হরমুজ প্রণালিতে প্রস্তাবিত নতুন নৌপথ নিয়ে ইরান ও উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে আলোচনার উদ্যোগ আপাতত থমকে গেছে। সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) ওমানের সালালাহ শহরে অনুষ্ঠেয় মন্ত্রী পর্যায়ের আঞ্চলিক বৈঠকটি শেষ মুহূর্তে স্থগিত করা হয়েছে। বৈঠকটি পিছিয়ে দেওয়ার ঘোষণা এমন এক সময়ে এল, যখন ইরানের সঙ্গে একই টেবিলে বসতে আপত্তি জানিয়েছে বাহরাইন।
রোববার রাতে বৈঠক স্থগিতের বিষয়টি জানায় ওমানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তাদের ভাষ্য, গঠনমূলক আলোচনার জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরি করতেই বৈঠকটি অন্য তারিখে নেওয়া হয়েছে। তবে নতুন তারিখ কিংবা বৈঠক স্থগিতের নির্দিষ্ট কারণ জানানো হয়নি।
ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আলবুসাইদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে বলেন, ‘ঐকমত্যের স্বার্থে আগামীকাল সালালাহতে অনুষ্ঠেয় আঞ্চলিক বৈঠকটি স্থগিত করা হয়েছে’।
তিনি আরও লিখেছেন, ‘আমাদের অঞ্চলে স্থিতিশীলতা ও দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতার জন্য সহায়ক সংলাপ এগিয়ে নিতে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’
বদর আলবুসাইদির পোস্টে বাহরাইন, ইরান, ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান, কাতার, সৌদি আরব ও কুয়েতের পতাকা ছিল। এতে ধারণা করা হচ্ছে, এসব দেশের প্রতিনিধিদের বৈঠকে অংশ নেওয়ার কথা ছিল।
তবে বৈঠকটি স্থগিত হওয়ার আগেই পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে। শনিবার বাহরাইন জানায়, ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের আগে তেহরানের সঙ্গে কোনো যৌথ মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে অংশ নেবে না তারা। হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি নিয়ে প্রস্তাবিত বৈঠকের খবর প্রকাশের পরই বাহরাইনের পক্ষ থেকে এই অবস্থান জানানো হয়।
অন্যদিকে ইরান শুরু থেকেই বৈঠকে অংশ নেওয়ার বিষয়ে ইতিবাচক ছিল। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই শুক্রবার জানিয়েছিলেন, ওমানের উদ্যোগে অনুষ্ঠেয় বৈঠকে তেহরানের প্রতিনিধিরা অংশ নেবেন। উপসাগরীয় অঞ্চলের আটটি দেশকে নিয়ে বৈঠকটি আয়োজনের পরিকল্পনা ছিল।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচিও বৈঠকের উদ্দেশ্য সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা দিয়েছিলেন। তার বলেনৈ, আলোচনার প্রধান এবং কার্যত একমাত্র বিষয় হওয়ার কথা ছিল হরমুজ প্রণালির নতুন নৌপথ। এ বিষয়ে ইরান ও ওমানের মধ্যে একটি চুক্তি চূড়ান্ত হয়েছে। সেখানে নৌপথের মানচিত্র এবং এর ব্যবস্থাপনা নিয়ে যৌথ বিবৃতির বিষয়ও রয়েছে।
তবে আরাগচি একই সঙ্গে পরিষ্কার করে দেন, ওমানের সঙ্গে চুক্তির অর্থ হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নয়।
হরমুজ প্রণালি নিয়ে এই কূটনৈতিক টানাপোড়েনের পেছনে সাম্প্রতিক আঞ্চলিক সংঘাতের প্রভাবও রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাতের সময় ইরানের হামলার লক্ষ্যবস্তু হওয়া উপসাগরীয় দেশগুলোর একটি বাহরাইন। তেহরান এর আগে দেশটিতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনাগুলোতে হামলা চালানোর কথা জানিয়েছে। এর মধ্যে ইসা বিমানঘাঁটির নামও রয়েছে।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা শুরু করলে পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়। পাল্টা জবাবে ইরান ইসরায়েল এবং অঞ্চলটির বিভিন্ন মার্কিন সামরিক স্থাপনায় হামলা চালায়। পরে জুনে পাকিস্তান ও কাতারের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ‘ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক’ সই হলেও হরমুজ প্রণালি নিয়ে মতবিরোধের কারণে এর বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হয়।
এরপর আগস্টে যুক্তরাষ্ট্র আবার ইরানে সামরিক অভিযান চালায়। জবাবে ইরানও যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র কয়েকটি আরব দেশে থাকা মার্কিন সামরিক স্থাপনায় হামলা চালায়।
এই প্রেক্ষাপটে হরমুজ প্রণালির নতুন নৌপথ নিয়ে আঞ্চলিক সমঝোতার উদ্যোগটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। কিন্তু বাহরাইনের আপত্তি এবং শেষ পর্যন্ত বৈঠক স্থগিত হওয়ায় সেই উদ্যোগ এখন নতুন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।