কলকাতার নিউমার্কেট এলাকার মির্জা গালিব স্ট্রিটের ‘শিখা ইন’ হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর প্রশাসনের কড়া অগ্নি-নিরাপত্তা অভিযানের মুখে একের পর এক আবাসিক হোটেল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এর ফলে ওই এলাকায় থাকা হাজার হাজার বাংলাদেশী পর্যটক ও চিকিৎসা নিতে আসা মানুষ তীব্র আবাসন সংকটে পড়ে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
গতকাল সোমবার সকাল থেকেই নিউমার্কেট এলাকায় পর্যটকদের হোটেল ছেড়ে বেরিয়ে যেতে দেখা যায়। অনেক পর্যটক এমন পরিস্থিতিতে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
ইতোমধ্যে মাত্র ৪৮ ঘণ্টায় মারকুইজ স্ট্রিট, কলিন স্ট্রিট, সদর স্ট্রিট ও মির্জা গালিব স্ট্রিটে ২২১টি হোটেল ও ৯টি রেস্তোরাঁ বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এতে অনেক পর্যটককে বাধ্য হয়ে হোটেল ছাড়তে হচ্ছে, কেউ নতুন থাকার জায়গা খুঁজছেন, আবার কেউ নির্ধারিত সময়ের আগেই দেশে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
মূলত ফায়ার লাইসেন্স, ফায়ার অডিট, পুলিশের অনুমতি, ফায়ার অ্যালার্ম কিংবা জরুরি অবস্থায় বের হওয়ার সিঁড়িসহ ন্যূনতম অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকায় এসব হোটেল ও রেস্তোরাঁ বন্ধ করা হয়েছে। মির্জা গালিব স্ট্রিটের ‘শিখা ইন’ হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পরই নিউমার্কেট থানার পুলিশ অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা খতিয়ে দেখতে অভিযান শুরু করে। উপমুখ্যমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পালও অভিযানে অংশ নিয়ে কয়েকটি হোটেল বন্ধ করেন।
এর আগে গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় রাজ্য সরকার হোটেলগুলোর নিরাপত্তাব্যবস্থা পর্যালোচনায় একটি তদন্ত কমিটি গঠনের ঘোষণা দেয়। কলকাতা পুলিশ, কলকাতা পৌরসভা, ফায়ার সার্ভিস ও সিইএসসির সমন্বয়ে গঠিত এই কমিটি কলকাতার ৩ হাজার ৫০০টিরও বেশি হোটেলের নিরাপত্তাব্যবস্থা পর্যালোচনা করবে। বৃহত্তর কলকাতার অন্যান্য এলাকায় কমিটির তৎপরতা তুলনামূলক কম হলেও নিউমার্কেট এলাকায় কঠোর অবস্থান নিয়েছে তারা।
এরপর গত শনিবার থেকে মাত্র ৪৮ ঘণ্টায় ২২১টি হোটেল ও ৯টি রেস্তোরাঁ বন্ধের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি নিরাপত্তাবিধি না মানায় একাধিক হোটেলের বিদ্যুৎ সংযোগও বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়েছে।
এদিকে একের পর এক হোটেল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছেন নিউমার্কেট এলাকায় অবস্থান করা বাংলাদেশি নাগরিকরা। বর্তমানে কলকাতায় প্রায় ১১ হাজার বাংলাদেশি পর্যটক অবস্থান করছেন। এর মধ্যে প্রায় ৭ হাজারই নিউমার্কেট এলাকায় রয়েছেন। হোটেল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অনেকেই বাধ্য হয়ে কলকাতা ছাড়ছেন। কেউ নতুন হোটেল খুঁজছেন, আবার কেউ নির্ধারিত সময়ের আগেই দেশে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
দালালের মাধ্যমে নতুন করে হোটেল পাওয়া গেলেও কোথাও কোথাও আগের তুলনায় অনেক বেশি ভাড়া চাওয়া হচ্ছে। কিছু হোটেলের ভাড়া দেড় থেকে দ্বিগুণ পর্যন্ত বেড়েছে।
কলকাতার পর্যটন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরাও বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন। বাংলাদেশি পর্যটকদের কেন্দ্র করে নিউমার্কেট এলাকায় হোটেল, খাবারের দোকান, পরিবহন, কেনাকাটা ও বিভিন্ন সেবার ব্যবসা গড়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক কয়েক বছরে নানা কারণে এসব ব্যবসায় ধাক্কা লেগেছিল।
কলকাতার গ্রিন লাইন পরিবহনের কর্মকর্তা শ্যামল ঘোষ জানান, সীমান্ত থেকে বাসগুলো যাত্রীতে পূর্ণ হয়ে কলকাতায় আসছে। কিন্তু পর্যটকদের থাকার মতো পর্যাপ্ত হোটেল এখন নেই। অনেকেই আশপাশের এলাকার হোটেলে চলে যাচ্ছেন। তবে সেসব হোটেলের ভাড়া দ্বিগুণ-তিনগুণের বেশি বেড়ে গেছে।
তিনি বলেন, ‘সরকার জিরো টলারেন্স অবস্থান নিয়েছে। আমরা এই অবস্থানকে সমর্থন করি। তবে হোটেল মালিকরা কিছুটা সময় পেলে ভালো হতো।’
নিউমার্কেটের অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত রিকশাচালক থেকে শুরু করে বিভিন্ন পেশার মানুষও সরকারের এমন কঠোর অবস্থান নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। ব্যবসায়ীরা বলছেন, পর্যটন ভিসা চালুর পর যখন পর্যটকের সংখ্যা কিছুটা বাড়তে শুরু করেছে, তখন নতুন করে হোটেল বন্ধের ঘটনা তাদের জন্য বড় ধাক্কা হয়ে এসেছে।
তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, পর্যটকদের নিরাপত্তার সঙ্গে কোনও আপস করা হবে না। অগ্নিনিরাপত্তা বিধি না মানা হোটেলগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা অব্যাহত থাকবে।