যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান যুদ্ধ বন্ধে একটি সংক্ষিপ্ত ১৪ দফা সমঝোতা স্মারক (মেমো) চূড়ান্ত হওয়ার পথে রয়েছে। দুদেশের মধ্যে শান্তি প্রচেষ্টার সঙ্গে যুক্ত একটি পাকিস্তানি সূত্র বার্তা সংস্থা এ কথা জানায় । উভয় পক্ষের মধ্যে আলোচনায় অগ্রগতি হয়েছে। দ্রুতই একটি এক পৃষ্ঠার মেমোতে সমঝোতা হতে পারে। এমন তথ্য আগে মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস-এর প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে। গণমাধ্যমটিকে সূত্র বলেছেন, ‘আমরা খুব শিগগিরই এটি (সমঝোতা স্বাক্ষর) সম্পন্ন করব। আমরা চূড়ান্ত পর্যায়ের খুব কাছাকাছি আছি।’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই মেমোটি যুদ্ধের অবসান ঘটানোর একটি প্রাথমিক কাঠামো হিসেবে কাজ করবে। পরবর্তীতে বিস্তারিত শর্তাবলি ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নিয়ে আরও আলোচনা হতে পারে। রয়টার্স, এএফপি, বিবিসি, এক্সিওস।
অ্যাক্সিওস প্রতিবেদনে লিখেছে, যুক্তরাষ্ট্র পরবর্তী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ইরানের প্রতিক্রিয়া আশা করছে। এখনো কোনো চূড়ান্ত সমঝোতা হয়নি। তবে সূত্রগুলো বলেছে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এটিই উভয়পক্ষের মধ্যে সবচেয়ে অগ্রসর পর্যায়ের আলোচনা।
বিশ্লেষকদের মতে, যদি এই সমঝোতা বাস্তবায়িত হয়, তবে তা মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনা কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
‘সমঝোতার পথে’ ট্রাম্প, খুলছে হরমুজ প্রণালি
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান যুদ্ধ বন্ধে দুই পক্ষ একটি এক পৃষ্ঠার সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের কাছাকাছি পৌঁছেছে। এই শান্তি প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত পাকিস্তানের একটি সূত্র বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। এর আগে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘অ্যাক্সিওস’ এ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল।
পাকিস্তানি সূত্রটি রয়টার্সের কাছে সেই খবরের সত্যতা নিশ্চিত করে জানায়, যুদ্ধ অবসানে দুই দেশ এখন সমঝোতার চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। ‘অ্যাক্সিওস’ তার প্রতিবেদনে জানায়, হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়ার লক্ষ্যে শুরু করা অভিযানটি স্থগিত করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এরপরই হোয়াইট হাউস মনে করছে, তারা ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধের একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে পারছে।
শান্তি প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত পাকিস্তানি সূত্রটি রয়টার্সকে বলেছে, ‘আমরা খুব দ্রুতই এই প্রক্রিয়ার সমাপ্তি টানব। আমরা (সমঝোতার) একেবারে কাছাকাছি পৌঁছে গেছি।’ অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ইরানের পক্ষ থেকে জবাব আশা করছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে এ বিষয়ে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর বা হোয়াইট হাউস তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। সম্ভাব্য এ চুক্তির শর্তাবলি সম্পর্কে অ্যাক্সিওস বলেছে, চুক্তির আওতায় ইরান তার ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি স্থগিত রাখার প্রতিশ্রুতি দেবে। বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবে এবং জব্দ করা কয়েক বিলিয়ন ডলার ফেরত দেবে। এছাড়া উভয় পক্ষই হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের ওপর আরোপিত বিধিনিষেধ তুলে নিতে সম্মত হবে।
অপারেশন এপিক ফিউরি শেষ
ইরানের বিরুদ্ধে চালানো যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের সামরিক অভিযান ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শেষ হয়েছে বলে ঘোষণা দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র এখন শান্তি চায়।
গত মঙ্গলবার হোয়াইট হাউসে এক ব্রিফিংয়ে রুবিও জানান, অভিযানে নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জিত হওয়ায় এখন ওয়াশিংটন সংঘাত নয়, বরং শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথে এগোতে চায়।
রুবিও বলেন, ‘অপারেশন এপিক ফিউরি সমাপ্ত হয়েছে। আমরা আমাদের লক্ষ্য অর্জন করেছি। আর কোনো নতুন উত্তেজনা চাই না। শান্তির পথই আমাদের অগ্রাধিকার।
