যুদ্ধ বন্ধে দ্বিতীয় দফা আলোচনায় বসার আগে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য পাঁচটি আস্থা-অর্জনে শর্ত নির্ধারণ করেছে ইরান। এই পাঁচটি শর্ত পূরণ করা না হলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিতীয় দফা আলোচনায় বসবে না ইরান। গত মঙ্গলবার ঘনিষ্ঠ সূত্রের বরাতে এ সংবাদ প্রকাশ করেছে ফার্স নিউজ এজেন্সি। ওয়াশিংটনের সঙ্গে নতুন কোনো আলোচনা শুরু করার জন্য এসব শর্তকে ‘ন্যূনতম গ্যারান্টি’ হিসেবে বিবেচনা করছে তেহরান।প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরান যে পাঁচটি শর্ত দিয়েছে তার মধ্যে রয়েছে-সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধ করা (বিশেষ করে লেবাননে) , ইরানের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার; জব্দ করা ইরানি সম্পদ মুক্ত করা, যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ প্রদান ও হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের সার্বভৌম অধিকার স্বীকৃতি দেওয়া।যুদ্ধবিরতির পরও আরব সাগর ও ওমান উপসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ অব্যাহত থাকায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার ব্যাপারে তেহরানের অবিশ্বাস আরও বেড়েছে। পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীদের কাছে এমন বার্তা পাঠিয়েছে ইরান।প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, আলোচনায় ফেরার জন্য ন্যূনতম আস্থা তৈরির কাঠামোর মধ্যেই এই শর্তগুলো নির্ধারণ করা হয়েছে। এসব শর্ত বাস্তবায়ন ছাড়া নতুন আলোচনা শুরু করা সম্ভব নয় বলে মনে করে তেহরান।ফার্স নিউজ এজেন্সির দাবি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের ১৪ দফা প্রস্তাবের জবাব হিসেবেই ইরান এই পাঁচ শর্ত উপস্থাপন করেছে। প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবটি ছিল ‘সম্পূর্ণ একতরফা’ এবং যুদ্ধের মাধ্যমে অর্জনে ব্যর্থ হওয়া লক্ষ্যগুলো আলোচনার মাধ্যমে আদায়ের চেষ্টার উদ্দেশ্য নিয়ে এমন প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। আল-জাজিরা, রয়টার্স, এএফপি, ফারাস নিউজ এজেন্সি।
চুক্তিতে চীনকে গ্যারান্টর হিসেবে চায় ইরান
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এক সফরে বের হয়েছেন, ঠিক সেই মুহূর্তে চীনের সঙ্গে নিজেদের সম্পর্ক নিয়ে তেহরান গভীর আত্মবিশ্বাস ও স্থিতি বজায় রাখার ইঙ্গিত দিচ্ছে। ইরানের সরকার বর্তমানে বেইজিংয়ের সঙ্গে তাদের কূটনৈতিক ও কৌশলগত সমীকরণ নিয়ে আগের চেয়েও বেশি আশাবাদী। ইরানের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা চীনকে একটি ‘কৌশলগত অংশীদার’ এবং ‘ঘনিষ্ঠ বন্ধু’ হিসেবে অভিহিত করেছেন, যার মাধ্যমে তারা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন।সম্প্রতি চীনে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত আবদুররেজা রহমানি ফাজলি এই সম্পর্কের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভবিষ্যতে যেকোনো সম্ভাব্য চুক্তিতে পৌঁছাতে হলে তা অবশ্যই জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে উত্থাপন করতে হবে। তিনি জোর দিয়ে জানান, এই ধরনের চুক্তির স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে হলে বিশ্বের শীর্ষ ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলোর পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তা থাকতে হবে। এই প্রেক্ষাপটে তিনি বিশেষ করে চীন ও রাশিয়ার নাম উল্লেখ করেন।রাষ্ট্রদূত ফাজলির মতে, ইরান এবং এই অঞ্চলের অন্যান্য দেশের কাছে চীনের যে বিশেষ অবস্থান ও গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে, তাতে বেইজিং অনায়াসেই যেকোনো আন্তর্জাতিক চুক্তির প্রধান জামিনদার বা গ্যারান্টর হিসেবে ভূমিকা পালন করতে পারে। তেহরান মনে করছে, কেবল দ্বিপাক্ষিকআলোচনারমাধ্যমে নয়, বরং চীনের মতো বড় শক্তির মধ্যস্থতা ও নিশ্চয়তা থাকলেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদী শান্তি বা সমঝোতা সম্ভব।
যুদ্ধ অবসানে চীনের সাহায্য চান না ট্রাম্
বেইজিংয়ের উদ্দেশে যাত্রা শুরুর আগে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে মার্কিন এই প্রেসিডেন্ট বলেছেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের অবসানে এবং হরমুজ প্রণালির ওপর তেহরানের নিয়ন্ত্রণ শিথিলে বেইজিংয়ের সহায়তার প্রয়োজন হবে বলে তিনি মনে করেন না।
বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। যুদ্ধের ফলে বর্তমানে সেখানে জাহাজ চলাচল স্থবির হয়ে পড়েছে। এই সংকট নিরসনে চীনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে ট্রাম্প তা হেসে উড়িয়ে দিয়েছেন।
তিনি বলেন, ইরান ইস্যুতে আমাদের কারও সাহায্যের দরকার নেই। আমরা কোনো না কোনোভাবে জিতে যাব—তা আলোচনা বা যুদ্ধ যেভাবেই হোক। ভঙ্গুর অস্ত্রবিরতি কার্যকর হওয়ার এক মাসেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও যুদ্ধ শেষ করার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের বিভিন্ন দাবি নিয়ে এখনও মতবিরোধ রয়েছে।
ওয়াশিংটন তেহরানকে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি বাতিল এবং প্রণালির ওপর থেকে অবরোধ তুলে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। অন্যদিকে ইরান যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণ, মার্কিন অবরোধের অবসান এবং লেবাননসহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধের দাবি জানিয়েছে।লেবাননে ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে লড়াই করছে ইসরায়েল। ট্রাম্প ইরানের এসব দাবিকে ‘‘আবর্জনা’’ হিসেবে অভিহিত করে প্রত্যাখ্যান করেছেন। বিশ্লেষকরা বলেছেন, ওই অঞ্চল থেকে তেল ও তরলিকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পাঠানো বিষয়ে ইরাক ও পাকিস্তানের সঙ্গে চুক্তি করে হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ আরও দৃঢ় করেছে ইরান।
অন্যান্য দেশও একই ধরনের ব্যবস্থার কথা বিবেচনা করছে। এই পদক্ষেপের ফলে ওই নৌপথের ওপর তেহরানের নিয়ন্ত্রণ স্থায়ীভাবে স্বাভাবিক হয়ে যেতে পারে। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে ট্রাম্পের শীর্ষ বৈঠকের আগে এই ইস্যুতে ঐকমত্য প্রদর্শনের প্রচেষ্টা চালাচ্ছে ট্রাম্প প্রশাসন।মঙ্গলবার মার্কিন প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলেছেন, গত মাসে মার্কিন ও চীনা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা একমত হয়েছেন, কোনও দেশই এই অঞ্চলে যাতায়াতের জন্য টোল আদায় করতে পারবে না।ইরানি তেলের অন্যতম বড় ক্রেতা এবং তেহরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখা চীন এই বক্তব্যের কোনও প্রতিবাদ জানায়নি।