একটি ইসলামী সমাজের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো ভ্রাতৃত্ববোধ। আর হিংসা ভ্রাতৃত্ববোধকে ধ্বংস করে। মহানবীর পবিত্র জীবনাদর্শের অন্যতম সৌন্দর্য হলো হিংসা না করা। তিনি তাঁর প্রিয় সাহাবি এবং দীর্ঘদিনের খাদেম হযরত আনাস ইবনে মালিক (রা.)-কে বলেন- "হে বৎস! তুমি যদি সকাল ও সন্ধ্যা এমনভাবে পার করতে পারো যে, তোমার অন্তরে কারো প্রতি কোনো হিংসা, বিদ্বেষ বা অকল্যাণ কামনা নেই—তবে তুমি তা-ই করো।" এরপর তিনি যোগ করেন:"হে বৎস! আর এটাই হলো আমার সুন্নাত বা আদর্শ। আর যে ব্যক্তি আমার সুন্নাতকে জীবিত করল (ভালোবাসল), সে মূলত আমাকেই ভালোবাসল। আর যে আমাকে ভালোবাসল, সে জান্নাতে আমার সাথেই থাকবে।" (সুনান আত-তিরমিজি, হাদিস: ২৬৭৮)
আল্লাহর রসূল শত্রুর সাথেও হিংসা করতেন না। মক্কা বিজয়ের দিন তিনি তাঁর ঘোর শত্রুদেরও বিনাশর্তে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন। যারা তাঁকে মক্কা থেকে তাড়িয়েছিল, তাঁদের প্রতি কোনো প্রতিশোধ বা হিংসা নেননি। তায়েফে পাথরের আঘাতে রক্তাক্ত হওয়ার পরও তিনি তাঁদের ধ্বংস কামনা না করে হেদায়েতের দোয়া করেছিলেন।
মহানবীর মহান সাহাবাগণ আল্লাহর রসূলকে এবং তাঁর পবিত্র জীবনাদর্শকে তাঁদের জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবাসতেন। মদীনার আওস ও খাজরাস গোত্র বংশানুক্রমে শত্রুতা ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে লিপ্ত ছিল। কিন্তু ইসলাম গ্রগণের পর আল্লাহর রাসূলের সান্নিধ্যে এসে তারা তারা ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে যায়। মক্কা থেকে যেসব মুসলিম কাফেরদের অত্যাচার থেকে বাঁচতে মদীনায় হিজরত করে তাদেরকেও তারা ভাই বলে বুকে আগলে নেন এবং নিজেদর ঘর-বসতিতে আশ্রয় দেন।
এক হাদিসে এসেছে, রাসূল (সা.) তাঁর এক সাহাবিকে জীবিতাবস্থায় "জান্নাতি" বলে ঘোষণা করেছিলেন। পরবর্তীতে জানা যায়, সেই সাহাবির বিশেষ আমল ছিল—তিনি প্রতিদিন ঘুমানোর আগে তাঁর অন্তরে কোনো মুসলিমের প্রতি হিংসা বা ক্ষোভ রাখতেন না এবং সবাইকে ক্ষমা করে দিতেন।
বস্তুত, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাত বা আদর্শ কেবল বাহ্যিক পোশাক-পরিচ্ছদ বা আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অন্তরের পবিত্রতা রক্ষা করা এবং মানুষের প্রতি হিংসা-বিদ্বেষহীন মন রাখা তাঁর অন্যতম প্রধান সুন্নাত। কোনো মানুষের ক্ষতি বা অকল্যাণ চিন্তা না করে দিন পার করতে পারলে হাশরের ময়দানে আল্লাহর দরবারে হিসাব-নিকাশ অনেক সহজ হয়ে যায়। অন্তরে ক্ষোভ বা অহংকার না রেখে সবাইকে ক্ষমা করে ঘুমাতে যাওয়া মানুষকে সরাসরি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সাথে জান্নাতে থাকার সৌভাগ্য এনে দেয়।
হিংসা একটি মারাত্মক আত্মিক ব্যাধি। আল্লাহর রসূল শুধু নিজে হিংসা ও বিদ্বেষ থেকে দূরে থাকেননি, বরং পুরো মানবজাতিকে এর ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে সতর্ক করেছেন।
আল্লাহর রসূল সাহাবাদের হিংসা থেকে বেঁচে থাকার নির্দেশ দিতেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলতেন, ‘তোমরা একে অন্যের সঙ্গে হিংসা-বিদ্বেষ পোষণ করবে না। পরস্পর শত্রুতা করবে না। পারস্পরিক সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করবে না।’ তোমরা আল্লাহর বান্দা হিসেবে ভাই ভাই হয়ে থাকবে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৬৪২৪)
খাঁটি ঈমান নিয়ে জান্নাতে যেতে হলে অন্তরকে হিংসা ও বিদ্বেষমুক্ত রাখা আবশ্যক। তওবা না করে যদি কেউ অন্তরে স্থায়ীভাবে হিংসা পোষণ করে মারা যায়, তবে তার পরিণাম অত্যন্ত ভয়াবহ হতে পারে।