তিনি আরও জানান, মার্কিন প্রশাসন একটি কূটনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছাতে আগ্রহী। বুধবার (৬ মে) রয়টার্স জানিয়েছে, ১৪ দফার একটি সমঝোতা স্বাক্ষর হতে পারে দুদেশের মাঝে। যার অর্থ সংঘাত এখানেই থামছে, ইরান সেক্ষেত্রে হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে পারে। এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন, হরমুজ প্রণালিতে আটকেপড়া জাহাজগুলোকে নিরাপদে বের করে আনার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ বন্ধ করা হয়েছে।
তাহলে কি এর অর্থ দাঁড়ায়, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের ইরানবিরোধী যুদ্ধ শেষ? রুবিও বলছেন, ‘অপারেশন এপিক ফিউরি শেষ হয়েছে। আমরা এই অভিযানের লক্ষ্য অর্জন করেছি। আমরা নতুন কোনো সংঘাত চাই না। প্রেসিডেন্ট একটি সমঝোতা চান।’এ সময় তিনি পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সরাসরি আলোচনার প্রচেষ্টার কথাও উল্লেখ করেন। গত মাসে ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত প্রথম দফার আলোচনা কোনো সমাধান ছাড়াই শেষ হয়, তবে উভয় পক্ষই নতুন প্রস্তাব দিয়েছে।
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যুদ্ধ অবৈধ: চীন
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের শুরু করা যুদ্ধকে ‘অবৈধ’ বলে আখ্যায়িত করেছে চীন। বেইজিংয়ে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে এক বৈঠকে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই এই মন্তব্য করেন।
বৈঠকে ওয়াং ই বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা কমাতে প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে চীন প্রস্তুত। এ মুহূর্তে ওই অঞ্চলে একটি ‘পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতি অপরিহার্য’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি একটি ‘সংকটপূর্ণ মোড়ে’ দাঁড়িয়ে আছে। এ অবস্থায় সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সরাসরি বৈঠক হওয়া প্রয়োজন। এদিকে চীনের দৃঢ় অবস্থানের জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচি বলেন, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের কর্মকা-ের নিন্দা জানিয়ে বেইজিং প্রমাণ করেছে তারা ইরানের ‘ঘনিষ্ঠ বন্ধু’। ইরানের বিরুদ্ধে এ যুদ্ধকে সরাসরি আগ্রাসন ও আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন হিসেবে বর্ণনা করেন আরাগচি।
তিনি আরও বলেন, তেহরান আলোচনার মাধ্যমে তার বৈধ অধিকার ও স্বার্থ রক্ষায় সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে। তবে তারা শুধু একটি ‘ন্যায়সংগত ও পূর্ণাঙ্গ চুক্তি’ মেনে নেবে।
ইরান যুদ্ধ বন্ধে চুক্তির খবরে কমে গেলো তেলের দাম
ইরান যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য চুক্তির খবরে কমে গেছে তেলের দাম। অপরদিকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শেয়ার বাজার ঊর্ধ্বগতি দেখা গেছে।
সংবাদমাধ্যম বিবিসি গতকাল বুধবার (৬ মে) জানিয়েছে, অপরিশোধিত ব্রেন্ট ফিউচারের দাম প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলারের নিচে নেমে গেছে। যেখানে দিনের শুরুতে দাম ছিল ১০৮ ডলার।
যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম এক্সিওস এক প্রতিবেদনে জানায়, যুদ্ধ বন্ধে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র একটি সমঝোতা স্মারকে সম্মত হতে পারে। এরপরই তেলের দামে পতন আর শেয়ারের দাম বেড়ে যায়।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যৌথ হামলা চালায় দখলদার ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র। ওই সময়ও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ছিল ৭০ ডলারের একটু বেশি। এখন দুই দেশের মধ্যে চুক্তির খবরে দাম কমলেও, আগের অবস্থায় যায়নি।
যুদ্ধ শুরুর পর মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে তেল উৎপাদন ব্যাপক হ্রাস পায়। এছাড়া ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ায় তেল সরবরাহও বন্ধ হয়ে যায়। যার প্রভাব পড়ে আন্তর্জাতিক বাজারে।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের পাঁচ ভাগের এক ভাগ জ্বালানি সরবরাহ হয়। যেহেতু এটি প্রায় বন্ধ হয়ে আছে তাই বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যায়।
এক্সিওস সম্ভাব্য চুক্তির প্রতিবেদন প্রকাশ করার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে হুমকি দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, যদি ইরান তাদের সঙ্গে শর্ত অনুযায়ী সমঝোতা না করে তাহলে আবারও বোমাবর্ষণ শুরু হবে।