বিবিসি, রয়টার্স
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যে তখন সকাল গড়িয়ে প্রায় দুপুর, বেলা ঠিক ১১টা ৪০ মিনিট। এ সময় নাওয়াল আল-নুরির ফোনে একটি হোয়াটসঅ্যাপ বার্তা আসে। বার্তাটি ছিল তাঁর সাত বছরের মেয়ের স্কুল থেকে। সেখানে লেখা, স্কুলে একজন বন্দুকধারী হামলা চালিয়েছে। নাওয়ালের প্রথমে বিশ্বাস হয়নি। স্কুলটি ছিল সান ডিয়েগোর ইসলামিক সেন্টার অব সান ডিয়েগো কমপ্লেক্সের ভেতরে। গত সোমবার সেখানে দুই বন্দুকধারী গুলি চালিয়ে তিনজনকে হত্যা করে। হামলার সময় সেখানে ১৪০ জন শিশু ও কর্মী ছিলেন। কর্তৃপক্ষ ঘটনাটিকে ‘বিদ্বেষপ্রসূত অপরাধ’ হিসেবে ধরে নিয়ে তদন্ত করছে।
নাওয়াল বলেন, ‘আমি যেন জমে বরফ হয়ে গিয়েছিলাম। মনে হচ্ছিল, বিষয়টি বাস্তব নয়। খবরটি শুনে আমি ঠায় বসে ছিলাম।’আমি যেন জমে বরফ হয়ে গিয়েছিলাম। মনে হচ্ছিল, বিষয়টি বাস্তব নয়। খবরটি শুনে আমি ঠায় বসে ছিলাম।
নাওয়ালের স্বামী ওমর আল-নুরি পাশের শহর লা জোলার একজন ভাস্কুলার সার্জন। তিনিও একই বার্তা পেয়ে দ্রুত স্কুলের দিকে ছুটে যান। সেখানে পৌঁছে তিনি চারদিকে পুলিশ, অ্যাম্বুলেন্স আর আতঙ্কিত মানুষ দেখতে পান। ওমর কে বলেন, ‘আমি এখনো মানসিকভাবে স্বাভাবিক হতে পারিনি। বারবার চোখের সামনে একই দৃশ্য ভেসে ওঠে, বন্দুকধারীরা স্কুলে ঢুকছে, আর শিশুরা আতঙ্কে দিগ্বিদিক ছুটছে।’
এই হামলা শুধু তিনজন মানুষের প্রাণ কেড়ে নেয়নি। এটি সান ডিয়েগোর মুসলিম সম্প্রদায়কে গভীর শোক, ভয় ও অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দিয়েছে। তবে এই ঘটনায় একই সঙ্গে তাঁদের আরও কাছাকাছি নিয়ে এসেছে। গত বৃহস্পতিবার নিহত ব্যক্তিদের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এতে অংশ নেয় যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা হাজারো মানুষ। মুসলিমদের প্রতি সংহতি জানাতে সেখানে বিপুল পরিমাণ অমুসলিমরাও উপস্থিত হয়েছিলেন। নিহত তিনজন হলেন নিরাপত্তা প্রহরী আমিন আবদুল্লাহ, স্কুলের এক শিক্ষিকার স্বামী নাদির আওয়াদ এবং দোকানি মনসুর কাজিহা।
পুলিশ জানায়, হামলার পর সন্দেহভাজন ওই দুই ব্যক্তির গাড়ি ঘিরে ফেলা হয়। তখন একজন অন্যজনকে গুলি করে। পরে সে আত্মহত্যা করে। যুক্তরাষ্ট্রের মুসলিম নাগরিক অধিকার সংগঠন কেয়ারের সান ডিয়েগো শাখার নেতা তাজীন নিজাম বলেন, ‘আপনাকে হয়তো সব সময় ভয় নিয়ে বাঁচতে হয়। একদিন কিছু একটা ঘটতে পারে, এমন ভয় আপনাকে তাড়া করে। কিন্তু সত্যিই যখন তা ঘটে, তখন সেটি মেনে নেওয়া অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।’ তাজীন বলেন, ‘আমাদের মাত্র একজন নিরাপত্তাকর্মী ছিলেন। গেটও খোলা ছিল। এমন কিছু ঘটতে পারে, তা কেউ কল্পনাও করেনি।’
