পশ্চিমবঙ্গে ধর্ম ও শ্রেণিভিত্তিক বিভিন্ন ভাতা ও সহায়তামূলক প্রকল্প বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সরকার। এতে তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের ঘোষিত ইমাম, মুয়াজ্জিন এবং পুরোহিতদের ভাতা বন্ধ হতে যাচ্ছে। হিন্দুস্থান টাইমস।
গতকাল সোমবার মন্ত্রিসভার দ্বিতীয় বৈঠকের পর এক সংবাদ সম্মেলনে এই সিদ্ধান্তের কথা জানান রাজ্যের নারী ও শিশুকল্যাণ মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল।
তিনি জানান, চলতি মে মাসে এই সব প্রকল্পের আওতায় আর্থিক বা অন্যান্য সুবিধা মিললেও, আগামী ১ জুন থেকে তা সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়ে যাবে। তবে পুজার অনুদান নিয়ে এখনই কোনও সিদ্ধান্ত হয়নি।
অগ্নিমিত্রা পাল বলেন, ‘ধর্মীয় শ্রেণিবিন্যাসের ভিত্তিতে তথ্য ও সংস্কৃতি দফতর এবং সংখ্যালঘু বিষয়ক ও মাদরাসা শিক্ষা দফতরে প্রদত্ত সহায়তামূলক প্রকল্পগুলো বন্ধ হবে। এই মাসে তা চললেও, পরের মাস থেকে পুরোপুরি বন্ধ করা হচ্ছে। এই বিষয়ে খুব শিগগিরই বিস্তারিত বিজ্ঞপ্তি জারি করা হবে।’
এছাড়াও তৃণমূল সরকারের আমলে এই ভাতা বন্টনে কোনো দুর্নীতি বা অনিয়ম হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখার জন্য অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির অধীনে একটি কমিশন গঠন করা হয়েছে বলেও জানান তিনি
বিজেপি দীর্ঘদিন ধরেই বিগত সরকারের আমলে ধর্মের ভিত্তিতে বিভিন্ন ভাতা প্রদানকে ‘তোষণের রাজনীতি’ বলে সমালোচনা করে এসেছে। দলটির অভিযোগ, তৃণমূল সরকার এসব ভাতাকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। সরকার গঠনের মাত্র ৯ দিনের মাথায় সেই প্রকল্পগুলো বন্ধ করল শুভেন্দু অধিকারীর সরকার।
এদিকে ধর্মের ভিত্তিতে ভাতা বন্ধ করলেও অন্নপূর্ণা ভা-ার নিয়ে বড় ঘোষণা করেন অগ্নিমিত্রা।
তিনি বলেন, ‘যারা মমতা সরকোরের লক্ষ্মীর ভা-ার পেতেন, তাদের নাম অন্নপূর্ণ ভা-ার প্রকল্পে সংক্রিয়ভাবে যোগ হয়ে যাবে। সরাসরি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকা আসবে। তাদের নতুন করে আবেদন করতে হবে না। তবে যারা এত দিন পাননি, তারা এবার আবেদন করতে পারবেন। এর জন্য শিগগিরই পোর্টাল খোলা হবে।’
এদিকে আসন্ন ঈদুল আযহা বা কুরবানির ঈদকে সামনে রেখে চরম অনিশ্চয়তা ও আর্থিক সংকটে পড়েছেন পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ ২৪ পরগনার ভাঙড়ের ঘোষপাড়ার গবাদি পশু খামারিরা। সরকারের পক্ষ থেকে গরুর বয়স ও বিক্রি সংক্রান্ত নতুন আইনি কড়াকড়ির কারণে স্থানীয় পাইকারি বাজারে ধস নেমেছে। খামারিদের দাবি, ভরা মৌসুমে কুরবানির পশু বিক্রি বন্ধ হয়ে গেলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন তাদের মতো সাধারণ হিন্দু ব্যবসায়ী ও খামারি পরিবারগুলো।
ঋণের বোঝা ও জীবিকা হারানোর শঙ্কা
পশ্চিমবঙ্গের ঘোষপাড়ার প্রায় প্রতিটি পরিবারই বংশানুক্রমিকভাবে দীর্ঘ ২০-৩০ বছর ধরে দুগ্ধ উৎপাদন এবং কুরবানির ঈদকে লক্ষ্য করে গরু মোটাতাজাকরণের ব্যবসা করে আসছেন। খামারিদের অভিযোগ, এবার একেকজন ব্যবসায়ী ১৫ থেকে শুরু করে ৩৫-৪০ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যাংক, স্বর্ণ বা স্থানীয় ভুষির দোকান থেকে ঋণ নিয়ে এই ব্যবসায় বিনিয়োগ করেছেন।
নতুন সরকারি বিধিনিষেধের কারণে গত কয়েকদিন ধরে কোনো ক্রেতা বা পাইকার খামারে আসছেন না। এমনকি যারা আগে অগ্রিম টাকা দিয়ে গবাদি পশু বায়না করেছিলেন, রাস্তায় পুলিশি ঝামেলা ও হেনস্থার ভয়ে তারাও এখন বায়নার টাকা ফেরত চাচ্ছেন। এই অবস্থায় মূলধন হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন বহু খামারি।
অনাহারে গবাদি পশু, অচল খামার
আর্থিক সংকটের কারণে খামারের পশুগুলোকে ঠিকমতো খাবার দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না বলে জানান ব্যবসায়ীরা। ভুষি ও খড়ের দোকানে লাখ লাখ টাকা বাকি পড়ে থাকায় বিক্রেতারা আর নতুন করে বাকিতে খাবার দিচ্ছেন না। খামারিদের বক্তব্য, নিজেদের সংসার চালানোই যেখানে কঠিন হয়ে পড়েছে, সেখানে খামারের পশুর পেছনে প্রতিদিন বিপুল টাকা খরচ করা তাদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে দ্রুত সমাধান না হলে পশুগুলো অনাহারে মারা যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও পুনর্বাসনের দাবি
ঘোষপাড়ার খামারিদের মতে, তারা এলাকার মুসলিম সম্প্রদায়ের সাথে অত্যন্ত মিলেমিশে দীর্ঘ বছর ধরে এই ব্যবসা করে আসছেন। কুরবানির পশু বেচাকেনা নিয়ে তাদের মধ্যে কখনোই কোনো সাম্প্রদায়িক বিবাদ ছিল না।
খামারিদের দাবি, যদি এই ধরনের কোনো নিয়ম বা নিষেধাজ্ঞা জারি করতেই হতো, তবে অন্তত ৬ মাস বা এক বছর আগে তাদের জানানো উচিত ছিল। বিক্রির ঠিক আগমুহূর্তে হঠাৎ এমন সিদ্ধান্তে তারা পুরোপুরি দেউলিয়া হওয়ার পথে। খামারিদের দাবি, সরকার যেন ধানের মতো খামারিদের কাছ থেকে ন্যায্য মূল্যে এই সমস্ত গরু কিনে নেয় অথবা এই বছরের জন্য নিয়মটি শিথিল করে তাদের বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দেয়। অন্যথায় গবাদি পশু নিয়ে রাজ্য সরকারের সদর দফতর ‘নবান্ন’ অভিমুখে আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তারা।