যুক্তরাষ্ট্র চীনকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিয়ম ভাঙার জন্য অভিযুক্ত করছে। বিশ্বে দুই বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে উত্তেজনা দিন দিন বাড়ছে। চীন তার সার্বভৌমত্ব ও অর্থনৈতিক স্বার্থরক্ষার জন্য পাল্টা পদক্ষেপ নিচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে দুদেশের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত।
শুল্কযুদ্ধ, বাণিজ্যনীতি ও সামরিক প্রস্তুতির মধ্যে দুদেশের সম্পর্কের টানাপোড়েন বিশ্বব্যাপী উদ্বেগ তৈরি করেছে। আশঙ্কা রয়েছে, বিশ্বব্যাপী রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠবে।
চীন সম্প্রতি ঘোষণা করেছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘যে কোনো ধরনের যুদ্ধ’ করতে প্রস্তুত। এই যুদ্ধ শুল্ক, বাণিজ্য বা অন্য যে কোনো ধরনের যুদ্ধ হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র চীনের পণ্যের ওপর শুল্ক বাড়িয়েছে। আর চীনও পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিপণ্যের ওপর ১০-১৫ শতংশ শুল্ক আরোপ করেছে।
চীনের সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ‘যদি যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ চায়, তাহলে আমরা শেষ পর্যন্ত লড়াই করতে প্রস্তুত।’ বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের (এনপিসি) অনুষ্ঠানে এ ঘোষণা দেন চীনা প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং। এ সময় চীনের রাজনৈতিক নেতৃত্ব, দেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়।
প্রতি বছর চীন সামরিক খরচ বাড়াচ্ছে। চলতি বছরও চীন ৭ দশমিক ২ শতাংশ বাড়িয়েছে। দেশটির সামরিক বাজেট এখন দাঁড়িয়েছে ২৪৫ বিলিয়ন ডলার। যদিও এটি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক খরচের তুলনায় অনেক কম। ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাজেট প্রায় ৮৫০ বিলিয়ন ডলার।
তবে বিশ্লেষকরা বিশ্বাস করেন, চীন প্রকৃত সামরিক খরচ কম দেখাতে পারে। কারণ বর্তমানে চীন সামরিক শক্তি বৃদ্ধি, আধুনিক প্রযুক্তির উন্নয়ন ও প্রতিরক্ষা খাতে ব্যাপক বিনিয়োগ করছে। লি কিয়াং জানিয়েছেন, চীন সামরিক প্রশিক্ষণ ও যুদ্ধ প্রস্তুতি বাড়াবে, যাতে দেশের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা এবং উন্নয়নের স্বার্থরক্ষা করা যায়। শি জিনপিংয়ের নেতৃত্বে চীন ২০২৭ সালের মধ্যে একটি আধুনিক সেনাবাহিনী গঠনের লক্ষ্য নিয়েছে এবং এ লক্ষ্য অর্জনে পদক্ষেপ নিচ্ছে। এরই মধ্যে চীন নতুন পারমাণবিক বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজও তৈরি করছে। এটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে সক্ষম।
এদিকে চীন আগেও যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতির কথা বলেছিল। গত অক্টোবরে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং সেনাদেরকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দিয়েছিলেন, বিশেষ করে তাইওয়ান অঞ্চলের আশপাশে সামরিক মহড়া চলাকালে। এটি অনেকের কাছে একটি ‘যুদ্ধের শক্তিশালী সংকেত’ হিসেবে দেখা দিয়েছিল। চীন সামরিক প্রস্তুতি আরও শক্তিশালী করছে এবং যে কোনো সম্ভাব্য পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত রয়েছে।
মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তার পেন্টাগন জানিয়েছে, তারাও চীনের সঙ্গে যে কোনো ধরনের যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত। মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ বলেছেন, ‘আমরা প্রস্তুত। যারা শান্তি কামনা করেন, তারা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাকেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিশ্বে অনেক শক্তিশালী দেশ রয়েছে, যাদের ধারণা আমাদের থেকে আলাদা, তারা দ্রুত তাদের সামরিক ক্ষমতা বাড়াচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের জন্য প্রতিরক্ষা শক্তি বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’ হেগসেথ আরও যোগ করেন, যদিও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সম্পর্ক ভালো, তবে পেন্টাগনের প্রধান কাজ হলো, যে কোনো সম্ভাব্য সংঘর্ষের জন্য প্রস্তুত থাকা।
চীন মার্কিন শুল্কনীতি নিয়ে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় (ডব্লিউটিও) মামলা করেছে। চীন দাবি করেছে, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কব্যবস্থা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আইন লঙ্ঘন করছে এবং এ সমস্যার সমাধান চায়।
কারণ বিশ্ববাজারে চীনের শক্তিশালী উপস্থিতি রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কযুদ্ধের কারণে বাণিজ্যব্যবস্থা অস্থিতিশীল হয়ে পড়েছে। এ পরিস্থিতিতে ডব্লিউটিওর কাছে সমাধান খুঁজছে চীন।
ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি ফেন্টানিল সমস্যার অজুহাতে চীনা পণ্যের ওপর ১০ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করার হুমকি দিয়েছেন। ফলে মোট শুল্ক দাঁড়াবে ২০ শতাংশ। চীন এই পদক্ষেপকে ‘ব্ল্যাকমেইল’ হিসেবে অভিহিত করেছে। এ বিষয়ে চীন যুক্তরাষ্ট্রকেই দোষারোপ করেছে।
পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে চীন কৃষিপণ্যের শুল্ক বাড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে, যা আমেরিকার কৃষকদের জন্য বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে। ২০১৮ সালের পর থেকে চীন মার্কিন কৃষিপণ্যের সবচেয়ে বড় বাজার ছিল, তবে ২০২৪ সালে রপ্তানি ১৪ শতাংশ কমেছে। চীনের গ্লোবাল টাইমস রিপোর্ট অনুযায়ী, শুল্ক ছাড়াও কিছু নন-ট্যারিফ ব্যবস্থা নেবে বেইজিং। এর মধ্যে, বিশেষভাবে মার্কিন কৃষি পণ্য—যেমন সয়াবিন, গরুর মাংস, শুকরের মাংস, গম, ভুট্টা ও সরগামকে লক্ষ্যবস্তু করার সম্ভাবনা রয়েছে।
তথ্যসূত্র : বিবিসি, টেলিগ্রাফ, গার্ডিয়ান, আইএসএনএ