সান ডিয়েগোর ক্লেয়ারমন্ট এলাকায় অবস্থিত এই ইসলামিক সেন্টারটি দীর্ঘদিন ধরে মুসলিম সম্প্রদায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। নতুন অভিবাসী পরিবার, তরুণ দম্পতি, শিশু ও বয়স্ক—সবাই এখানে জড়ো হন। এটি নামাজ, স্কুল, সামাজিক অনুষ্ঠান সবকিছুর কেন্দ্র। স্থানীয় বাসিন্দা মুহাম্মদ রহমানের দুই সন্তানও এই স্কুলে পড়ে। হামলার সময় শিশুরা খেলার মাঠে ছিল। সান ডিয়েগোর ক্লেয়ারমন্ট এলাকায় অবস্থিত এই ইসলামিক সেন্টারটি দীর্ঘদিন ধরে মুসলিম সম্প্রদায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। এটি নামাজ, স্কুল, সামাজিক অনুষ্ঠান সবকিছুর কেন্দ্র। মুহাম্মদ রহমান বলেন, ‘আমরা সবাই ভেঙে পড়েছি। কিন্তু আল্লাহর রহমতে শিশুরা বেঁচে গেছে।’
জানাজায় আসা মানুষের ভিড় সামলাতে সামলাতে এই অভিভাবক আরও বলেন, ‘আমরা দমে যাওয়ার মানুষ নই। এই ঘটনা আমাদের আরও ঐক্যবদ্ধ করবে।’ পিউ রিসার্চ সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, সান ডিয়েগো এলাকায় মুসলিম জনসংখ্যা ১ শতাংশের কম। ফলে এই ইসলামিক সেন্টার তাদের জন্য শুধু নামাজ আদায়ের জায়গা নয়, বরং পরিচয় ও নিরাপত্তার জনপরিসর। তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, হামলাকারী দুই তরুণের বয়স ১৭ ও ১৮ বছর। তারা অনলাইনে উগ্রবাদে প্রভাবিত হয়েছিল। তাদের লেখালেখিতে ইসলামবিদ্বেষ, ইহুদিবিদ্বেষ ও নারীবিদ্বেষের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা (এফবিআই) তিনটি বাড়ি থেকে ৩০টি বন্দুক ও একটি ক্রসবো (ট্রিগারযুক্ত ধনুকজাতীয় অস্ত্র) উদ্ধার করেছে। সান ডিয়েগোর মেয়র টড গ্লোরিয়া বলেন, ঘটনাটি ‘শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী বিদ্বেষমূলক অপরাধ’ হিসেবে তদন্ত করা হচ্ছে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ বলছে, জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রশিক্ষণ এবং দ্রুত ‘লকডাউন প্রটোকল’ কার্যকর করায় বড় ধরনের প্রাণহানি এড়ানো গেছে। বৃহস্পতিবার স্থানীয় স্ন্যাপড্রাগন স্টেডিয়ামের পাশের পার্কে হাজারো মানুষ একসঙ্গে জানাজা আদায় করেন। এতে অংশ নেন আলি আলশাহিন। তাঁর সন্তানরাও ওই স্কুলে পড়ে। তিনি বলেন, ‘আজ আমার সন্তানরা বেঁচে আছে এই (নিহত) মানুষগুলোর কারণে।’
তাঁর সন্তানেরা নিরাপত্তাপ্রহরী আমিন আবদুল্লাহকে ‘পুলিশ আঙ্কেল’ বলে ডাকত জানিয়ে আলি আলশাহিন বলেন, ‘কোনো শিশুকে কখনো যেন রক্ত আর লাশের পাশ দিয়ে হাঁটতে না হয়।’ নিজ সম্প্রদায়ের মানুষের প্রতি সংহতি জানাতে জানাজা এসেছিলেন আয়েহ ফাতায়েরজি। পেশায় চিকিৎসক আয়েহ বলেন, ‘এখানে পৃথিবীর নানা দেশের মানুষ একসঙ্গে বাস করে। এটি শান্তিপূর্ণ একটি শহর। আমরা সবাইকে স্বাগত জানাই।’