক্তরাষ্ট্রকে জানায়, এ অভিযানের জন্য তারা তাদের ঘাঁটি ও আকাশসীমা ব্যবহার করতে দেবে না। এরপর সৌদীর ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানকে ফোন করেন ট্রাম্প। কিন্তু তারা দুজন এ নিয়ে একমত হতে পারেননি।