রসূলুল্লাহ (স.) বলেছেন, আগুন যেভাবে শুকনো কাঠ বা ঘাস পুড়িয়ে ছাই করে দেয়, তেমনি হিংসাও মানুষের নেক আমলগুলো পুড়িয়ে ধ্বংস করে দেয়। তিনি আরও বলতেন- মুমিন একে অপরের ভাই। অন্যের নেয়ামত দেখে কষ্ট পাওয়া বা তা নষ্ট কামনা করা প্রকৃত মুমিনের বৈশিষ্ট্য হতে পারে না। তিনি বলতেন, অন্তরে হিংসা রেখে জান্নাতের পবিত্র পরিবেশে প্রবেশ করা যায় না, কারণ জান্নাতিদের অন্তর থেকে সব ধরনের হিংসা-বিদ্বেষ চিরতরে দূর করে দেওয়া হবে।
হিংসুক ব্যক্তি মূলত আল্লাহর বণ্টন করা তাকদির বা ফয়সালার ওপর অসন্তুষ্ট হয়। তারা অন্যের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ বা রিজিক দেখে হিংসা করে। এটা আসলে বোকামি। কারণ রিজিকের মালিক আল্লাহ। আল্লাহ অফুরন্ত রিজিকের মালিক। সুতরাং অন্যের প্রতি হিংসা না করে আল্লাহর কাছে রিজিক প্রার্থনা করাই শ্রেয়।
কোনো ব্যক্তির মাঝে হিংসার প্রবৃত্তি দেখা দিলে তাকে অবিলম্বে তওবা করতে হবে এবং নিজের মনকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
অন্তরকে হিংসা ও বিদ্বেষের মতো মারাত্মক ব্যাধি থেকে মুক্ত রাখা প্রতিটি মুমিনের জন্য অত্যন্ত জরুরি। রাসুলুল্লাহ (সা.) এবং ইসলামি স্কলারদের নির্দেশনা অনুযায়ী, মনকে হিংসামুক্ত রাখার প্রধান উপায়গুলো নিচে আলোচনা করা হলো:
১. আল্লাহর তাকদিরের ওপর সন্তুষ্ট থাকামনোভাব: হিংসা মূলত জন্ম নেয় যখন কেউ অন্যের ভালো কিছু দেখে ঈর্ষা করে।সমাধান: মনে প্রাণে বিশ্বাস করা যে, আল্লাহ যাকে যতটুকু দিয়েছেন তা তাঁরই ফয়সালা। আল্লাহর বণ্টনের ওপর সন্তুষ্ট থাকলে (যাকে ইসলামে 'রেজা বিল কাজা' বলা হয়) মন থেকে হিংসা দূর হয়ে যায়।
২. অন্যের জন্য দোয়া করাআমল: কারো প্রতি হিংসা তৈরি হলে, উল্টো তাঁর নেয়ামত বৃদ্ধি এবং কল্যাণের জন্য আল্লাহর কাছে গোপনে দোয়া করুন।ফলাফল: হাদিস অনুযায়ী, আপনি যখন অন্যের জন্য দোয়া করবেন, ফেরেশতারা আপনার জন্যও একই দোয়া করবেন। এতে শয়তান পরাজিত হয় এবং অন্তরের হিংসা ভালোবাসায় রূপ নেয়।
৩. সালামের ব্যাপক প্রচলন করারাসূলের (সা.) শিক্ষা: রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "আমি কি তোমাদের এমন কাজের কথা বলব না, যা করলে তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসা বৃদ্ধি পাবে? তোমরা নিজেদের মধ্যে সালামের ব্যাপক প্রচলন করো।" (সহিহ মুসলিম)। সালাম মানুষের অহংকার ও হিংসা ধুয়ে দেয়।
৪. উপহার আদান-প্রদান করাপদ্ধতি: যার প্রতি মনের ভেতর হিংসা বা ক্ষোভ তৈরি হচ্ছে, তাকে ছোটখাটো কোনো উপহার দিন।উপকারিতা: হাদিসে এসেছে, "তোমরা একে অপরকে উপহার দাও, এতে তোমাদের মধ্যকার পারস্পরিক ভালোবাসা বৃদ্ধি পাবে এবং হিংসা-বিদ্বেষ দূর হয়ে যাবে।" (আল-আদাবুল মুফরাদ)।
৫. নিজের চেয়ে কম সৌভাগ্যবানদের দিকে তাকানোদৃষ্টিভঙ্গি: পার্থিব ধন-সম্পদ ও ক্যারিয়ারের ক্ষেত্রে সবসময় নিজের চেয়ে নিচের স্তরের মানুষের দিকে তাকানো উচিত।লাভ: এতে নিজের প্রাপ্তির জন্য আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা (শুকরিয়া) প্রকাশ পায় এবং অন্যের ওপর হিংসা করার মানসিকতা তৈরি হয় না।
৬. নিয়মিত তাওবা ও ইস্তিগফার করাপ্রার্থনা: অন্তরের পবিত্রতার জন্য আল্লাহর কাছে বিশেষভাবে দোয়া করা। কোরআনে বর্ণিত এই দোয়াটি নিয়মিত পড়া যেতে পারে:"হে আমাদের রব! আমাদের এবং আমাদের পূর্বে যারা ঈমান এনেছে তাদের ক্ষমা করুন। আর ঈমানদারদের প্রতি আমাদের অন্তরে কোনো হিংসা-বিদ্বেষ রাখবেন না।" (সূরা আল-হাশর, আয়াত: ১০)
এই অভ্যাসগুলো নিয়মিত চর্চা করলে মানুষের অন্তর হিংসার অন্ধকার থেকে মুক্ত হয়ে প্রশান্তিতে ভরে ওঠে।
-এমএএইচ